বেদির ওপরে একখানা কালো পাথর, তার সারা গায়ে ব্রণের চিহ্ন। মারীজননীর প্রতীক। মাঝখান দিয়ে একটা প্রকান্ড ফাটল, দেখলে মনে হয় কেউ যেন সেটাকে দু-টুকরো করে কেটে ফেলবার চেষ্টা করেছিল। পৌত্তলিকতাদ্বেষী রাঢ়জয়ী মুসলমানেরই তলোয়ারের কোপ পড়েছিল কি না কে জানে।
ফাল্গুনের রৌদ্রে উদ্ভাসিত এই ভরা দুপুরেও অশথের বিস্তীর্ণ শান্ত ছায়ার নীচে ঘনিয়েছে উগ্রগন্ধী অন্ধকার। ধুনো পুড়ছে, গুগগুল পুড়ছে। পট পট করে শব্দ হচ্ছে, কালো ধোঁয়া চক্রাকারে উঠছে সাপের কুন্ডলীর মতো। ঢাকের গগনভেদী বোল উঠছে, ক্যানক্যান করে তীক্ষ্ণ পেতনির কান্নার মতো স্বর তুলছে কাঁসর। আর তার ভেতরে বসে গুণিন একটানা স্বরে মন্ত্রপাঠ করে যাচ্ছে। তার কতকটা সংস্কৃত, কতকটা বাংলা, কতকটা দুর্বোধ্য ড আর ঢ়-এর সমারোহ। অশুদ্ধ উচ্চারণে জোর দিয়ে বলে যাচ্ছে, হাড় কট্টন, মাংস চর্বণ…
চারদিকে মেয়ে-পুরুষের ছোটো একটা দল জমেছে। গলায় আঁচল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেউ, কেউ-বা তাকিয়ে আছে বিস্ফারিত বিহ্বল দৃষ্টিতে। ঢোল আর কাঁসরের বিরাম যতিতে সেই গম্ভীর মন্ত্রনাদটা যেন অলৌকিক হয়ে উঠছে। ধুনোর ধোঁয়ায় যাদের মাথা ঘুরছে, চোখে যারা দেখছে অন্ধকার, তাদের যেন মনে হচ্ছে এই কালো পাথরটা হঠাৎ একসারি ধারালো দাঁতসুদ্ধ কালো একখানা রক্তাক্ত মুখ মেলে দেবে, আর কড়মড় করে হাড়-মাংস চিবোতে শুরু করে দেবে
হেই গুণিন, ভালো করে মন্তর পড়ো বাবা। মা-র অনুগ্রহ একটু না কমলে যে আর বাঁচি না।
জনতার মধ্য থেকে কার যেন সকাতর অনুনয়। গুণিন এক বার পেছন ফিরে তাকাল। মদের নেশায় আর ধুলোর আগুনে চোখ দুটো রাক্ষসের মতো টকটক করছে। প্রকান্ড একটা গোলাকার মুখ, খাড়া খাড়া চোয়াল। মাথার ঝাঁকড়া চুলগুলোয় কপালের আদ্ধেকটা ঢাকা পড়েছে।
যেমন করে ম্যালেরিয়ার ঝাঁকুনি আসে, তেমনি থরথর করে একটা কাঁপন এসে যেন গুণিনের আপাদমস্তক ঝাঁকিয়ে দিয়ে গেল। দু-হাতে দুটো ধুনুচি নিয়ে উঠে দাঁড়াল গুণিন, সমস্ত শরীর তার টলছে। তারপরে শুরু হল তান্ডবনাচ।
গুণিনের ওপরে শীতলার ভর হয়েছে। মুখ দিয়ে গোঁ-গোঁ করে বেরুচ্ছে একটা বীভৎস চাপা আওয়াজ। কখনো মাটিতে আছড়ে পড়ছে, পরক্ষণেই উঠে দাঁড়িয়ে নেচে চলেছে রুদ্ৰতালে। ঝাঁকড়া চুলগুলো থেকে ধুলোর ঝড় উড়ছে। ফটাস করে একটা ধুনুচি মাটিতে পড়ে দুখান হয়ে গেল, চারদিকে ছিটকে গেল আগুন। সর সর করে তোক পালিয়ে যেতে পথ পেল না।
গুণিন আবার উঠেছে, আবার নাচ শুরু করেছে। কিন্তু নাচের তালে কেন যেন ভাটা পড়েছে এবার। পা আর তেমনভাবে চলছে না। মুখ থেকে চাপা গোঙানির শব্দটা কেমন বিকৃত আর অস্বাভাবিক বোধ হচ্ছে। জ্বলন্ত চোখ দুটো যেন ঝিমিয়ে আসছে ক্রমশ।
এবারে গুণিন থেমে দাঁড়াল। টলমল করে কাঁপতে লাগল তার সর্বশরীর। তারপর ঠিক ইচ্ছে করে নয়—পেছন থেকে কে যেন মস্ত একটা ধাক্কা দিয়ে তাকে ঘাড় মুচড়ে ফেলে দিলে মাটিতে। চারপাশের জনতা চঞ্চল হয়ে উঠল। কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে। যা হওয়া উচিত এ তো তা নয়। বিস্ফারিত ভয়ার্তচোখে গুণিন কিছুক্ষণ গোঁ-গোঁ করতে লাগল, কষ দিয়ে ফেনার সঙ্গে বেরিয়ে এল একঝলক রক্ত। বলি-দেওয়া পশুর মতো বার কয়েক হাত-পা ছুড়েই সে সটান শক্ত হয়ে গেল। সমস্ত শরীরে ঢেউয়ের মতো দোলা দিয়ে বেরিয়ে এল অন্তিম একটা দীর্ঘশ্বাস, নাকের সামনে থেকে খানিকটা ধুলো উড়ে গেল হাওয়ায়।
হইহই করে ছুটে এল জনতা। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। মরে পাথর হয়ে গেছে গুণিন। ঢাকের বোল থেমে গেল, স্তব্ধ হয়ে গেল কাঁসরের আর্তনাদ। স্তম্ভিত জনতা এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ, নিদারুণ ভয়ে একটি কথাও কেউ বলতে পারলে না।
একজন বললে, নিশ্চয় অশুচি হয়ে পুজোয় বসেছিল, তাই… ধুনোর অন্ধকারে ব্রণ-চিহ্নিত শীতলার পাথরটা গাঢ় রক্তের মতো খানিক সিঁদুর মেখে ক্ষুধার্ত হয়ে তাকিয়ে আছে। অশথের পাতায় সাঁ সাঁ একটা উদাস বাতাস বয়ে গেল। যেন একটা অশরীরী কণ্ঠ চাপা গর্জন করে বলে গেল—এবার তোদের পালা, গুণিনের মতো তোরাও…
মুহূর্তে বারোয়ারিতলা জনশূন্য। প্রাণ নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়েছে সকলে। শুধু অসমাপ্ত পুজোর উপকরণের সামনে নিস্পন্দ হয়ে পড়ে রইল গুণিনের দেহটা। মুখের পাশে রক্তের চাপ ক্রমে ঘন হয়ে উঠতে লাগল, ধূপ আর গুগগুলের ধোঁয়া একটা কালো পর্দার মতো নিবিড় হয়ে নামতে লাগল তার চারপাশে।
গুণিনের আসল নাম অভিরাম দাস—জাতিতে চন্ডাল।
এই জাতিটা নাকি বর্ণসংকরের কঠিনতম শান্তির প্রতীক। প্রতিলোম বিবাহকে ক্ষমা করবে ব্রাহ্মণচালিত সমাজ, ব্রাহ্মণের মেয়ে হয়ে অব্রাহ্মণকে পতিরূপে বরণ করলে তাদের সন্তান হবে অন্ত্যজ। সমাজের সমস্ত পথ তার কাছে বন্ধ হয়ে যাবে। তাকে শ্মশানে বাস করতে হবে, অখাদ্য আহার করতে হবে, মড়ার কাপড় নিয়ে লজ্জা নিবারণ করতে হবে। তাদের ছায়া মাড়ালে খন্ডে যাবে, ক্ষয়ে যাবে সতেরো বার বিশ্বনাথ দর্শনের পুণ্য।
আজকাল অবশ্য অন্ত্যজ মাত্রেই শ্মশানের বাসিন্দা নয়। কিছু কিছু পদোন্নতি যে হয়েছে তাতে আর সন্দেহ কী। এখন তারা ভদ্রপাড়ার কাছাকাছি এগিয়ে এসেছে কিছুটা। শুয়োর চরায়, ডালা কুলো ধুনুচি তৈরি করে ভদ্রসমাজের দৈনন্দিনের পক্ষে সেগুলো অপরিহার্য। কেউ কেউ খেত করে, তরিতরকারি লাগায়, বিক্রি করে বাজারে। দু-একটা ভালো ফল ফুল উপহার দিলে ন্যায়রত্ন স্মৃতিরত্নেরা খুশিমনেই সেগুলো গ্রহণ করে থাকেন, অবশ্য নেবার সময় কিছু কিছু গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেওয়া হয় তাতে। কিন্তু এ ছাড়াও আর একটা দিক আছে এদের। সেজন্যে ইতর ভদ্র নির্বিচারে ভয় করে এদের, শ্রদ্ধা করে। এরা মন্ত্রসিদ্ধ।
