কিন্তু শুকলালের মুখে কথা নেই—যেন পাথর।
গাড়ির ভেতর থেকে বেরুল সাহেবের দেহ। মাথাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, ঘিলু আর রক্ত পড়ছে গড়িয়ে। হাত-পাগুলো বেঁকে দুমড়ে কচ্ছপাকার ধারণ করেছে সাহেব। আর গাড়ির তলা থেকে বেরুল সোনা। সোনা? না, ঠিক সোনা নয়। নাক-মুখ-শরীর সমস্ত চেপটে একটা অমানুষিক বীভৎসতা। রাঢ়ের তৃষ্ণার্ত রাঙামাটিও অত রক্ত শুষে খেয়ে ফেলতে পারেনি, থকথকে খানিকটা কাদার সৃষ্টি হয়েছে। কালো সাঁওতালের রক্ত যে অত লাল কে জানত? আশ্চর্য, ভারী আশ্চর্য! সাহেবের রক্তের রঙের সঙ্গে তার কোনো তফাত নেই!
যুদ্ধের ক্যাজুয়ালটি। অমন কত হয়, অমন কত হয়েছে; কে তার খবর রাখে, কে তা নিয়ে নিজেকে বিব্রতবোধ করে? ডিফেন্স লাইন তৈরি করতেই হবে—বৃহত্তর প্রয়োজনের জন্যে, অসুরদের নিপাত করে ধর্মরাজ্য সংস্থাপনের জন্যে। একটা সাঁওতাল মেয়ের মৃত্যু, তার জন্যে মাটিকাটা বন্ধ থাকবে না—মাটি ফেলাও না।
ফিরে এল শুকলাল। এক ফোঁটা চোখের জল ফেললে না, বুক চাপড়ে হাহাকার করে উঠল না এক বারও। ভৈরব পাহাড়ের দেবতা শোধ নিয়েছেন, পরিচয় দিয়েছেন তাঁর ক্ষমতার, তাঁর দোর্দন্ড দুরন্ত প্রতাপের।
টাট্টুঘোড়ায় চড়ে আসছিলেন হরিকৃষ্ণ রায়। দূরের গ্রামে আরও কুলি সংগ্রহের চেষ্টায় গিয়েছিলেন তিনি। এ এক মন্দ ব্যাবসা নয়, বেশ দু-চার পয়সা কমিশন আসছে হাতে। আনন্দে উৎসাহে বুড়ো ঘোড়াটাকে তাড়না করতেও ভুলে যাচ্ছিলেন তিনি, ঘোড়াটা ইচ্ছেমতো থেমে থেমে চলছিল।
শুকলালকে দেখে কষ্ট হল হরিকৃষ্ণ রায়ের। আ…হা বেচারা! বউটাকে সত্যিই বড়ো ভালোবাসত। ঘোড়া থেকে নামলেন তিনি। পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, কষ্ট করে আর কী করবি শুকলাল? কপালে যা ছিল তাই হয়েছে।
কথা বললে না শুকলাল, থেমেও দাঁড়াল না। যেন হরিকৃষ্ণ রায়কে সে দেখতেই পায়নি। অলস শ্রান্ত গতিতে যেমন যাচ্ছিল, তেমনই চলে গেল। শুধু তার অর্থহীন শূন্য দৃষ্টিটা দূরে আকাশের কোলে গিয়ে পড়তে লাগল, যেখানে লতাকুঞ্জে আচ্ছন্ন হয়ে ভৈরব পাহাড় স্তব্ধ একটা ধ্যানস্থ মূর্তি।
বহুদিন পরে মরচে-পড়া কুলটায় শান দিয়েছে শুকলাল, তারপর পাহাড়ে উঠে পাগলের মতো গাছ কাটতে শুরু করে দিয়েছে।
পাহাড় তার ওপরে প্রতিশোধ নিয়েছে, সেও পাহাড়কে ক্ষমা করবে না। দু-হাতে সে ডাইনে–বাঁয়ে যা পাচ্ছে কেটে চলেছে। পাহাড়টাকে আজ সে ন্যাড়ামুড়ো আর নির্মূল করে দেবে। এক বার যাচাই করে দেখবে তার শক্তি বেশি না দেবতার প্রতাপটাই বড়ো।
মাথার ওপরে তেমনি আগুন-ঝরানো সূর্য। পাহাড় তেমনি উত্তাপের বাষ্পনিশ্বাস ছাড়ছে। তৃষ্ণায় বুকের ভেতরটা তেমনি খাঁ-খাঁ করছে। চোখে ধোঁয়া দেখতে লাগল শুকলাল, কানের মধ্যে ঝাঁঝাঁ করতে লাগল।
তখনই মনে পড়ল ভোগবতীকে। রুক্ষ পাহাড়ের বুক থেকে উচ্ছলিত স্নেহধারা। পলাশ আর পিয়াশাল গাছের নীচে ঝিরঝির করে বয়ে চলেছে। ছোটো গর্তের ভেতর যেখানে একটুখানি জল জমেছে, সেখানে পাখা ঝেড়ে ঝেড়ে স্নান করছে নীলকণ্ঠ পাখি।
তার ঠাণ্ডা মিষ্টি জল। বহুদিনের অনাস্বাদিত সুধার পাত্র। টলতে টলতে ঝরনার দিকে ছুটে এল শুকলাল, কিন্তু কোথায় ভোগবতী?
তার চিহ্নমাত্র নেই। নেই বেলোয়ারি চুড়ির হালকা ঝংকার সেই নীলকণ্ঠ পাখি। যেখানে ঝরনা ছিল সেখানে কালো অজগরের মতো মোটা একটা লোহার নল। পাহাড়ের মাথার ওপর দিয়ে সে-নলটা ঘুরে চলে গেছে, কোথায় গেছে বুঝতে কষ্ট হল না শুকলালের।
এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়াল শুকলাল। ওই কালো লোহার সাপটা মাটির তলায় তার হিংস্র মাথাটা ডুবিয়ে দিয়ে তাদের ভোগবতীকে চুষে খেয়ে নিয়েছে। ভোগবতীর জল—ঠাণ্ডা মিষ্টি দুধের মতো জল তার সরীসৃপ দেহের বিষসঞ্চয়কে পুষ্ট করছে আজ। তার সেই বিষে সোনা মরে গেছে, শুকলাল মরবে, আরও অনেকে মরবে। কেউ বাঁচবে না, কেউ নয়।
কেউ বাঁচবে না। কেউ বাঁচবে না। শুকলালের মাথার ভেতর সব কিছু যেন আতসবাজির ফুলঝুরি হয়ে ঝরে পড়তে লাগল। কুড়লটা তুলে নিলে হাতে, প্রচন্ড শক্তিতে ঘা বসাল অজগরটার গায়ে।
ঝনঝন করে একটা বিরাট শব্দে পাহাড় কেঁপে উঠল। আর এক ঘা, আর এক ঘা। কুড়ালের ফলা কুঁকড়ে এল কিন্তু লোহার সাপটা টোল খেল না।
হু ইজ দেয়ার?
পাহাড়ের মাথা থেকে প্রশ্ন। রাইফেল হাতে সেন্ট্রি দেখা গিয়েছে।
হু ইজ দেয়ার?
শুনতে পেল না শুকলাল, জবাব দিলে না। আরও এক ঘা, এইবার একটু দাগ পড়েছে মনে হচ্ছে। আর এক ঘা।
স্যাবোটেজ।
পাহাড়ের মাথা থেকে অব্যর্থ লক্ষ্যে ছুটে এল রাইফেলের গুলি।
মুখ থুবড়ে পড়ে গেল শুকলাল। চেতনার শেষ বিন্দুটুকু মুছে যাওয়ার আগে টের পেল তার পিপাসাকাতর মুখে কে যেন জল দিচ্ছে। ভোগবতীর ধারা কি মুক্ত হয়ে গেল? কিন্তু সে-জল তো এমন গরম নয়, এমন নোনতা নয়। নিজের রক্ত লেহন করতে করতে লোহার পাইপটার ওপরে মাথা রেখে স্থির হয়ে গেল শুকলাল। মিলিটারি কলোনিতে ট্যাপের মুখে ভোগবতীর স্নিগ্ধ জল ঝরে পড়ছে শত ধারায়। সে-জল তেমনই নির্মল, তেমনই স্বচ্ছ; শুকলালের রক্তের এতটুকুও লালের আভাস তাতে লাগেনি।
মৃত্যুবাণ
গুণিনের ওপর শীতলার ভর হল। গাঁয়ের বারোয়ারি অশথতলা। তার নীচে পুরানো বেদিটা প্রদীপের তেল আর মেটেসিঁদুরে একটা বিচিত্র রং ধরেছে। নীল শ্যাওলার ওপর দিয়ে কালো পোড়া তেল ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ছে। একপাশে থকথকে সিঁদুর জমেছে চাপবাঁধা রক্তের মতো। ধুনোর গন্ধে যেন নিশ্বাস আটকে আসে।
