হাত আটেক লম্বা একটি শঙ্খচূড়। উজ্জ্বল, মসৃণ চিত্রিত দেহে আরণ্যক বিভীষিকা।
গৌরী পিছিয়ে যাচ্ছিল, নৃপেন তার হাতটাকে আঁকড়ে ধরলেন। এত জোরে ধরলেন যে গৌরীর হাড়টা মড়মড় করে উঠল।
পালাচ্ছিস কেন? দাঁড়া, এইবারেই তো মজা শুরু হবে!
বাক্স যারা বয়ে এনেছিল, তারা একবার এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে সরে পড়ল সেখান থেকে। শুধু আম গাছটার ছায়ার নীচে নিশ্চিন্ত মনে বসে বসে ঝিমুতে লাগল বৃন্দাবন—সে চোখে দেখতে পায় না, কানেও শুনতে পায় না।
গৌরী বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
খাঁচায় ঢুকে বাঘটা সবে শ্রান্তভাবে বসে পড়েছিল, চাটতে শুরু করেছিল সামনের একটা থাবা। শঙ্খচূড়ের গর্জন শোনামাত্র বিদ্যুদবেগে সে উঠে দাঁড়াল।
প্রতিদ্বন্দ্বী তার পাশে, মাত্র এক ইঞ্চি সরু একটা জালের ব্যবধানে। সেই জালের ওপারে সে লতিয়ে লতিয়ে উঠতে চাইছে, তার চোখ দুটো এই দিনের আলোতেও দু-টুকরো সিগারেটের আগুনের মতো জ্বলছে।
বাঘটা পায়ে পায়ে একেবারে খাঁচার এপারে সরে এল। একটা অতিকায় বিড়ালের মতো ফুলে উঠল তার গায়ের রোঁয়াগুলো। হিংস্র হাসির ভঙ্গিতে দাঁতগুলো বের করে চাপা স্বরে সেও একটা গর্জন করল। কিন্তু সে গর্জনে বীরত্ব প্রকাশ পেল না। তার চোখ দুটোয় ফুটে উঠল মর্মান্তিক ভয়ের ছায়া।
শিরদাঁড়া ধনুকের মতো বাঁকিয়ে নিয়ে সাপটা ফণা বিস্তার করল। তারপর আবার একটা তীব্র শিসের শব্দ করে প্রচন্ড বেগে ছোবল মারল পার্টিশনের গায়ে। সমস্ত খাঁচাটা ঝনঝন করে উঠল। দুর্বলভাবে একটা থাবা তুলে লেপার্ডটা অস্ফুট গর্জন করল—গররর…
নৃপেন রায় মেয়ের দিকে তাকালেন। হ্যাঁ, প্রাণ জেগে উঠেছে, ভাষা জেগে উঠেছে। গৌরীর চোখে; ঝলমল করে উঠেছে কৌতূহলের আলোয়। শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছে। একটা অদ্ভুত প্রত্যাশায়।
সাপটা এবার ফণা তুলে দাঁড়িয়ে রইল। উদ্ধত আহ্বানের মতো হেলতে লাগল ডাইনে বাঁয়ে। সিগারেটের আগুনের মত চোখে ফুটে উঠল একটা বিষাক্ত নীলিম দীপ্তি। লেপার্ডটা এক বার লেজ আছড়াল, নির্নিমেষভাবে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল শঙ্খচূড়ের দিকে, তারপর যেন মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল পার্টিশনের ওপরে।
এইবার সাপটার পিছিয়ে যাওয়ার পালা। কিন্তু ভয়ের আভাস নেই, শুধু আত্মরক্ষার চেষ্টা। তারপরেই নিজেকে আবার দৃঢ় করে নিয়ে খাঁচা-ফাটানো ছোবল বসিয়ে দিলে।
বিদ্যুদবেগে বাঘ সরে এল খাঁচার নিরাপদ কোণে। কান্নার মতো আওয়াজ তুলল, গর-র-র…
গৌরী নেচে উঠল। হাততালি দিয়ে হেসে উঠল, বা-বা, কী চমৎকার!
তারপর সারাটা দিন ধরে চলল সেই অমানুষিক স্নায়ুযুদ্ধ। সন্ধ্যার দিকে ক্লান্ত বাঘটা খাঁচার মাঝখানে এলিয়ে পড়ল। কিন্তু তাকে তো ছুটি দেবে না গৌরী। একটা ছটো লাঠি দিয়ে বাইরে থেকে খোঁচা দিতে লাগল বার বার। আর বাঁচবার শেষ আকুতিতে থেকে থেকে ক্ষুব্ধ কান্নায় খাঁচার এদিক-ওদিক ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল বাঘটা।
সারাদিনের মধ্যে গৌরীকে নড়ানো গেল না খাঁচার সামনে থেকে। হিংস্র আনন্দে থেকে থেকে চেঁচিয়ে উঠতে লাগল, কী চমৎকার!
অনেক রাতে ঘুমন্ত গৌরীকে খাঁচার সামনে থেকে টেনে উঠিয়ে নিয়ে গেল বৃন্দাবন।
রাত তখন প্রায় দুটো হবে। গৌরী উঠে বসল। রক্তের মধ্যে একটা অস্থির চঞ্চলতা। বিছানা থেকে সে নেমে পড়ল, সামনের টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিলে নৃপেন রায়ের হান্টিং টর্চটা।
পাশের ঘরে নাকের ডাকের শব্দ। পায়ে পায়ে বারান্দায় বেরিয়ে গেল সে। টর্চের আলোয় দেখা গেল কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে সাপটা। বাঘটা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে খাঁচার কোনায়। অধৈর্যভাবে খাঁচার গায়ে কয়েকটা টোকা মারতে শঙ্খচূড় এক বার নড়ে উঠল, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না লেপার্ডের তরফ থেকে।
ছোটো লাঠিটা কুড়িয়ে এনে বাঘকে খোঁচা দিলে গৌরী। নড়ল না, গর্জে উঠল না অসহায় যন্ত্রণায়। টর্চের তীব্র আলোয় বুঝতে পারা গেল-সীমাহীন ভয়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে শিথিল স্নায়ু নিয়ে সে ঢলে পড়েছে।
কিন্তু শঙ্খচূড় উঠে দাঁড়িয়েছে। উঠে দাঁড়িয়েছে শিরদাঁড়ায় ভর দিয়ে। প্রতিদ্বন্দ্বীপ্রতিদ্বন্দ্বী চাই তার। পার্টিশনের ওপর আবার একটা ভয়ংকর ছোবল পড়ল, কিন্তু তার শত্রু আর নড়ল না-নড়বেও না আর। হতাশায় ক্ষোভে গৌরী চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। সহ্য করতে পারছে না। তার সমস্ত জান্তব বোধকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে একটা প্রাগৈতিহাসিক হিংস্র আনন্দ। উপায় চাই, উপকরণ চাই। নেশা চাই তার। যেমন করে হোক, যে উপায়েই হোক।
কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে থেকে গৌরী খাঁচাটায় সজোরে একটা ধাক্কা দিলে। সরল না। আর একটা ধাক্কা আরও জোরে। খাঁচার কাঠের চাকাগুলো গড়গড় করে এগিয়ে গেল কয়েক পা। আর একটু ঠেলে দিলেই নৃপেন রায়ের দরজা। অনেক রাত পর্যন্ত মদ খেয়ে নৃপেন রায় মেজের ওপরেই পড়ে আছেন, দরজা বন্ধ করে দেবার সুযোগ তাঁর হয়নি।
…শঙ্খচূড়ের গর্জনে আতঙ্কবিহ্বল নৃপেন রায় উঠে দাঁড়ালেন। তখনও নেশায় টলছেন, তখনও চোখের দৃষ্টি আচ্ছন্ন। দেখলেন আট হাত লম্বা আরণ্যক বিভীষিকা তাঁর মুখের দিকে স্থির তাকিয়ে আছে—হেলছে দুলছে, চোখে নীল হিংসার খরদীপ্তি!
এক লাফে দরজার দিকে সরে গেলেন। টানতে গেলেন প্রাণপণে, দরজা খুলল না। গৌরী বাইরে থেকে শিকল বন্ধ করে দিয়েছে।
