মাটির বুক থেকে ঢেউয়ের মতো হঠাৎ সোজা উঠে নীলিম রেখায় দিগন্তের দিকে তরঙ্গিত। হয়ে গেছে। ওখানে রুক্ষ মাটি, কঠিন পাথর। কিন্তু সে-মাটি, সে-পাথর এ জাতের নয়। তাদের ঘিরে ঘিরে উঠেছে প্রকৃতির অকৃপণ শ্যামলতা—শতমূলী অনন্তমূলী থেকে শুরু করে ছোটো আবলুস আর পাহাড়ি বাঁশের ঝাড়। সেখানে পাথরের আড়ালে আড়ালে বেগুনি ফুলে আকীর্ণ লজ্জাবতী সংকুচিত হয়ে আছে। সেখানে বেঁটে পলাশের ছায়ায় ফুটেছে ভুইচাঁপা, বাতাসে ভাসছে বনগোগালাপের গন্ধ। আর আর পাথর চুইয়ে নামছে একটি ছোটো ঝরনা, বনের ভেতর যেন একটি সাঁওতাল মেয়ের হাতে ঠিন ঠিন করে বেলোয়ারি চুড়ির সুর বাজছে। তার জলের রং জ্যোৎস্নার মতো উজ্জ্বল, তার স্বাদ দুধের মতো মিষ্টি আর তা বরফের মতো ঠাণ্ডা। মরা দিঘির কাদাজলের মতো তা বুকটাকে পুড়িয়ে দেয় না, তার দিকে তাকালেই আর ক্লান্তি থাকে না কোথাও।
কিন্তু ভৈরব পাহাড় অনেক দূরে। এখানে মাটি কাটা হচ্ছে, পাথর-জড়ানো রাঙামাটি। পথ তৈরি হলে বড়ো বড়ো গাড়ি আসতে পারবে আসানসোল থেকে। তাই দু-হাত ভরে মিলিটারি ওদের মজুরি দিচ্ছে। এখন আর মহুয়া গাছের নীচে শিলাপটে খোদাই করা বাবাঠাকুর ওদের ইষ্টদেবতা নয়, তার জায়গা দখল করেছে অতিচেতন এবং অতিসজাগ ওই সাদা চামড়ার লোকটা। নীল চশমার ভেতর দিয়ে শানিত চোখে ওদের কাজ দেখছে আর বোতল টানছে!
এই কুলি, ঠারো মত, ঠারো মত! ফুরতিসে কাম চালাও-জলদি!
বহুত ধুপ হুজুর।
ওঃ, ধুপ! ধুপ! মরদ লোগকা ধুপসে কেয়া ডর হ্যায়? ডেভিল টেক ইউ লেজি ব্রুটস…
গাল দেয় সাহেব, হাত ভরে পয়সা দেয়, মদ দেয়। কিন্তু কী দিতে পারে ভৈরব পাহাড়? কিছু খড়ি, কিছু ছায়া আর আর পাতাল-ফুড়ে-ওঠা ভোগবতীর ঠাণ্ডা মিষ্টি জল। ঝরনার পাশে আজ আর কেউ বসে না; শুকলাল নয়, সোনা নয়, অন্য সাঁওতালেরাও নয়। সেখানে এখন নিশ্চিন্তে নীলকণ্ঠ পাখিরা স্নান করে, পাখা ঝাড়ে আর মিষ্টি গদগদ গলায় এ ওর সঙ্গে প্রেমালাপ করে হয়তো।
কিন্তু সাহেবের দেওয়া মদ ভুলিয়ে দেয় ভোগবতীকে। তার স্বাদ মিষ্টি নয়, তেতো বিষের মতো তেতো। রক্ত জুড়িয়ে যায় না, জ্বলে ওঠে। মুহূর্তে ভৈরব পাহাড় সরে যায় দৃষ্টির সামনে থেকে। পাগলের মতো কোদাল তুলে নেয় শুকলাল, ঝুড়ি মাথায় করে সোজা হয়ে দাঁড়ায় সোনা। দুপুরের রোদ আর মদের নেশা শরীরের ভেতরে একটা আসুরিক মত্ততা সৃষ্টি করে। অদম্য অন্ধবেগে যেন ওরা ভেঙে পড়তে চায়, টুকরো টুকরো হয়ে বিদীর্ণ হয়ে যেতে চায়। প্রবল বেগে অনিচ্ছুক মাটির বুকের ভেতরে কোদালের আঘাত নেমে আসে। পাথরে গায়ে ঘা লাগে, যেন শোনা যায় মাটির তলা থেকে মা বসুমতীর চাপা যন্ত্রণার গোঙানি।
তারপরে দিনান্তে শুকলাল আর সোনা ফিরে রওনা হয় ঘরের দিকে।
মদের নেশা তখন কেটে গেছে, শরীরে ঘনিয়েছে দ্বিগুণ শ্রান্তি আর অবসাদ। পা জড়িয়ে জড়িয়ে দুজনে মূৰ্ছিতের মতো এগিয়ে চলে। আকাশের প্রান্তরেখায় প্রথম প্রেমের মতো অপূর্ব কোমল মাদকতা নিয়ে সন্ধ্যাতারা দেখা দিয়েছে। দিগন্তে কালো আর করুণ হয়ে আছে ভৈরব পাহাড়, যেন একটা অতিকায় ভালুক শিকারির গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে আছে।
দুজনে তাকায় সেদিকে। দুজনেরই একসঙ্গে একই কথা মনে হয়।
শুকলাল বলে, সোনা চল, কাল থেকে আবার আমরা কাঠ কাটব।
সোনা মাথা নাড়ে, জবাব দেয় না। অকারণে তার ইচ্ছে করতে থাকে মজুরির টাকাগুলো পথের ওপর ছুড়ে ছড়িয়ে ফেলে দেয়।
শুকলাল বলে, মাটি কাটতে ভালো লাগে না। কাঠুরে ছিলাম বেশ ছিলাম রে।
সোনা তেমনি নিরুত্তরে মাথা নাড়ে। অন্ধকার পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে মনে হয় যেন ওটা অভিমানে ম্লান হয়ে আছে। লজ্জা হয় সোনার, অপরাধবোধ জাগে মনের মধ্যে। একটু পরে জবাব দেয়, ঠিক।
কিন্তু রাত্রি কাটে, দিন আসে, সন্ধ্যার সংকল্প মনে থাকে না কারও—শুকলালেরও নয়, সোনারও নয়। আবার শাবল-গাঁইতির ঝকঝকে ফলা মাটির বুক কুরে কুরে বার করতে থাকে। মদের নেশা আর দুপুরের রৌদ্র বিষ হয়ে আবর্তন করে রক্তের ভেতরে। শুকলালের কোদাল পড়তে থাকে ঝনঝন ঝনাৎ–
ওরা ভৈরব পাহাড়কে ভুলেছে, ভৈরব পাহাড় ওদের ভোলেনি।
তাই হয়তো মহুয়া গাছের নীচে একদিন জেগে উঠলেন শিলাপটে আঁকা বাবাঠাকুর। তাঁর মাথার ওপরে গর্জন করে উঠল সিংহ, তাঁর হাতে ঝিকিয়ে উঠল তরোয়াল। নিজের শক্তির পরিচয় দিলেন।
রাস্তা অনেকখানি তৈরি হয়ে গেছে, ভারী ভারী গাড়ির যাতায়াতের সংখ্যাও বেড়েছে অনেক। সেই গাড়িগুলোর একটা সেদিন বেসামাল হয়ে বসল। ড্রাইভারের মদের মাত্রা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল বোধ হয়। হঠাৎ কোথা থেকে কী হল—হাত থেকে পিছলে গেল স্টিয়ারিং। পথের পাশে বড়ো একখানা বেলেপাথরের গায়ে আচমকা ধাক্কা খেল গাড়িটা, তারপর সোজা একটা ডিগবাজি খেয়ে পথের উলটো দিকে গিয়ে চিত হয়ে পড়ল। কুলি মেয়েরা ঝুড়ি ভরে মাটি ফেলছিল সেখানে।
এক মিনিটের মধ্যে যা হওয়ার তা হয়ে গেল।
উলটানো গাড়িটার সামনের চাকা দুটো আকাশের দিকে উদ্যত হয়ে বিষ্ণুচক্রের মতো ঘুরলে খানিকক্ষণ। একটা প্রলয়ংকর ঝড়ের মতো ঝুরোমাটি চারদিকে ছিটকে যেতে লাগল। তাঁবু থেকে সাহেবরা ছুটে এল, চেঁচামেচি জুড়ে দিলে কুলিরা।
