বিমানটা কিন্তু নামল না। বার কয়েক পাহাড়ের মাথায় ঘুরপাক খেয়ে সাঁ করে একটা তিরের মতো বানপুরের দিকে দেখতে দেখতে উধাও হয়ে গেল। শুধু নির্মেঘ আকাশে অনেকক্ষণ ধরে একটা ধূমপুচ্ছ দীর্ঘ রেখায় বিস্তীর্ণ হয়ে রইল—যেন ধূমকেতুর সংকেত।
দু-দিন পরে পাহাড় থেকে কাঠের বোঝা নিয়ে নামবার পরে দেখা হরিকৃষ্ণ রায়ের সঙ্গে।
হরিকৃষ্ণ রায় এই পাহাড়ের মালিক পালবাবুর গোমস্তা। একটা হাড়-বের-করা টাট্টুঘোড়াকে শায়েস্তা করতে করতে আসছিল। পাঁজরের ওপরে জুতোর ঠোক্কর খেতে খেতে ঘোড়াটা যেভাবে এগোচ্ছিল, তাতে মনে হচ্ছিল যেকোনো সময় সে মুখ থুবড়ে ধরাশয্যা গ্রহণ করবে।
ওদের দেখে হরিকৃষ্ণ রায় ঘোড়ার রাশ টানল। কিন্তু রাশ না টানলেও সেটা এমনিই থামত।
খড়ির বোঝাটার দিকে একটা তির্যক কুটিল কটাক্ষ করলে হরিকৃষ্ণ।
বেশ মনের আনন্দে গাছ কাটছিস, অ্যাঁ?
দুটো খড়ি নিলাম খালি।
দুটো খড়ি! দুটো দুটো করে নিয়েই তো পাহাড়ের গাছপালাগুলো সব সাবাড় করে দিলি। বাবু ভালোমানুষ বলে করে খাচ্ছিস, কেমন?
জবাব না দিয়ে আপ্যায়নের হাসি হাসলে শুকলাল। তিরস্কারের মধ্যেও প্রচ্ছন্ন স্নেহের সুর আছে হরিকৃষ্ণের। তার মুখটাই খারাপ, মনটা নয়।
দাঁড়া, মিলিটারি আসছে। দু-দিনেই তোদের ঠাণ্ডা করে দেব।
কে আসছে বাবু?
মিলিটারি–মিলিটারি, মানে পল্টন। মাথার ওপর দিয়ে হাওয়াই জাহাজ গেল, দেখলি? এখানে কাঠের মধ্যে আস্তানা গাড়বে—দেখিস তখন।
কথার শেষে হরিকৃষ্ণ ঘোড়ার পিঠে একটা চাবুক বসাল। চিড়চিড় করে লাফিয়ে উঠে ঘোড়াটা তিন-পা দৌড়ে গেল, তারপর আবার গজেন্দ্রগতি।
সোনা পাংশুমুখে জিজ্ঞাসা করলে, আকাশ থেকে ওরা নেমে আসবে এখানে?
গম্ভীর চিন্তিত দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকাল শুকলাল। কয়েক মুহূর্ত পরে জবাব দিলে, হুঁ।
তারও পরে মাত্র একটা মাস। সব কিছু অদলবদল হয়ে গেল। পৃথিবীর রূপ পালটে গেল, পালটে গেল সোনা আর শুকলাল। সেই বুড়ো টাট্টু ঘোড়ায় চড়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াল হরিকৃষ্ণ রায়। ছড়ালে মিষ্টি কথা, ছড়ালে টাকা। চাষি সাঁওতালের লাঙল খসে পড়ল, খেড়ে সাঁওতালের ধনুক আর রইল না, মরচে ধরল কাঠুরেদের কুড়লে। তার জায়গায় চকচকে হয়ে উঠল শাবল, ঝকঝকে হল কোদাল।
যুদ্ধের অবস্থা আশাপ্রদ নয়। সীমান্ত থেকে দুঃসংবাদ আসছে। পশ্চাদপসারণ যদি করতে হয় তাহলে আগে থেকে তার ব্যবস্থা করা দরকার। সুতরাং এই অঞ্চলটাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য ডিফেন্স লাইন গড়ে তোলা হতে লাগল।
রাঙা কাঁকরের টানা পথ ঘুমিয়েছিল শাল-পলাশের ছায়াকুঞ্জের ভেতরে। তাকে ক্ষতবিক্ষত বিধ্বস্ত করে এল জিপ, এল লরি। কাঠ এল, তাঁবু এল, বিচিত্র যন্ত্রপাতি এল আর তার সঙ্গে সঙ্গে এল বিচিত্ৰতর মানুষ। রাঢ়ের অনুর্বর মাঠের ভেতর জাঁকিয়ে বসল কলোনি, একটা ছোটো এরোড্রোম। দেশটা যেন হাজার বছরের একটানা ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠল যন্ত্রযুদ্ধের বাস্তবতম নির্মম পরিবেশের ভেতর।
সহজ হয়ে গেছে শুকলাল আর সোনার। অভ্যস্ত হয়ে গেছে বুনো সাঁওতাল, গৃহস্থ সাঁওতালদের। আজ আর ওদের ভেতরে জাতি-গোত্রের ভেদ নেই। একটি মন্ত্রবলে ওরা সবাই এক হয়ে গেছে—ওরা কুলি। নিজেদেরই ওরা এখন আর চিনতে পারে না। টাকা পায়, খেতে পায়—পায় বিস্কুট, টিনের দুধ আর চকোলেট। মেজাজ প্রসন্ন থাকলে মাঝে মাঝে কারও কিটব্যাগ থেকে এক-আধটা লাল রঙের বেঁটে চেহারার বিয়ারের বোতলও ওদের দিকে এগিয়ে আসে। মহুয়া আর ভাত-পচানো হাঁড়িয়ার চাইতে তার স্বাদ ঢের ভালো।
আর ওরা কাজ করে। আসানসোলের দিক থেকে বড়ো বড়ো মোটর গাড়ি যাতে নির্বিঘ্ন পাড়ি জমাতে পারে, তারই জন্যে পথ তৈরি করে ওরা। কঠিন লালমাটিতে শাবল-গাঁইতির ঘা পড়ে ঝনঝনিয়ে। মাটি সহজে আমল দিতে চায় না, তার তলায় তলায় ছোটো-বড়ো পাথর শাবলের ফলা দুমড়ে দেয়, কোদাল ছিটকে বেরিয়ে আসে। তবু মাটি কাটতেই হবে— পথকে বাড়াতে হবে, বড়ো করতে হবে। শুকলালেরা ঘর্মাক্ত দেহে আসুরিক শক্তিতে মাটিকে কেটে নামায় আর সোনারা ঝুড়ি ভরে ভরে সেই মাটি নিয়ে ফেলে পথের পাশে।
মাথার ওপরে দুপুরের সূর্য জ্বলে। নিষ্ঠুর, করুণাহীন। পাহাড়ের পাথর আর পাথুরে মাটিতে তার উত্তাপের কোনো তারতম্য ঘটে না। সাঁওতালের কালো শরীর থেকে রক্ত-জল করা সাদা ঘাম মাটিতে ঝরে পড়ে, তৃষ্ণার্ত পৃথিবী যেন এক চুমুকে তা চোঁ করে শুষে নেয়। ওদের অনাবৃত পেশল সিক্ত পিঠগুলো রোদের আলোয় জ্বলতে থাকে, ঘাড়ে কপালে লবণের গুঁড়ো চিকমিক করে। অস্ত্ৰাহত পাথরের টুকরোগুলো ছিটকে ছিটকে এসে চোখে-মুখে আঘাত দিয়ে যায়—অসহায় পৃথিবীর যেন ক্ষীণ সহিংস প্রতিবাদ। একটু দূরে খোলা তাঁবুর ছায়ায় টেবিল-ফ্যান খুলে বসে নগ্ন-গাত্র সাদা সাহেব কাজের তদারক করে ওদের। নীল চশমাপরা চোখের ভেতর থেকে উগ্র দৃষ্টিক্ষেপণ করে, গাল দেয় আর একটার পর একটা বোতল শূন্য হয়ে টেবিলের নীচে গড়াগড়ি খেতে থাকে।
কাজ করে সোনা, কাজ করে শুকলাল। রোদে চাঁদি পুড়ে যায়। পিপাসায় টাকরার ভেতর যেন পিন ফুটতে থাকে। সামনে একটা মরা দিঘির দুর্গন্ধ কাদাজল, সেই জল খেয়ে ওরা পিপাসা দূর করার চেষ্টা করে।
আর তখনি চোখে পরে দূরে ভৈরব পাহাড়।
