শুকলাল বললে, ভারি গরম।
শ্রান্ত গলায় সোনা জবাব দিলে, এখন থাক। ঝোরার কাছে চল।
ঝোরা! মনে পড়তেই যেন শান্তি আর তৃপ্তির একটা স্নিগ্ধ অনুভূতি এসে সর্বাঙ্গ জুড়িয়ে দিলে ওদের। ঝোরা। এই বিস্তীর্ণ নির্মম পাষাণের বুকের ভেতর থেকে উচ্ছলিত ফন্তুর প্রবাহ। পাহাড়ের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় একটা ভাঁজ পড়ে যেখানে ছোটো একটা মালভূমির মতো সৃষ্টি হয়েছে, ওইখানে ছোটো অশ্বথ আর ছোটো পলাশের ছায়াকুঞ্জের ভেতর প্রকান্ড একখানা পাথরের তলা দিয়ে একটা ঝরনা নেমেছে এসে। এত বড়ো পাহাড়ে ওটা ছাড়া আর কোথাও একবিন্দু জল নেই। ওই জলটা কোথা থেকে নিঃশব্দ প্রবাহে যে বয়ে আসছে। কেউ বলতে পারে না। কিন্তু মাটির তলা থেকে উৎসারিত ভোগবতীধারার মতোই ওর ঠাণ্ডা আর মিষ্টি জল কঠিন পাহাড়টার মর্মবাহী স্নেহের মতো উছলে পড়ছে।
হাতের কুড়ল আর পিঠের বোঝা নামিয়ে রেখে পাথর বেয়ে বেয়ে ঝরনার পাশে এসে বসল দুজনে। চারপাশে নিবিড় ছায়া দুপুরের রোদে যেন ঝিমুচ্ছে। পাহাড়ে যে দু-চারটে বড়ো গাছ আছে—এখানেই যেন তারা সার বেঁধে রয়েছে। ইচ্ছে করেই ওদের গায়ে হাত দেয়নি কাঠুরেরা। রাঢ়ের আগুনঝরা দুপুরে পাথরের অসহ্য উত্তাপের ভেতর এখানে ওদের মরূদ্যান।
পাথরের তলা থেকে বেরিয়ে নীচে যেখানে ছোটো একটা গর্তের ভেতরে একটুখানি জল জমেছে, দুটো নীলকণ্ঠ পাখি পরমোল্লাসে সেখানে স্নান করছিল পাখা নেড়ে। মানুষের সাড়া পেয়েও তারা ভয় পেল না, ধীরেসুস্থে তারা ঠোঁট দিয়ে নিজেদের সদ্যস্নাত নরম পালকগুলোকে পরিষ্কার করে নিলে। তারপর মিষ্টিগলায় কী-একটা ডেকে লাফাতে লাফাতে বনের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল।
ততক্ষণে সোনা আর শুকলাল এসে বসেছে ছায়ার নীচে। মিঠে বাতাসে দুজনের ক্লান্তি যেন এক মুহূর্তে দূর হয়ে গেছে। সোনার কাছে আরও ঘন হয়ে এসে শুকলাল বলল, দেখলি?
কী দেখব?
ওই পাখি দুটো।
ওদের দেখবার কী আছে?
এতক্ষণ ওরা এখানে এ ওকে সোহাগ করছিল, চান করছিল। তুই আমি এলাম দেখে জায়গা ছেড়ে দিয়ে সরে গেল।
মুখের ভঙ্গি করে সোনা বললে, যাঃ।
হ্যাঁ, সত্যি!
ওরা কি এসব বোঝে?
বোঝে বই কী। সব বোঝে।
এবারে সোনা আরও কাছে ঘেঁষে এল শুকালের। তার খোঁপা থেকে একটা ফুল তুলে নিয়ে শুকলাল খেলা করতে লাগল।
বড়ো পিয়াস লেগেছে, জল খাই।
পলাশের পাতা ভেঙে নিয়ে দুটো ঠোঙা তৈরি করলে সোনা। ঠোঙা ভরে ভরে জল খেল দুজনে—ঠাণ্ডা জল, সুস্বাদু স্ফটিকের মতো জল। এই ঝোরা তাদের প্রাণ। যদি না-থাকত তাহলে কোনো কাঠুরের সাধ্য ছিল না এই পাহাড়ে এসে কাঠ কাটে। কাছাকাছি কোথাও জল নেই, শুধু এক মাইল দূরে একটা মরা নদী ছাড়া। দু-হাত বালি খুঁড়লে তা থেকে এক আঁজলা জল মিলতে পারে। নীরস অনুর্বরতার মাঝখানে এই ঝরনাটা একটা অপরিসীম বিস্ময়—যেন দৈবী করুণা। পাতালবাহিনী ভোগবতীর একটুখানি উদবেলিত স্নেহনির্যাস।
তৃপ্ত গলায় সোনা বললে, আঃ! ঠাকুরের দয়া দেখেছিস! পাথর-ফুড়ে কেমন জল দিয়েছে?
এবারে আর ঠাকুরকে নিয়ে ঠাট্টা করলে না শুকলাল। জলে ভিজে ভিজে সোনার একখানা ঠাণ্ডা হাত নিজের কড়া-পড়া মস্ত শক্ত মুঠোর মধ্যে জড়িয়ে নিলে। গভীর স্বরে বললে, সত্যি।
এবার উঠবি না মোড়ল? ওদিকে কাঠ আর কুড়ল পড়ে রইল যে।
থাক পড়ে, কেউ নেবে না। বস, আর একটু জিরুই। যা রোদ! একটু হেলে যাক।
দুজনে চুপ করে বসে রইল। অশ্বথের পাতা কাঁপছে, পলাশের পাতা কাঁপছে। বেলোয়ারি চুড়ির বাজনার মতো শব্দ করে পড়ছে ঝরনার জল, পাতার দোলানিতে মাঝে মাঝে চিকমিকে রোদ তার ওপরে খেলা করে যাচ্ছে। একখানা পাথর থেকে আর একখানার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বার সময় চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে হিরের গুঁড়ো। খানিক দূর গিয়ে তাকে আর দেখা যাচ্ছে না, আবার কোন পাথরের তলা দিয়ে পাতালের ফন্তু পাতালেই ফিরে গিয়েছে হয়তো।
রোদে ঝিমঝিম করছে পাহাড়, ঝিরঝির করছে হাওয়া। পাখির ডাক আসছে, সেই নীলকণ্ঠ পাখি দুটোই হয়তো। বেলোয়ারি চুড়ির মতো শব্দ করে তেমনি বাজছে ঝরনার একতারা। সোনা একটা গান ধরেছে, হয়তো ঝরনার সঙ্গে সুর মিলিয়েই। এমন সময় একটা বিজাতীয় শব্দে পাহাড়ের দিবাস্বপ্ন ভেঙে গেল।
তলিয়ে গেল নীলকণ্ঠ পাখির ডাক, ঝরনা আর সোনার মিলিত ঐকতান। শিকরে বাজের মতো বিশাল কালো একটা জানোয়ার আকাশে দেখা দিয়েছে। তার গর্জনে পাহাড়ের গুহা গহ্বরগুলো একসঙ্গে গুম গুম করে উঠল—যেন সাড়া দিয়ে উঠল আকাশচারী বিশাল জন্তুটার ডাকে, গম্ভীর ক্রুদ্ধ স্বরে কী-একটা প্রত্যুত্তর পাঠিয়ে দিলে একটা কুটিল জিজ্ঞাসার।
সোনা সোৎসাহে বললে, হাওয়াই জাহাজ।
শুকলাল বললে, তাই লাগছে পারা।
আয় দেখি।
ও আর কী দেখব। রোজই তো আসছে আজকাল, লড়াই বেঁধেছে কিনা।
আয়, আয়-না।
ঝরনার পাশ থেকে বেরিয়ে একটা বড়ো পাথরের ওপর দাঁড়াল ওরা। হাওয়াই জাহাজটা কোন খেয়ালে কে জানে, ওই পাহাড়টার চারিদিকেই ঘুরে ঘুরে চক্র দিচ্ছে। আরও আশ্চর্য! এত নীচে নেমে এসেছে যে ওর ভিতরের দু-তিনটে মানুষের মাথা পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ভয় পেয়ে সোনা শুকলালের পেছনে সরে এল, ওটা নামবে নাকি?
কে জানে। ওদের মর্জি!
সোনা বিস্ফারিত চোখে এরোপ্লেনটার দিকে তাকিয়ে রইল বিস্ময়ে নয়, ভয়ে। এই হাওয়াই জাহাজগুলো নাকি মানুষেরই কীর্তি। কিন্তু সোনার তা বিশ্বাস হয় না, তার আশঙ্কা হয় ওর ভেতরে অস্বাভাবিক একটা-কিছু লুকিয়ে আছে, একটা-কিছু অলৌকিক এবং ভয়ংকর। ঝড়ের রাত্রে যেসব ভূত-প্রেত-পিশাচ পাহাড়ে পাহাড়ে প্রচন্ড উল্লাসে নেচে বেড়ায়, ওই অস্বাভাবিক কান্ডটা যেন তাদেরই খেয়াল ছাড়া আর কিছু নয়। ওটা মাটিতে নেমে এলে যে কত বড়ো একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে, ভাবতেও ওর রক্ত জল হয়ে যায়।
