দূরের থেকে যে-পাহাড়টাকে কালবৈশাখী মেঘের মতো নিবিড় নীলবর্ণ বলে মনে হয়, ওর নাম ভৈরব পাহাড়। ওর সর্বাঙ্গে জঙ্গল, নিবিড় জঙ্গল। মাটি আর পাথরের ফাঁকে ফাঁকে জন্মেছে যেন প্রাগৈতিহাসিক অরণ্য। কিন্তু ছোটো পাহাড়টির মতো গাছগুলিও ছোটো ছোটো, জ্বালানি ছাড়া কোনো কাজেই তারা লাগে না।
এই পাহাড়ে কাঠ কাটতে এল শুকলাল আর সোনা।
ভোর হয়ে আসছে। বার্নপুরের আকাশে রক্তাভ ফিকে হয়ে আসছে, আর রাঙা রং ধরছে শুশুনিয়ার ছায়ামূর্তির আশেপাশে। হালকা-শিশিরে-ভেজা পাহাড়ি গাছগাছড়া আর রাঢ়ের রাঙামাটির বুক থেকে উঠছে প্রতিদিনের পরিচিত লঘু একটি মিষ্টি গন্ধ।
ঝাঁকড়া তিন-চারটে মহুয়া গাছের তলা থেকে এখনও রাত্রির অন্ধকার সরে যায়নি। সেটাকে পাশ কাটিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিল শুকলাল, পেছন থেকে সোনা তার হাত চেপে ধরলে।
এই মোড়লের পো, বাবাঠাকুরকে প্রণাম করলিনে?
থেমে দাঁড়িয়ে শুকলাল হাসল, ঠাকুরের ঘুম এখনও ভাঙেনি, জাগালে রাগ করবে। দেরি করিসনি সোনা, চল।
সোনা ভ্রুকুটি করলে, মশকরা করিসনে খালভরা। ঠাকুরকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করছিস, পাহাড়ে তোকে বাঘে ধরবে দেখিস। আয়, প্রণাম করে যা ঠাকুরকে।
নিজের পেশল শরীরটার দিকে এক বার তাকাল শুকলাল। পলিমাটির দুলাল নয়, পাথুরে দেশের পাথরে তৈরি দামাল ছেলে। বললে, বাঘের বরাত মন্দ না হলে বাঘ আমাকে ধরতে আসবে না।
থাক, থাক, খুব মরদ হয়েছিস। গলার স্বরে অবজ্ঞা ফোঁটাবার চেষ্টা করলেও সেটা ফুটল। কালো সাঁওতাল মেয়ের কালো চোখে আনন্দিত গর্বের আলোই ঝিলিক দিয়ে গেল। সত্যিই অহংকার করবার অধিকার আছে শুকলালের। তার কুড়লের ঘায়ে শুধু গাছগাছালিই নয়, শক্ত পাথর পর্যন্ত গুঁড়ো হয়ে যায়। শুকলালের চওড়া বুকের ওপর খেলা করে গেল সোনার সানুরাগ সস্নেহ দৃষ্টি।
আর তেমনি সপ্রেম গভীর চোখে সোনার ওপরে দৃষ্টি বুলিয়ে নিলে শুকলাল। শুশুনিয়া পাহাড়ের আকাশে রঙের সমুদ্রে ডুব দিয়ে রক্তপদ্মের মতো সবে ফুটে উঠেছে প্রথম সূর্য। সোনার যৌবনোজ্জ্বল দেহেও তার আভাস এসে পড়েছে—যেন তারও ভেতরে কোথায় পাঁপড়ি মেলেছে ভোরের পদ্ম। হাওয়ায় কাঁপা পদ্মপাতার শ্যামলতা তার ভেতরেও যেন হিল্লোলিত হয়ে উঠেছে।
চকিতে চোখ নামিয়ে নিলে সোনা। বললে, আয়, প্রণাম করবি।
মহুয়াকুঞ্জের তলায় ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার, অবসিত রাত্রি আর ছায়ার মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটছে এতক্ষণে। পাথরের ঠাকুরও বোধ হয় ঘুমভরা চোখ মেলে জেগে উঠেছেন, মহুয়া পাতার ফাঁকে ফাঁকে কালো গ্রানিটের ওপরে পড়েছে টুকরো টুকরো রঙের ফালি।
পাহাড়ের নীচে প্রতিহারী হয়ে আছেন বাবাঠাকুর। চওড়া একখানা শিলাপট্টমাটির ভেতরে আধাআধি পরিমাণে সমাহিত। তার মাথার ওপর ছেনি দিয়ে কাটা একটা সিংহের আকৃতি। নীচে অশ্বারোহী একটি বীরপুরুষের মূর্তি, তার প্রসারিত হাতে খোলা একখানা সুদীর্ঘ তরবারি; বোঝা যায় কোনো দিগবিজয়ী রাজা নিজের শৌর্যবীর্যকে অক্ষয় করে রাখবার প্রয়াস পেয়েছিলেন। শিলাপট্টের গায়ে কিছু কিছু লেখাও আছে, তার আভাস মাত্র পাওয়া যায়। বাকিটা তলিয়ে আছে মাটির নীচে, হয়তো ভবিষ্যৎ কালের কোনো প্রত্নতত্ত্ববিদের হাতে মুক্তির প্রতীক্ষায়।
কিন্তু এসব বোঝবার শিক্ষাদীক্ষা নেই সরল সাঁওতালের। গাছতলায় একটা বড়ো পাথর দেখলেই তারা সিঁদুর মাখিয়ে পুজো করে, একটা ভাঙা মূর্তি দেখলেই থান বসিয়ে দেয় মুরগি বলি। তাই এখানকার বিস্মৃতনামা রাজা রূপান্তরিত হয়েছেন পাহাড়ের অধিষ্ঠাতা ভৈরবঠাকুরে।
ঠাকুরপ্রণাম করে পাহাড়ে উঠল শুকলাল আর সোনা। কাঠুরেদের যাতায়াতে জঙ্গল ভেঙে দু-একটা সরু পথ আপনা থেকে তৈরি হয়েছে এদিকে-ওদিকে, সরীসৃপ গতিতে পাহাড়ের চারদিকে পাক খেয়ে গেছে। তা ছাড়া দুর্ভেদ্য জঙ্গল, পাথরের চাঙাড়ের ফাঁকে ফাঁকে মাটির ভেতর থেকে রাশি রাশি বুনো গাছ আর লতার জটিলতা। কাঁটাগাছের মাথায় হাওয়ায় দুলছে বনধুধুল। মাঝে মাঝে ফুটে উঠেছে ভূঁইচাঁপা আর কাঠগোলাপ। কোথাও কোথাও বেগুনে রঙের ফুলের বাহার নিয়ে পাহাড়ের আড়ালে আড়ালে উঁকি দিচ্ছে লজ্জাবতী। ছোটো ছোটো পাখি নেচে বেড়াচ্ছে এদিক-ওদিকে।
শুকনো আধ-শুকনো গাছ খুঁজে কুড়ল চালাতে লাগল শুকলাল, আর মোটা একটা গুলঞ্চের লতা দিয়ে খড়ির আঁটি বাঁধতে লাগল সোনা। ওরই এক ফাঁকে কখন দুটো বঁধুল সংগ্রহ করেছে সোনা, গোটা কয়েক কাঠগোলাপও সাজিয়ে নিয়েছে খোঁপায়। সংসারের কথা ভোলেনি, সেইসঙ্গে একটুখানি অঙ্গরাগও করে নিয়েছে। মাঝে মাঝে একটা গানের কলিও গুনগুন করে উঠেছে। কিন্তু আপাতত তার দিকে নজর নেই শুকলালের। বিশ্রামহীনভাবে তার কুড়ল চলছে, মড়মড় খটখট শব্দে ভেঙে পড়ছে গাছ আর গাছের ডাল। আর থেকে থেকে বাঁ-হাত দিয়ে ঝেড়ে ফেলছে কপালে-জমে-ওঠা বড়ো বড়ো ঘামের বিন্দুগুলো।
এর মধ্যেই কখন উঠে গেছে অনেকখানি বেলা। শুশুনিয়া পাহাড়ের মাথা ডিঙিয়ে সূর্য উঠে এসেছে আকাশের মাঝখানে। পাথর গরম হয়ে উঠেছে, চারদিক থেকে বিস্তীর্ণ হয়ে পড়ছে একটা বাষ্পীয় উত্তাপ। এতক্ষণ পরে হাতের কুড়ল নামিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়াল শুকলাল—হাঁপাতে লাগল।
ওদিকে পিঠের বোঝাটাও বেশ ভারী হয়ে উঠেছে সোনার। রোদে টকটক করছে মুখ। দুজনে দুজনের দিকে তাকাল।
