আর লোকে বলতে লাগল, ওই বাড়িতে উপোসমামা ভূত হয়ে আছে। জষ্ঠিমাসের হাওয়ায় পাকা আম পাড়লেও কেউ তা কুড়োতে যেত না ওখানে, শেয়ালে-টেয়ালে খেত।
বাঃ, খাসা ভূতের বাড়ি বানালি দেখছি।
বানালুম? উঠে যা–ততার গল্প শুনে কাজ নেই।
না–না, চটিসনি। মানে বেশ রোমাঞ্চকর মনে হচ্ছে কিনা। বলে যা তাই– প্লিজ।
সেবার দেশে গিয়ে ঠিক করলুম—কাল অমাবস্যার রাত আছে–ঠিক বারোটার সময় ওবাড়িতে ভূত দেখতে যাব। সবাই বারণ করলে– উপোসমামা ধরে ঘাড় মটকে দেবে। বললুম-বেঁচে থেকে তো রোগাপটকা ছিল–আমি জিমনাস্টিক করি–জোরে পারবে কেন? দেখিই না–ভূত হয়ে উপোসমামার কী রকম তাগদ হয়েছে গায়ে।
গেলি?
কেন যাব না? ঠিক বারোটায় পৌঁছে গেলুম। একে অমাবস্যা, তায় মেঘ করেছে আবার। বাগানটায় ঢুকতে-সত্যি বলতে কি ভাই–গা ছমছম করতে লাগল। যেই খানিক এগিয়েছি, ঝড় ঝড় ঝড়াৎ।
অ্যাঁ–কী?
টর্চের আলোয় দেখি, হাওয়ায় একটা শুকনো ডাল খসে পড়েছে।
অ।
মন খারাপ হল বুঝি? শোন না-আসল রোমাঞ্চই তো বাকি রয়েছে।
বল ভাই। একটু কাছে ঘেঁষে বসছি, কিছু মনে করিসনি।
না–না, মনে করব কেন? তুই তো আর ভূতে বিশ্বাস করিস নে। তারপর শোন গুটিগুটি তো গিয়ে উঠেছি সেই পোড়ো বাড়িতে। বাপস্ কী অন্ধকার, আর চারদিকে চামচিকে আর কী সবের কী বিচ্ছিরি গন্ধ।
তারপরে?
যেই বারান্দা ধরে একটু এগিয়েছি না–ঝটপট ঝটপট
অ্যা, কী ঝটপট?
কিছু না। বাদুড়।
অ।
দাঁড়া না, আরও আছে। বাদুড় তো পালাল কিন্তু একটা দরজা-ভাঙা খালি ঘরে যে ঢুকেছি না–
কী?
দুটো চোখ। জ্বলজ্বল করছে।
হ্যাঁ। হিংস্রভাবে জ্বলছে। যেন প্রেতলোকের বিভীষিকা। কাছে আসছে–এগিয়ে আসছে–আরও আসছে–আঃ, জাপটে ধরছিস কেন? টর্চের আলোয় দেখি
ক– কী?
একটা হুলো বেড়াল। হাঁ, স্রেফ হুলো বেড়াল। মুখে নেংটি ইঁদুর নিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে গেল।
ধেৎ।
দমিসনি-দমিসনি–আরও আছে।
তারপর?
ঘরের বারান্দায় শুনি কে যেন আসে। পা টিপে টিপে-সাবধানে। বুক চমকে উঠল। কে–কে আসে অমন করে? কার পদধ্বনি? এত রাতে–এই অন্ধকারে এই পোড়োবাড়িতে–কে আসে এত সাবধানে? সে কি ভূত? সে কি হত্যাকারী? কে?
কে?
একটা শেয়াল আসছিল। যেই বলেছি ভাগ্-দৌড়ে হাওয়া।
যাঃ।
ঘাবড়াসনি। আরও আছে। তারপর
তারপর?
ঘুরঘুট্টি অন্ধকার।
তারপর?
ঘুরঘুট্টি অন্ধকার।
তারপর—
ঘুরঘুট্টি
আঃ, জ্বালালি। তোর ঘুরঘুট্টির নিকুচি করেছে। কী হল তাই বল না।
কী আর হবে? হয়রান হয়ে বাড়ি চলে এলুম।
আর ভূত?
ভূতই তো। ভূত মানে ভূত। মানে অতীত। মানে উপোসমামা অতীত হয়ে গেছেন তিনি আর বর্তমান নেই। তাই তাঁর বাড়িতে আর তাঁকে দেখতে পেলুম না।
এই তোর ভূতের গপ্পো?
এই তো আসল ভূতের গল্প। ভূত মানে ভূত–মানে অতীত। মানে উপোসমামা আর বর্তমান নেই।
ইস্টুপিড! যা যা– ভাগ এখান থেকে।
ভোগবতী
এপারে বাংলা, ওপারে মানভূম। পাথর-মেশানো রাঢ়ের অনুর্বর কঠিন বিস্তারের ওপর দিয়ে রাঙা সুরকির পথ। মাঝে মাঝে শালের ঘনবিন্যাস। হিমালয়ের বুকে শালবীথির যে সমুন্নত উদ্ধত মহিমা, এরা যেন তাদের সংক্ষিপ্ত হাস্যকর সংস্করণ। আকন্দের ঝোপের মতো রাশি রাশি পলাশও মাঝে মাঝে বিকীর্ণ হয়ে আছে। ওই পলাশবন যে বসন্তে রাঙা ফুলের চেলি পরে নিজের বিন্দুতম শ্যামলিমাকেও নিশ্চিহ্ন করে মুছে ফেলে—এটা যেন কেমন অদ্ভুত অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।
কিন্তু এ দেশটার রীতিই এই। যেন জগৎটাকে সৃষ্টি করবার আগে বিশ্বকর্মা এখানে তাদের ছোটোখাটো কতকগুলো মডেল তৈরি করে নিয়েছিলেন। অথবা যেন পৃথিবীর বড়োসড়ো আকারের একটা রিলিফ ম্যাপ। নদী আছে, কিন্তু মোটা মোটা বালিদানা আর ছোটো-বড়ো পাথরের টুকরোর ভেতর দিয়ে তাদের জলের ধারাটা এক ফালি অভ্রের পাত বলে ভুল হতে পারে। আর আছে পাহাড়। শুধু রাত্রির অন্ধকারে যেখানে বার্নপুরের চিমনির আভায় কালো দিগন্তটা লাল হয়ে থাকে, সেদিকটা ছাড়া আর তিন দিকেই চলেছে পাহাড়ের অনন্ত শ্রেণি।
একদিকের দূরান্ত রেখায় পঞ্চকোট, অন্যদিকের চক্ৰবালে শুশুনিয়া পাহাড়ের অলক্ষপ্রায় ছায়ামূর্তি। মাঝখানে বিহারীনাথ পাহাড়। তা ছাড়া ছোটো-বড়ো অখ্যাত ও অজ্ঞাতনামা পাহাড়ের কোনো সীমাসংখ্যাই নেই। কোনোটায় পলাশের জঙ্গল, কোনোটা একেবারে ন্যাড়া। কোনোটা নিতান্তই জংলা—শতমূলী সহস্ৰমূলী থেকে শুরু করে দু-হাত উঁচু আবলুস গাছ আর নলবনের মতো সরু সরু পাহাড়ি বাঁশ অথবা বাঁশের ক্যারিকেচার। তাতে কখনো কখনো বাঘের সন্ধান পাওয়া যায় আর মাঝে মাঝে দেখা হয় শঙ্খচূড় সাপের সঙ্গে। স্বল্পবিস্তীর্ণ একটা ব্যাসার্ধের ভেতরে সমস্ত পৃথিবীর ভূগোল-পরিচয়।
বহু দূরে দূরে ভদ্রলোকের গ্রাম। আর সাঁওতাল—সব সাঁওতাল। চাষি সাঁওতাল, খেড়ে সাঁওতাল। চাষি সাঁওতালরা ভদ্র পাড়ার কাছাকাছি এসে বাসা বেঁধেছে। চাষ করে, সবজি লাগায়। জামাকাপড় পরে তারা, কখনো কখনো কাঁচা চামড়ার ফাটা ফাটা মোটা জুতোও। আর খেড়ে সাঁওতালের কোমরে এখনও লেংটি, কানে ফুল গোঁজা, মাথায় বাবরি, হাতে কাঁড় বাঁশ। ভাতের মহিমা উপলব্ধি করে তারা এখনও পুরোপুরি ভেতো হয়ে উঠতে পারেনি, বনেজঙ্গলে প্রচুর প্রাণপ্রাচুর্য নিয়ে তাদের প্রাকৃতিক খাদ্য ছড়িয়ে পড়ে আছে।
এদের মাঝামাঝি যারা, তারা কাঠুরে। ভদ্রলোক জমিদার বাবুদের পাহাড়ে তারা বিনা অনুমতিতে কাঠ কাটে। এসব পাহাড়ে তাদের জন্মগত অধিকার। দশ মাইল দূরের জমিদার কোন সূক্ষাতিসূক্ষ আইনের বলে পুত্রপৌত্রাদিক্রমে এ সমস্ত পাহাড়ের ভোগদখলের অধিকারী, তাদের স্থূল মস্তিষ্কে সেটা সহজে প্রবেশ করে না।
