–ও কী! ও কী!
আমি, নরেশ আর পটলা একসঙ্গেই আর্তনাদ করে উঠলাম।
কানু সোজা দাঁড়িয়ে উঠল। ধমক দিয়ে বললে, দুত্তোর, ভিতুর ডিম সব। পেছল সিঁড়ি, তাই গড়িয়ে পড়ছে নীচের দিকে। দাঁড়া, আমি তুলে নিয়ে আসি।
মড়া তখনও নামছে, হাঁটু পর্যন্ত তার নেমে গেছে গঙ্গায়! কানু গিয়ে বাঁশের মাচাটা ধরে টান দিলে। কিন্তু কী সাংঘাতিক! কানুর টানকে অস্বীকার করেও মড়াটা আরও নীচে নেমে গেল!
গোঁয়ার-গোবিন্দ কানু এবার দুহাতে মড়াটাকে জাপটে ধরলে। কিন্তু আশ্চর্য কানু রাখতে পারলে না! দু’ধাপ পিছলে সে-সুদ্ধ গিয়ে কোমর-জলে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত সাহস উবে গেল তার। এবার কানু আকুল হয়ে চিৎকার করে উঠল, ওরে তোরা ছুটে আয়, মড়া আমাকে সুদ্ধ নিয়ে যাচ্ছে!
ততক্ষণে বুকে আমাদের আর রক্ত নেই, তা জল হয়ে গেছে। আমরা চিৎকার করে বললাম, মড়া ছেড়ে দাও
কানু বললে, পারছি না—
আমরা ছুটে গেলাম–চেপে ধরলাম কানুকে।
তারপরে যা শুরু হল, সেকথা ভাবতে আজও আতঙ্কে মাথার চুল খাড়া হয়ে ওঠে।
ওই হাড্ডিসার মড়াটার গায়ে সে কী অমানুষিক শক্তি। একদিকে আমরা চারজন, অন্যদিকে মড়া একা–আমাদের সকলকে অনায়াসে তুচ্ছ করে সে জলের মধ্যে টেনে নিয়ে চলল! ঠাণ্ডাজল আমাদের কোমর ছাপিয়ে পেট পর্যন্ত উঠল, তারপর এসে পৌঁছুল বুক পর্যন্ত। তারপর–তারপর আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারছি–আর আমাদের আশা নেই–এই মড়া আমাদের টেনে নিয়ে চলেছে, চলেছে গঙ্গার অতল জলে, সেখানে
আশ্চর্য একটা ভয়ঙ্কর অবস্থা! সমস্ত জ্ঞানগম্যি যেন লোপ পেয়ে গেছে আমাদের। একটা আচ্ছন্নতার ঘোরে, যেন মরিয়া হয়ে মড়ার সঙ্গে টাগ-অব-ওয়ার চালিয়ে চলেছি আমরা। অথচ বেশ বুঝতে পারছি, আমাদের জয়ের কোনও আশা নেই, অপদেবতার অমানুষিক শক্তির কাছে আমাদের সমস্ত চেষ্টাই নিরর্থক।
আর সবচাইতে ভয়ানক-মড়া ছেড়ে দিয়ে যে উঠে আসব সে-ক্ষমতা আমাদের নেই। কানু মড়াকে ছাড়তে পারছে না–আমরা ছাড়তে পারছি না কানুকে। যেন কী একটা মন্ত্রবলে সে আমাদের তার শরীরের সঙ্গে আটকে নিয়েছে–যেন হিপনোটাইজ করে ফেলেছে সকলকে।
বুক-জল ক্রমশ গলা-জলে পৌঁছেছে, আর দেরি নেই মৃত্যুর। চারদিকে গঙ্গার অন্ধকার কালো জলে যেন শুনতে পাচ্ছি শয়তানের হাসির খিল-খিল শব্দ। গঙ্গার অতল জল–সেখান থেকে প্রেতপুরীর অন্ধকার জগৎ! এই মড়াটা তারই দিকে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে!
শেষবারের মতো আমরা সমস্বরে আর্তনাদ করে উঠলাম।
ঠিক এমন সময় কাঠের বোঝা নিয়ে আসছিল বাগদীরা। আমাদের চিৎকার শুনে তারা এসে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। ছিলাম চারজন, হলাম ছয়জন। পূর্ণোদ্যমে চলতে লাগল সে অমানুষিক টাগ-অব-ওয়ার!
তারপর–
তারপর আস্তে আস্তে থেমে দাঁড়াল মড়া। আস্তে আস্তে আমরা জয়লাভ করতে লাগলাম। ক্রমশ মড়া আমাদের আয়ত্তের মধ্যে এসে পৌঁছতে লাগল। তখনও তার প্রচণ্ড টান আছে বটে, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা তাকে ফিরিয়ে আনতে পারলাম ঘাটের দিকে। গলা-জল থেকে বুক-জলে, সেখান থেকে কোমর-জলে, সেখান থেকে হাঁটুজলে, তারপর
ওদিকের টানটা ঝড়াং করে ছেড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে একেবারে ছিটকে এল ওপরে আর আমরা ছয়জন হুড়মুড় করে এ ওর ঘাড়ে ডিগবাজি খেয়ে পড়ে গেলাম।
আর ভুস্—স-স—
ঠিক তৎক্ষণাৎ ঘাটের ওপর জলের মধ্যে দেখা দিলে
বাঞ্ছা থামল।
আমরা রুদ্ধশ্বাসে শুনে যাচ্ছি এই অতি ভয়ঙ্কর কাহিনী। একসঙ্গে বলে উঠলাম কী ভেসে উঠল?
ধীরে সুস্থে বাঞ্ছা বললে–আর কী? প্রায় দেড়মন।
কী দেড়মন?–আকুল স্বরে কেষ্টা প্রশ্ন করলে।
–আমাদের কালনার গঙ্গার বিখ্যাত অতিকায় কচ্ছপ। সেই ব্যাটাই—
আমি হো-হো করে হেসে উঠলাম।
কেষ্টা তড়াক করে লাফিয়ে উঠল; মিথ্যেবাদী–জোচ্চোর!
বাঞ্ছা বললে হতে পারি। কিন্তু আজ বেড়ে খাইয়েছিস কেষ্টা, ভূতের জয় জয়কার হোক তোর।
নিরুত্তরে কেষ্টা হনহন করে নেমে গেল রাস্তায়।
ভূত মানে ভূত
আয়, একটা ভীষণ ভূতের গল্প বলি।
আমি ভূত মানি না।
তবে যা–তোর শুনে কাজ নেই।
না–না বল, শুনি, কত বাজে গপ্পো বানাতে পারিস তুই।
আমি গল্প বানাই না। সদা সত্য কথা বলে থাকি। অবিশ্বাস হলে উঠে যা না, কে তোকে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে বলেছে?
না–মানে সত্যি কথা বললে আর অবিশ্বাস করব কেন? তুই বল।
অ–ইদিকে ভূত মানি না, ওদিকে ভূতের গল্প শুনলেই জাঁকিয়ে বসা? আছিস বেশ।
মানে শুনতে বেশ মজা লাগে কিনা, তাই
মজা লাগে? এমন সত্যি ঘটনা বলব না যে শুনে তোর গায়ে কাঁটা দেবে।
নাকি? তবে বলে যা ভাই।
শোন আমাদের গাঁয়ে একটা বেজায় পাজি বুড়ো থাকত। লোকে বলত, উপোস-মামা। মানে মুখ দেখলে উপোস করতে হয়–অ্যায়সা কিপটে। মস্ত একটা পোড়োমতন বাড়িতে একা থাকত–চারদিকে তার আম কাঁঠালের ঘন বাগান। এমন জায়গা যে দিনের বেলা গেলেও গা ছমছম করতে সেখানে। বুড়োর কেউ ছিল না বুড়ি মরে গিয়েছিল–মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়েছিল, তিন ছেলে চাকরি নিয়ে পালিয়েছিল এখানে-ওখানে। ছেলেমেয়েরা কেউ বুড়োর কাছে আসত না–কার দায় পড়েছে কচু ঘণ্ট আর লাল চালের ভাত খেতে?
সে যা হোক–উপোসমামা তো প্রায় উপোস করেই মারা গেল একদিন। ছেলেরা এল, শ্রাদ্ধটাদ্ধ করে টাকা পয়সা ভাগ করে নিয়ে জমি-টমি বিক্রি করে দিয়ে চলে গেল যার যেদিকে খুশি। পড়ে রইল জংলা বাগানের ভেতর সেই পোড়ো বাড়িটা।
