গ্রামটা হল কালনার কাছাকাছি, একেবারে গঙ্গার ধারে। খাসা জায়গা। যেমন খাওয়া-দাওয়া, তেমনি আরাম। দু মাসের মধ্যেই আমি মুটিয়ে গেলাম।
বেশ আছি, আরামে দিন কাটছে। এমন সময় এক অঘটন। পাশের বাড়ির হরিশ হালদার এক বর্ষার রাত্রিতে পটল তুলল।
লোকটা যতদিন বেঁচে ছিল, গ্রামসুদ্ধ লোকের হাড়-মাংস একেবারে ভাজা ভাজা করে রেখেছে। বাজখাঁই গলা, খিটখিটে মেজাজ। বাড়িতে কাক বসলে হার্টফেল করত, বেড়ালে কুকুরে পর্যন্ত বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষত না। বউটা আগেই মরেছিল, ছেলেটা কোথায় জব্বলপুরে না জামালপুরে যুদ্ধের চাকরি নিয়ে চম্পট দিয়েছিল। বাড়িতে বুড়ো একা থাকত। তার মস্ত একটা ফলের বাগান ছিল–সেইটাই পাহারা দিত।
এমন বিতিকিচ্ছি লোক যে বিতিকিচ্ছি সময়ে মারা যাবে তাতে সন্দেহ কী! সেদিন বেশ মিঠে মিঠে বৃষ্টি নেমেছে ঝিমঝিম করে, পেট ভরে মুগের ডালের খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা খেয়ে বিছানা নিয়েছি–এমন সময় ডাক এল মড়া পোড়াতে যেতে হবে।
আমি খপ করে বাঞ্ছার কথায় বাধা দিয়ে বললাম–ওসব পুরনো গল্প। পত্রিকার পাতায় গণ্ডা গণ্ডা ওরকম গল্প বেরিয়ে গেছে।
বাঞ্ছা ভ্রূকুটি করে বললে–আরে আগে শোন না বাপু। পরে যত খুশি বকরবকর করিস।
কেষ্টা বললে–ঠিক!…তারপর এমন চোখ পাকিয়ে আমার দিকে তাকাল যে বামুন হলে নির্ঘাত ভস্ম করে ফেলত।
বাঞ্ছা বলে চলল কী আর করি! বেরুতেই হল। পাশের বাড়িতে একটা লোক মরে পড়ে থাকবে এটা তো কোনও কাজের কথা নয়। যতই খিটখিটে বদখত লোক হোক না কেন, মানুষ হিসাবে একটা কর্তব্য আছে তো।
বেরিয়ে দেখি, আমরা মাত্র চারজন। ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া মেলেনি–কেউ কাঁপা গলায় বলেছে জ্বর হয়েছে, কেউ কাতরাতে কাতরাতে জবাব দিয়েছে, কান কটকট করছে। কাজেই আমাদের চারজনকেই কাঁধ দিতে হল। দুজনের দুহাতে দুটো লণ্ঠন ঝুলতে ঝুলতে চলল, আর কাঁধে দুলতে দুলতে চলল মড়া।
মুখুজ্যেদের নরেশ আক্ষেপ করে বললে, জ্যান্তে বুড়ো জ্বালিয়ে মেরেছে, মরেও একখানা খেল দেখিয়ে গেল।
কিন্তু কী আর করা যাবে, উপায় তো নেই। সেই টিপিটিপি বৃষ্টি আর শনশনে হাওয়ায় বর্ষা-পিছল রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। চারদিকে কালির মতো অন্ধকার–গাছপালাগুলো সেই অন্ধকারে এক-একটা অতিকায় দৈত্য-দানার মতো মাথা নাড়ছে। বিদ্যুতের চমকানিতে চোখে ধাঁধা লেগে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে পথ ভুল করে পাশের খানার মধ্যে গিয়ে পড়ছি আমরা। বৃষ্টির ছাটে চটচট করে ফাটছে লণ্ঠনের চিমনি। পা পিছলে যেতে চাইছে, ঠাণ্ডা হাওয়ায় বৃষ্টির ঝাঁপটা লেগে চোখ জ্বালা করছে। ভোগান্তি আর কাকে বলে?
বল হরি, হরি বল–চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে চললাম চারজনে। কাঁধের ওপর বুড়ো যেন পরম আনন্দে দোল খাচ্ছে। আমার সন্দেহ হল, এখন হয়তো মড়ার মুখের কাপড় সরালে দেখা যাবে, আমাদের দুর্গতিতে মিটিমিটি হাসছে হাড়-জ্বালানো লোকটা। মনে মনে অভিসম্পাত করতে করতে আমরা এগিয়ে চললাম।
হ্যাঁ বলতে ভুলে গেছি, শুধু আমরা চারজনেই নই; বুড়োর দুটো বাগদী প্রজাও ছিল। তারা তো আর বামুনের মড়াকে কাঁধ দিতে পারবে না, তাই তারা কুড়ল কাঁধে আসছিল পিছনে পিছনে– কাঠ কেটে আনবে।
সে যাই হোক, শ্মশানে তো পৌঁছানো গেল। শ্মশান ঠিক গাঁয়ের নীচে নয়–বেশ খানিকটা দূরে। আশেপাশে বাড়ি-ঘর কিছু নেই–অনেকটা পর্যন্ত ন্যাড়া মাঠের ভেতরে এলোমেলো বাবলার বন। সেখানে একখানা টিনের চালাঘর–অবশ্য চারদিকে তার দেওয়াল-ফেয়ালের কোনও বালাই নেই–একেবারে ফাঁকা। এইটেই শ্মশান-যাত্রীদের বসবার জায়গা।
ঠিক তারই নীচে একটা বাঁধানো সিঁড়ি নেমে গেছে গঙ্গার জলে। মস্ত সিঁড়ি, প্রায় খান পনেরো পৈঠে, এখন বর্ষার জলে তিন-চারখানা মাত্র জেগে রয়েছে। ভাঙাচুরা অবস্থা–যেখানে সেখানে বড় বড় ফাটল, ইট বেরিয়ে পড়েছে। আমরা ওই সিঁড়ির ওপরেই মড়াটাকে নামালাম। এমনভাবে রাখলাম যাতে মড়ার পা দুটো ডুবানো থাকে গঙ্গার জলে। বুড়োর গঙ্গাযাত্রাও হবে, তা ছাড়া এ-সুবিধেও আছে যে কাউকে আর ছুঁয়ে বসে থাকতে হবে না।
মড়া নামিয়ে আমরা গিয়ে বসলাম চালাটার নীচে। বাগদীরা কাঠের ব্যবস্থা করুক, তারপর চিতা সাজানো যাবে। বসে বসে গল্প জুড়ে দিলাম আমরা।
চারদিকে ঘন অন্ধকার। হাওয়ায় হাওয়ায় বাবলাবনের মাতামাতি। এখানে ওখানে শেয়ালের চোখ ঝলমল করছে সবুজ রঙের হিংস্র আলোর মতো। সে-চোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কখনও বা ভয় ধরে যাচ্ছিল আমাদের–ভূত নয় তো!
লণ্ঠন দুটোর গায়ে কালি পড়েছে, অল্প অল্প আলো গিয়ে পড়েছে ঘাটে নামানো মড়াটার ওপরে। কথার ফাঁকে ফাঁকে মড়ার দিকে নজর রাখছি আমরা। শেয়ালে-টেয়ালে এসে টেনে না নেয় সে-সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকা দরকার।
কতক্ষণ কেটেছে খেয়াল ছিল না, হঠাৎ ভীতস্বরে নরেশ বললে, মড়াটা একটু নড়ল না?
আমরা বললাম, ধ্যাৎ–তোর চোখের ভুল।
খানিক পরে আবার পটলা বললে, মড়াটা সত্যিই কিন্তু নড়ে উঠেছে।
আমাদের ভেতরে সবচেয়ে সাহসী ছিল কানু। যেমন বুকের ছাতি তেমনি বেপরোয়া। কানু আশ্বাস দিয়ে বললে, ও কিছু না–জলের ঢেউয়ে নড়ে থাকবে।
আবার মিনিট কয়েক কাটতে না কাটতে আতঙ্কে আমার সমস্ত শরীর যেন ঝাঁকুনি খেয়ে উঠল। কোনও ভুল নেই লণ্ঠনের অল্প অল্প আলোতেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মড়াটা সত্যি সত্যিই একটু একটু করে জলের দিকে নেমে যাচ্ছে।
