কতক্ষণ ওই অবস্থায় ছিল ঠিক নেই। হঠাৎ কানে এল পানকেষ্টর চিৎকার : ঘোড়াডাঙায় এসে গেছে স্যার! এই যে ঘোড়াডাঙা
বটুক ধড়মড় করে নড়ে উঠল। একটা গ্রামের ভেতর দিয়ে গাড়ি তীরবেগে বেরিয়ে যাচ্ছে।
থামাও। থামাও! বটুক চেঁচিয়ে উঠল।
–তেল না ফুরলে থামবে না স্যার।–প্রশান্ত জবাব পানকেষ্টর।
তা হলে? ঘোড়াডাঙা যে ছাড়িয়ে গেল।
–তা গেল। কিন্তু সেজন্য ভাবছেন কেন? মাইল পাঁচেক আগে একটা বাঁক আছে, ওখান থেকে ঘুরিয়ে আনছি। এর মধ্যে তেল ফুরিয়ে যাবে। পেছনে পড়ে রইল ঘোড়াডাঙা-গাড়ি মাঠের ভেতর দিয়ে সমানে বনবন করে ছুটছে।
যদি না ফুরোয়?
আবার স্টেশন পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসব। ফের তেল নেব।
–তারপর আবার যে ঘোড়াডাঙা পেরিয়ে যাবে?
–আবার ঘুরিয়ে আনব। পানকেষ্ট জবাব দিলে।
–খুনে। ডাকাত। বটুক চেঁচিয়ে উঠল।
-খামকা গালাগালি করবেন না স্যার।–গর্জে উঠল পানকেষ্ট। দৈত্যের মতো ভয়ঙ্কর মুখে একটা বীভৎস ভঙ্গি ফুটে বেরুল : তা হলে সোজা ওই জামগাছে ধাক্কা দিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে দেব—হ্যাঁ! তখন আমার দোষ দিতে পারবেন না।
বটুক কাঠ হয়ে বসে রইল।
ঝড়ের বেগে গাড়ি একটা চৌমাথায় পৌঁছল। তারপর বাঁদিকে খানিকটা ঘুরে আবার ফেলে-আসা পথ ধরল।
এবার ঘোড়াডাঙায় গিয়ে থামবে তো?
বলা যায় না স্যার। তেল মাপবার যন্ত্রটা নষ্ট হয়ে গেছে। গাঁজার নেশায় সকালে কতখানি তেল ঢেলেছি খেয়াল নেই।
কী সর্বনাশ।
–অত ঘাবড়ে যাচ্ছেন কেন মশাই? আজ হোক কাল হোক–ঘোড়াডাঙার সামনে গাড়ি আমার থামবেই, তবে আমার নাম পানকেষ্ট পাড়ুই।
–আজ হোক, কাল হোক! বটুক হাঁ করে রইল।
পরশুও হতে পারে। তরশু হওয়াও অসম্ভব নয়। কী করে ঠিকমতো বলব স্যার? আমি তো আর জ্যোতিষী নই?
বটুক আবার সেই খোঁচা-খাওয়া স্প্রিং-এর সিটে এলিয়ে পড়ল। জামাইষষ্ঠীর নেমন্তন্ন খাওয়ার সাধ চিরদিনের মতো মিটে গেছে। এখন প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারলে হয়।
–ঘোড়াডাঙায় গিয়ে আমার কাজ নেই, স্টেশনেই নিয়ে চল।
–স্টেশনে গেলেই যে গাড়ি থামবে, একথা কী করে বলব মশাই?
বটুক অজ্ঞানের মতো পড়ে রইল।
–ঘোড়াডাঙা যাচ্ছে–ঘোড়াডাঙা যাচ্ছে। আবার পানকেষ্টর চিৎকার!
থামছে না যে! এবারেও যে থামছে না!বটুক হাহাকার করে উঠল।
–তেল বেশি আছে বোধহয়। পানকেষ্টর জবাব।
কিন্তু আর নয়। এবার এসপার কি ওসপার। মাথায় যেন খুন চেপে গেল বটুকের!
পেরিয়ে যাচ্ছে ঘোড়াডাঙা! ছাড়িয়ে যাচ্ছে একটা বন্দুকের গুলির মতো!
জয় মা কালী!
চলতি গাড়ি থেকে বটুক ঝাঁপ মারল।
করেন কী–করেন কী মশাই।–বলতে না বলতে পানকেষ্টর দোদুল-দোলা দু-মাইল রাস্তা পার হয়ে গেল।
গাঁয়ের ডাক্তার, টিংচার আইডিন আর লোকজন নিয়ে শ্বশুর ধারেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আশঙ্কা ছিল, শহুরে জামাই বটুক হয়তো ট্যাক্সির লোভ সামলাতে পারবে না।
তাঁরা ছুটে এলেন। ধরাধরি করে রাস্তা থেকে তুললেন বটুককে।
ডাক্তার প্রথমেই ডান পা-টা পরীক্ষা করলেন। বললেন, একটু ভেঙেছে। দিন-সাতেকের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবে।
শ্বশুর একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন : যাক, ভালোয়-ভালোয় পৌঁছেছে তাহলে।
ভালোয়-ভালোয় বইকি! লোকের কাঁধে চেপে জামাইষষ্ঠীর নেমন্তন্ন খেতে যেতে যেতে একবার করুণ কণ্ঠে বটুক জিজ্ঞাসা করলে, কিন্তু ট্যাক্সি-ভাড়াটা? ট্যাক্সি-ভাড়া নেবে না পানকেষ্ট?
–নেবে বইকি। যেদিন তেলের হিসেব করে ঘোড়াডাঙার সামনে থামতে পারবে–সেইদিন। আজ হোক, কাল হোক, একমাস পরে হোক।–শ্বশুর জবাব দিলেন।
ভুতুড়ে
আমি যতই বলি ভূত নেই, ওসব স্রেফ গাঁজার কলকে, কেষ্টা ততই চেঁচাতে থাকে।
–যেদিন ঘাড় মটকে দেবে, সেদিন টের পাবি, বুঝলি?
–আরে যাঃ যাঃ!…একটা চীনেবাদামের খোলা ছাড়াতে ছাড়াতে আমি বললাম-রেখে দে তোর ভূত। আমার কাছে এসেই দেখুক না বাছাধন, আমি নিজেই তার ঘাড় মটকে দেব।
কেষ্টা চেঁচাতে লাগল–দেখা যাবে–দেখা যাবে। যেদিন আমগাছে এক ঠ্যাং আর দূরের তালগাছের মাথায় আর-একটা ঠ্যাং চাপিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে, সেদিন আর চ্যাঁ-ভ্যাঁ করতে হবে না, বুঝলি? এখন ঘুঘু দেখেছিস, তখন ফাঁদ দেখবি।
–ওসব নওগাঁ ব্র্যান্ড শিকেয় তুলে রাখ।…আমি সংক্ষেপে মন্তব্য করলাম।
কেষ্টা বললে তুই পাষণ্ড, তুই নাস্তিক।
আমি বললাম হতে পারে। তাই বলে তুই অমন ষণ্ডের মত চ্যাঁচাবি, এর মানে কী?
কেষ্টা রাগে ভোঁ-ভোঁ করতে করতে উঠে যাচ্ছিল, এমন সময় বাঞ্ছা কোত্থেকে এসে তার হাত চেপে ধরলে। বললে–আহাহা চটছিস কেন? সবাই তো প্যালা হতভাগার মত নাস্তিক নয়। আমি নিজে বলছি, স্বচক্ষে ভূত দেখেছি আমি।
সত্যি?–কেষ্টার হাসি গাল ছাপিয়ে কান পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছুল।
আমি বললাম–বাজে।
-বাজে! তবে শোন। শুনে চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন কর। কিন্তু কেষ্টা, তার আগে কিছু খাওয়াতে হবে মাইরি। বড্ড খিদে পেয়েছে।
এমনিতে কেষ্টা হাড়-কেপ্পন। কাউকে এক পয়সা খাওয়ানো তো দূরের কথা, সব সময়েই পরস্মৈপদীর তালে আছে। কিন্তু ভূতের মহিমাই আলাদা। সঙ্গে সঙ্গে এক টাকার ফুলকপির সিঙাড়া আর ‘জলযোগ’-এর সন্দেশ চলে এল। সেগুলোর অদ্ধেকের ওপর একাই সাবাড় করে, বড় গোছের একটা ঢেকুর তুলে বাঞ্ছা বললে–তবে শোন :
বছর তিনেক আগের কথা।
ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়ে মামার বাড়িতে বেড়াতে গেছি।
