এরপরে কেউ আর পড়তে পারে না, ভজরামও পারলেন না। কাগজটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। ভজরাম আর গজরামের মিল কে না বুঝতে পারে। আর বোসকে ঘোষ করা তো
পরমুহূর্তেই রাস্তা থেকে শ্যামল-নেবু-কেলো-ন্যাদা-নেপালের কোরাস শোনা গেল :
শ্রীগজরাম ঘোষ।
সেটাও যখন লেখক হল—
ধড়াম করে জানলা বন্ধ করে দিয়ে ভজরাম মাথার চুল ছিঁড়তে লাগলেন। দোলগোবিন্দ তা হলে তো সত্যিই কাঁকড়া বিছে! শুধু কবিতাই লেখেনি, পাড়াসুদ্ধ ছেলেকে তা মুখস্থ করিয়েছে! আচ্ছা-দেখ লেঙ্গে।
তখন গায়ে জামা চড়িয়ে চলে গেলেন উকিলের বাড়ি। পথে যেতে যেতে গলির মোড়ে মোড়ে শুনতে লাগলেন : শ্ৰীগজরাম ঘোষ
দাঁত কিড়মিড় করে মনে-মনে ভজরাম বললেন, আচ্ছা ঢোলগোবিন্দ, দাঁড়াও! মানহানির দায়ে যদি ছমাস তোমার শ্রীঘর না ঘোরাই, তবে আমি ভজরাম বোসই নই।
উকিল সব শুনলেন, কবিতাটাও বেশ মন দিয়ে পড়ে দেখলেন। তারপর মাথাটাথা চুলকে বললেন, এতে মানহানির মামলা হবে না।
হবে না? আমাকে মোষ বলেছে, হনু বলেছে, কচ্ছপ বলেছে, আর শেষে বলেছে দুম্বা ওটা ধুম্বো লেজ চিবোয় বালাপোশ–এর পরেও মানহানি হবে না?
ভজরাম খেপে গেলেন।
উকিল বললেন, সবই তো বুঝছি মশাই, কিন্তু আপনাকেই যে বলেছে তা তো প্রমাণ করা যাবে না। আপনি তো মোষ নন, হনু নন, ধুম্বো ল্যাজওলা দুম্বাও নন, বালাপোশও আপনি কখনও চিবোন না। ওরা বলবে, বাচ্চাদের হাসির কবিতা। আর তা ছাড়া এ-ও ভেবে দেখুন মামলা করলে ব্যাপারটা দেশসুদ্ধ লোকে জেনে ফেলবে, যারা এখনও কবিতাটি। পড়েনি তারাও পড়ে ফেলবে–তাতে আপনারই কেলেঙ্কারি।
গুম হয়ে থেকে শেষ কথাটা চিন্তা করে দেখলেন ভজরাম। তারপর ভাঙা গলায় বললেন, তা হলে এই যে জ্বালাময়ী অপমান
আপনি পাল্টা একটা গল্প লিখে দিন না। তবে নাম-টাম একটু বদলে যেমন দোলগোবিন্দ দে-কে করুন গোবিন্দলাল ঢোল, শিশুকবি না করে করুন একটা নাট্যকার-ফাট্যকার–মানে পড়ে লোকে বুঝতে পারবে, অথচ মানহানিও হবে না।–উকিল পরামর্শ দিলেন : আর কবিতার জবাব গল্পেই তো দেওয়া ভালো, বিশেষ করে আপনি যখন নামজাদা লেখক।
নামজাদা শব্দটা কানে মধু ঢালল। ঠিক কথা-কবিতার জবাব গল্পেই দেবেন। ভজরাম মনঃস্থির করে উঠে পড়লেন।
.
লেখা হল গল্প। লাইনে লাইনে তার নিদারুণ ব্যঙ্গ। গোবিন্দলাল ঢোল নামটা ভালো লেগেছিল, সেইটেই রাখলেন ভজরাম। নাট্যকার করলেন না, করলেন কবি। লিখলেন, গোবিন্দলাল ঢোলের অখাদ্য কবিতা পড়ে দেশসুদ্ধ লোক তাকে লাঠি নিয়ে তাড়া করল– বাঁধাকপির মতো চেহারাওলা গোবিন্দ ঢোল শেষে জঙ্গলে পালিয়ে গেল, তারপর কপিদের দলে ভিড়ে গিয়ে গাছে উঠে কচি কচি পাতা চিবুতে লাগল।
লিখে, আনন্দে নাচতে ইচ্ছে করল। মোক্ষম গল্প। দোলগোবিন্দ এই গল্পে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। তক্ষুনি চিঠি লিখে ডেকে আনলেন বর্ধমান সখা পত্রিকার সম্পাদককে, তাকে পেট পুরে মাংস পরোটা খাইয়ে, এক ঝুড়ি কমলালেবু উপহার দিয়ে অনুরোধ করলেন–এই সংখ্যাতেই লেখাটা ছাপতে হবে।
সম্পাদক কান চুলকে বললে, কিন্তু জায়গা নেই যে। আমরা আট পৃষ্ঠা নিলাম ইস্তাহার–
আমি খরচা দিচ্ছি। বাড়তি কাগজ দিয়ে ছাপুন। একশো দুশো টাকা লাগে দেব।
সম্পাদক খুশি মনে রাজি হয়ে গেল।
গল্প ছাপা হল। দশ কপি কাগজ চলে এল ভজরামের কাছে। ভজরাম নকুলের হাত দিয়ে পাড়ায় বিলি করতে আরম্ভ করলেন। দোলগোবিন্দের জন্যে ভাবনা নেই, তার কাগজ তো ডাকেই যাবে বর্ধমান সখার অফিস থেকে।
ময়ুরের মতো পেট পুরে সাতটা দিন আনন্দে পেখম মেলে কাটালেন ভজরাম। কিন্তু অষ্টম দিনে
অষ্টম দিনে ডাকে এল উকিলের চিঠি এল। মানহানির মকদ্দমার চিঠি।
না, দোলগোবিন্দ পাঠাননি। এসেছে হুগলি থেকে। এক সত্যিকারের গোবিন্দলাল ঢোলের পক্ষ থেকে। আমার মক্কেল শ্ৰীযুক্ত গোবিন্দলাল ঢোল বাঁধাকপির বিখ্যাত ব্যবসায়ী। তিনি অবসর সময়ে কিছু কিছু কাব্য রচনাও করেন। কিন্তু অদ্যাবধি কেহ তাঁহার কবিতাকে অখাদ্য বলে নাই, তাঁহাকে লাঠি লইয়া তাড়া করে নাই, তিনি কখনই চুটুপালুর জঙ্গলে গিয়ে গাছে চড়িয়া কচি পাতা ভোজন করেন নাই। আপনি বর্ধমান সখা পত্রিকায় তাঁহার নামে যে অকারণ নিন্দাবাদ করিয়াছেন, তাঁহাকে বাঁদর এবং অন্যান্য কুৎসিত বিশেষণ দিয়াছেন, সেজন্য কেন আপনার নামে মানহানির মকদ্দমা করা হইবে না ও পঞ্চাশ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হইবে না, তাহার কারণ দর্শাইবার জন্য–।
কারণ দর্শাইবার আগেই ভজরাম ধপাৎ করে ঘরের মেজেতে বসে পড়লেন। আর সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হল তিনি একটি বাঁধাকপি–ঠাসা, নিরেট অতিকায় একটি বাঁধাকপি!
ভালোয়-ভালোয়
ট্রেন থেকে লাফিয়ে নামতে গিয়ে সোজা ধড়াস করে প্ল্যাটফর্মের উপর একটা আছাড় খেলো বটুকেশ্বর সামন্ত। গড়িয়ে গেল বাজারের ঝাঁকা-থেকে-পড়ে যাওয়া একটা ছাঁচিকুমড়োর মতো।
–আহা-হা মারা গেল বুঝি লোকটা।–চারদিক থেকে হাহাকার উঠল একটা।
বাঙালগুলো এমনি করেই মরে, বুঝলেন!–কোথা থেকে একজন সবজান্তা ঘোষণা করলেন।
বটুক ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। ব্যথার চাইতে অপমানের জ্বালাতেই গা জ্বলছে বেশি।
আস্তিন গুটিয়ে বটুক বললে, মুখ সামলে কথা কইবেন মশাই! বাঙাল! জানেন, কলকাতার হাটখোলায় আমাদের চোদ্দপুরুষের বাস?
