নকুলকে লক্ষ্য করে দেড় মন ওজনের চাঁটি হাঁকড়ালেন একটা–নকুল লাফিয়ে পালিয়ে গেল, লক্ষ্যভ্রষ্ট চাঁটিটা একটা কালির শিশিতে গিয়ে পড়ল; সেটা ছিটকে চলে গেল দরজার বাইরে, ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল আর ভজরামবাবুর শখের শাদা নাগরা জুতোজোড়াটার বারোটা বেজে গেল।
শুভ্রা কিংবা শুভ্রিকা বরণের সাহিত্য বাসর বসছে। কিছুতেই যাব না পণ করেও শেষ পর্যন্ত আসরে হাজির হয়েছেন ভজরাম, দোলগোবিন্দ লোকটাকে একবার ভালো করে দেখে নিতে চান। বাচ্চাদের কবিতা লেখে–সে আবার সাহিত্যিক! তা হলে তো যেসব গুবরে পোকা ঘুর ঘুর করে উড়ে বেড়ায় তাদেরও জেট-প্লেন বলতে হয়!
পাড়ার ছেলেরা ভজরামকে খাতির করে একেবারে মঞ্চের ওপর দোলগোবিন্দের পাশে বসিয়ে দিলে। হাজার হোক তিনিও তো লেখক, আর কমসে কম আটবার এই সভায় সভাপতি হয়েছেন। ছেলেরা পরিচয় করিয়ে দিলে, দোলগোবিন্দ মিষ্টি হাসিতে ভজরামকে অভ্যর্থনা করলেন, আর সেই হাসি দেখে ভজরামের পিত্তি পর্যন্ত জ্বালা করে উঠল।
তখন কবিতা-টবিতা পাঠ শুরু হয়েছে, কিন্তু কিছুই কানে যাচ্ছিল না ভজরামের। তিনি কটকটে চোখ মেলে এক দৃষ্টিতে দোলগোবিন্দকে–যাকে বলে অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ তাই করতে লাগলেন। আরে ধ্যাৎ–ইনি আবার স্বনামধন্য। গুটগুটে ছোট চেহারা, রং কালো, মাথায় নিটোল একটা টাক–এ যদি কবি হয়, তা হলে তো চামচিকেও–কী বলে পক্ষিরাজ ঘোড়া। একে বরং বাঁধাকপি বলা যায়, অনেকটা সেইরকম দেখতে। আর ভজরাম? তাঁর লম্বা-চওড়া মস্ত চেহারা, ফুটফুটে গায়ের রং, সোজা সিঁথি কাটা চুলের দুপাশে বাবরি–চোখে সোনার চশমা–অচেনা লোকেও সমীহ করে ভাবে–একটা কেউকেটা হবেন! তাঁর জায়গায় এ সভাপতি? সিংহের আসনে শেয়াল?
সাহিত্যসভার কাব্য পাঠ-টাঠ হয়ে গিয়েছিল। মুচকি হেসে দোলগোবিন্দ উঠে দাঁড়ালেন। মিনমিন করে বললেন, তিনি অল্প-স্বল্প লেখেন বটে, কিন্তু বক্তৃতা-টক্তৃতা তাঁর আসে না। ছোটদের লেখা শুনে খুব খুশি হয়েছেন-এইটুকুই তাঁর বক্তব্য। তিনি এবারে পল্লীর বিশিষ্ট লেখক ভজরাম বসুকে আহ্বান জানাচ্ছেন কিছু বলবার জন্যে।
কাঁকড়া-বিছের ল্যাজেই বিষ!–ভজরাম ভাবলেন : কেন, স্বনামধন্যটন্য বলতে কি জিভ টাকরায় আটকে গেল? পল্লীর বিশিষ্ট লেখক! পল্লীর বাইরে তাঁর লেখা বুঝি কেউ পড়ে না?
আগুন হয়ে ভজরাম বলতে শুরু করলেন। মাইকের ভেতর দিয়ে তাঁর মেঘমন্দ্র স্বর ছড়িয়ে পড়ল : আমার আর বলবার কী আছে, যখন স্বনামধন্য একজন কবি এখানে হাজির আছেন। তিনি আবার যে-সে কবি নন বাচ্চাদের জন্যে কবিতা লেখেন। আমি তাঁর লেখা পড়িনি, পড়বার দরকার হয় না। আমার বলবার কথা হল, যেখানে বাচ্চাদের কোন এক কবিরাজকে এনে সভাপতি করা হয়, সেখানে আমার মতো ঔপন্যাসিককে ডেকে আনার কোনও প্রয়োজন
সভায় একটা গোলমাল শুরু হল। কে যেন চেঁচিয়ে বললে, ঔপন্যাসিক না হাতি। ছাই লেখেন। আর একজন চেঁচিয়ে উঠল : দোলগোবিন্দবাবু আমাদের সভাপতি–তাঁকে অপমান
ইউ শাট আপ!-বলে এক রাম-চিৎকার ছাড়লেন ভজরাম : অমন সভাপতি আমি ঢের দেখেছি! কবি না বাঁধাকপি।
অ্যাপোলজি চান শিগগির-আট দশ জন দাঁড়িয়ে উঠল।
অ্যাপোলজির নিকুচি করেছে–ডাকাত-পড়া হুংকার ছাড়লেন ভজরাম।
এবার শেয়াল-কুকুরের হাঁক উঠতে লাগল সভায়। ভজরাম চেয়ার উলটে দিয়ে দুড়দাঁড়িয়ে বেরিয়ে গেলেন। আর দোলগোবিন্দ উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন : আপনারা শান্ত হোন, আজ বাণী বন্দনার পবিত্র দিন–আজকে আপনারা স্থির হয়ে থাকুন। আর সত্যিই তো আমি সামান্য শিশু-সাহিত্যিক, উনি তো কোনও অন্যায় কথা ইত্যাদি ইত্যাদি।
ব্যাপারটা যে মিটল বটে, কিন্তু ভজরাম পরে বুঝলেন কাজটা ভালো হয়নি। ঢোলগোবিন্দ যেমনই লিখুক, ও-ভাবে সভায় বলাটা তাঁর অন্যায় হয়ে গেছে। আর ওই বক্তৃতা দিয়ে পাড়াতেও তিনি আনপপুলার হয়ে গেছেন, নকুল হাঁড়িমুখ করে কয়েক বারই এসে বলেছে : সবাই তোমার নিন্দে করছে বাবা বলছে দোলগোবিন্দবাবু কত মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছেন, আর তুমি
ইউ শাট আপ বলে নকুলকে থামিয়ে দিয়েও ভজরাম মনে-মনে লজ্জা পাচ্ছিলেন। দোলগোবিন্দের কাছে গিয়ে একটা ক্ষমা-টমা–উহঁ, সে-ও অসম্ভব। ভাবতে গিয়েই মাথা গরম হয়ে গেল। যদি সে বলত স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক কিংবা বিখ্যাত লেখক–তাহলেও বরং সহ্য করা যেত। কিন্তু তার বদলে পল্লীর বিশিষ্ট লেখক–আর দোলগোবিন্দ থাকবে স্বনামধন্য হয়ে? তৎক্ষণাৎ ভজরাম ভাবলেন, যা করেছেন বেশ করেছেন।
দিন পনেরো বাদে ডাকে একটা পত্রিকা এল তাঁর নামে। খুলে দেখলেন, একটা বাচ্চাদের কাগজ। এ তাঁকে কে পাঠাল? তিনি তো এসব কাগজে কোনও লেখা কখনও দেন না!
পাতা ওলটাতেই একটা কবিতা। তার নাম গজাও আবার গল্প লেখে। লেখক শ্রীদোলগোবিন্দ দে। কবিতাটার মাথায় আবার লাল কালির একটা দাগ দেওয়া–যেন তাঁকে এইটেই বিশেষভাবে পড়তে বলা হচ্ছে।
লাইন কয়েক পড়বার পরেই আর সন্দেহ রইল না। সেই মিটিঙের জবাব দিয়েছে ঢোলগোবিন্দ। কী নিদারুণ জবাব।
শ্রীগজরাম ঘোষ
সেটাও যখন লেখক হল
রইল বাকি মোষ।
মোষের মতোই কাঁপিয়ে পাড়া
বাগদেবীকে করল তাড়া
ব্যাকরণের পিণ্ডি গিলে
ফোঁপায় সে ফোঁসফোঁস!
সভায় গিয়ে হাঁকড়ে বলে
কী যে আমি হনু
দেখল সবাই মোযটা তখন
ল্যাজকাটা এক হনু—
