–চোদ্দপুরুষ কলকাতায় বাস হলেও বাঙাল বাঙালই থাকে। সেই সবজান্তা আবার জানালেন। চটে আগুন হয়ে গেল বটুক। ইচ্ছে হল লোকটার কান ধরে বারকয়েক ওঠ-বোস করিয়ে দেয়। কিন্তু সাহস হল না। অচেনা জায়গা–সবাই শত্রুপক্ষ। চাঁদা করে সবাই যদি এক ঘা বসিয়ে দেয়, তা হলেই আর দেখতে হবে না। একদম কাঁচাগোল্লা বানিয়ে দেবে।
সুতরাং কেটে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
গোঁ-গোঁ করতে করতে বেরিয়ে যাচ্ছিল–স্টেশন-মাস্টার পথ আটকালেন–একটু দাঁড়িয়ে যান না দাদা।
–কেন, হঠাৎ আবার আপনার এই রসালাপ কিসের?
স্টেশন মাস্টার নাক চুলকে বললেন, ইয়ে–দেখুন দাদা, আমার স্টেশনে নামতে গিয়ে আপনার হাত-পা ছড়ে গেল, তাই বলছিলাম, একবার অফিস-ঘরে আসুন, একটু আইডিন লাগিয়ে দি। আপনারা স্যার কলকাতার লোক, গিয়ে হয়তো বদনাম গাইবেন—
বটুক দাঁত খিঁচিয়ে বললে, চুপ করুন মশাই। আর ভালোমানুষি করতে হবে না। আধ মিনিট ট্রেন থামে না আপনার স্টেশনে, আপনি আবার স্টেশনমাস্টার। আপনি একটা পয়েন্টসম্যান, বুঝলেন? স্রেফ পয়েন্টসম্যান।
কী, পয়েন্টসম্যান। রোঁয়া-তোলা বেড়ালের মতো স্টেশন-মাস্টার ফ্যাঁচ করে উঠলেন : পয়েন্টসম্যান! এত বড় কথা! আমি আপনার নামে মানহানির মামলা করব।
–মানহানি, প্রাণহানি, কানহানি যা খুশি করুন। যে-চুলোয় খুশি যান–বটুক গটগট করতে করতে বেরিয়ে গেল স্টেশন থেকে।
ইস। যাত্রাটাই মাটি।
স্টেশনের বাইরে এসে বটুক একবার করুণ চোখে নিজের দিকে তাকাল।
হাঁটুর কাছে ফেঁসে গেছে অমন খাসা শান্তিপুরী ধুতিটা। গিলে করা পাঞ্জাবিটা এখানে-ওখানে ময়লা হয়ে গেছে। এই পোশাক নিয়ে কখনও জামাই-ষষ্ঠীতে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া যায়।
শ্বশুরেরও যেন আর খেয়ে-দেয়ে কাজ ছিল না। রিটায়ার করে কলকাতা ছেড়ে একেবারে এই ধ্যাধ্যেড়ে ঘোড়াডাঙায় এসে আস্তানা নিয়েছেন। পৈতৃক বাড়ি। নিকুচি করেছে অমন পৈতৃক বাড়ির! যেখানকার স্টেশনে আধ মিনিটের বেশি গাড়ি দাঁড়ায় না আর যেখানকার লোকগুলো এমন অসভ্য-সেখানে কোনও ভদ্রলোক আসে?
কিন্তু এসেই যখন পড়া গেছে–তখন কী আর করা যাবে। তা ছাড়া শাশুড়ি খাওয়ান ভালো–পাকা কইয়ের কালিয়া, কচি পাঁঠার মুড়ো, বাটি ভরা ক্ষীর-ইস। ইস! ভাবতেও বটুকের জিভে জল এল। আশা হল, বেশ একটা জাঁকালো খাওয়ার উপরেই পথের কষ্টটা পুষিয়ে নেওয়া যাবে।
কিন্তু ঘোড়াডাঙা? কোথায় সেই ঘোড়ার ডিমের ঘোড়াডাঙা?
স্টেশনের বাইরে একটা নিমগাছের তলায় তিনখানা গোরুর গাড়ি। বটুককে দেখেই গাড়োয়ানরা হইচই করে তেড়ে এল।
না, ঠ্যাঙাবার জন্য নয়।
–কোথায় যাবেন বাবু? কোথায়?
ঘোড়াডাঙা।
আসুন, আমার গাড়িতে আসুন—
–এ-গাড়িতে আসুন বাবু–তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেব!
–আমার গাড়িতে চলুন মশাই! গোরু তো নয়–পক্ষিরাজ ঘোড়া। উড়িয়ে নিয়ে যাবে।
বটুক থতমত খেয়ে গেল।
দুদিক থেকে দুই গাড়োয়ান হাত চেপে ধরেছে। আর-একজন পেছন থেকে জামা ধরে টানছে।
–আমার গাড়িতে উঠুন বাবু-
-এ-গাড়িতে আসুন বাবু
আমার তো গোরু নয় মশাই, পক্ষিরাজ ঘোড়া—
কানের কাছে তিন গাড়োয়ান সমানে চিৎকার করতে লাগল। বটুকের প্রায় ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, প্রাণ যাওয়ার দাখিল।
-এই, কী হচ্ছে সব? ভদ্রলোককে নিয়ে মস্করা পেয়েছিস?
একটা বাঁজখাই গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। হঠাৎ যেন মাটি খুঁড়ে সামনে এসে দাঁড়াল একটা লোক। ছ-হাতের মতো লম্বা, কটকটে কালো গায়ের রঙ–গরুড়ের ঠোঁটের মতো নাকটা মুখের উপর যেন আধ হাত আন্দাজ ঝুলে পড়েছে। গায়ে আধ ময়লা শার্ট–আস্তিন গোটানো। ছোটখাটো একটা দৈত্যবিশেষ!
যেন জাদুমন্ত্রের কাজ হল। বটুককে ছেড়ে তিন পা পেছনে সরে গেল গাড়োয়ানগুলো।
বিরাট লোকটা আবার বিকট গলায় বললে, দেখছিসনে কেমন ধোপদুরস্ত কলকাতার বাবু? তোদের ও-সব ঝরঝরে গোরুর গাড়িতে চড়তে যাবে কেন র্যা?-লোকটা বটুককে বগলের মধ্যে চেপে ধরল–আসুন স্যার আমার সঙ্গে।
-তুমি আবার কে হে বাপু?–লোকটার বগলদাবা থেকে বটুক প্রাণপণে নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করতে লাগল।
–কেউ নই স্যার।–অতিকায় লোকটা প্রায় দেড় মাইল চওড়া একখানা হাসি হাসল : অধীনের নাম পানকেষ্ট পাড়ুই। আপনার দাসানুদাস।
দাসানুদাস। নিজেকে ছাড়াবার বৃথা চেষ্টা করে বটুক রুদ্ধশ্বাসে বললে, তা হলে অমন করে জাপটে ধরেছ কেন?
–একবার হাতে পেলে কি আর স্যার সহজে ছাড়ি?–আবার একখানা দেড় মাইল হাসি দেখা দিল পানকেষ্ট পাড়ুইয়ের মুখে।
ভয়ে সর্বাঙ্গ হিম হয়ে গেল বটুকের : তোমার মতলবখানা কী হে?
ঘাবড়াবেন না স্যার–আমি লোক খারাপ নই। চেহারাটা আমার এমনি দেখছেন বটে, কিন্তু মনখানা একেবারে মাখনের মতো নরম। গাড়োয়ান ব্যাটারা আপনার হাঁড়ির হাল করছিল, দেখে আর সইতে পারলাম না ছুটে এলাম।
–যথেষ্ট অনুগ্রহ করেছ, এবার ছেড়ে দাও। হাঁপাতে হাঁপাতে বটুক বললে।
–ছাড়ব কী স্যার, আপনি যে আমার সোয়ারি। ছাড়লেই হল? ছাড়াটা কি ইয়ার্কি নাকি? কত পুণ্যি করলে আপনাদের মতো লোক পাওয়া যায়। চলুন স্যার–কোথায় যাবেন। আমার ট্যাক্সি করে পৌঁছে দিচ্ছি।
ট্যাক্সি! কোথায় ট্যাক্সি?
–ওই যে আমগাছ তলায়, দেখছেন না?
তা বটে! কিন্তু না বলে দিলে মোটর গাড়ি বলে চেনা মুস্কিল। ধুলোয় মলিন বাঁকা-ট্যারা একখানা একশো বছরের পুরনো অস্টিন। হুডটা ছিঁড়ে গিয়ে ঝালরের মতো ঝুলছে চারিদিকে।
