এইভাবে দিনগুলো যখন চমৎকার কেটে যাচ্ছিল, তখন হঠাৎ সাতান্ন নম্বর বাড়িতে দোলগোবিন্দ দে এসে গেলেন। তিনি কোথায় ভালো একটা চাকরিবাকরি করেন, কিন্তু সেটাই তাঁর আসল পরিচয় নয়। তিনি বেশ নামডাকওলা কবি। তাঁর কবিতা কেউ ফেরত দেন না বরং সম্পাদকেরাই ধরনা দেন তাঁর কাছে। বাজারে তাঁর অনেক বই-টই আছে, ছোটরা তাঁর লেখার দারুণ ভক্ত।
ভজরামবাবু প্রথমে বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দেননি। একে কবি, তায় বাচ্চাদের লেখক-ছোঃ! কবিতা লেখে কারা? গল্প-উপন্যাস লিখতে যাদের বিদ্যায় কুলোয় না। আর শিশুসাহিত্যিক? রামোঃ, তাদের কেউ আবার লেখক বলে গণ্য করে নাকি? ভজরামের ছেলে নকুল রোমাঞ্চিত হয়ে বলতে এল : জানো বাবা, পাড়ায় একজন বিখ্যাত লেখক এসেছেন। কবি দোলগোবিন্দ দে।
শুনে, ভজরাম দাঁত খিঁচিয়ে তাকে ধমক লাগালেন একটা।
ইঃ দোলগোবিন্দ আবার লেখক! আরশোলাও পাখি, গুবরে পোকাও এরোপ্লেন! তোকে বেশি ওস্তাদি করতে হবে না, এখন মন দিয়ে জিয়োগ্রাফি পড়গে। আর ফের যদি ওসব দোলগোবিন্দ ঢোলগোবিন্দের কথা আমাকে বলতে আসবি, তা হলে কান দুটো একেবারে উপড়ে নেব। মনে থাকে যেন।
নিজের ছেলের কান না হয় উপড়ে নেওয়া যায়, কিন্তু পাড়ার সব ছেলের কান যে অত সহজেই পাকড়ে ধরা যায় না, সেটা ভজরাম কিছুদিনের মধ্যেই টের পেয়ে গেলেন।
পাকুড়গাছি লেনের শুভ্রিকা বরণ উৎসব এসে গেল। আসলে ব্যাপারটা সরস্বতী পুজো কিন্তু আজকাল নানা কায়দায় সালু টাঙানো হয়–কেউ লেখে বাগদেবী বন্দন, কেউ লেখে শুক্লাবরণ, কেউ বা লেখে শুভ্রা অর্চনা। এই শুভ্রাকেই আর একটু কাব্যিক মতে ভজরাম শুভ্রিকা করে দিয়েছিলেন। এতদিন সেটাই চলছিল, কিন্তু হঠাৎ রাস্তায় বেরিয়ে শুভ্রা বরণে লেখা সালু টাঙানো দেখেই মেজাজ বিগড়ে গেল তাঁর।
পাড়ার দু-তিন জন পাণ্ডা গোছের ছেলে সামনেই রাস্তার ওপর উবু হয়ে বসে, বেশ মন দিয়ে, ফিরিওলার কাছ থেকে ফুচকা খাচ্ছিল। ভজরাম ডাকলেন, ওহে শ্যামল–নেবু–কেলো!
ফুচকা চিবোতে চিবোতে তিনজনেই এসে হাজির হল!
কী ব্যাপার?–কড়া গলায় ভজরাম জিজ্ঞেস করলেন, এর মানে কী? শুভ্রিকা বদলে সালুতে শুভ্রা লেখা হল কেন?
তিনজনেই চুপ।
রাস্তায় পা ঠুকে ভজরাম বললেন, চুপ করে থাকলে চলবে না–এর জবাব চাই।
ফুচকা গিলতে গিয়ে একটা বিষম খেয়ে নেবু বললে, আজ্ঞে দোলগোবিন্দবাবু
অঃ, সেই কবিবর?–ভজরাম ঠাট্টা করে বললন, তিনিই বুঝি ওস্তাদি করেছেন?
আজ্ঞে ওস্তাদি করেননি।–নেবু এবার ঢোক গিলল : তিনি বললেন, শুভ্রিকা বলে কোনও শব্দ ব্যাকরণে হয় না সরস্বতী পুজোয় এসব ভুল থাকা উচিত নয়। তা ছাড়া কুড়ি টাকা চাঁদাও দিয়েছেন–
বটে। কুড়ি টাকা চাঁদাই তবে আসল কথা। রাগের চোটে ভজরামের মগজের ভেতরে যেন তিন ডজন উচ্চিংড়ে লাফাতে লাগল : তা হলে আর আমাকে কেন? ওই কপিরাজকে নিয়েই থাকো। শুভ্রিকা হয় না? তা হলে কালী কালিকা হয় কী করে? বীথি বীথিকা হয়? পুঁটিমাছকে পুন্টিকা বলে কেন? ব্যাকরণ দেখাতে এসেছে। তা হলে ওই ব্যাকরণওলা ঢোলগোবিন্দকে নিয়েই তোমরা ব্যা ব্যা করো–তোমাদের সাহিত্য-সভায় আমাকে আর ডেকো না।
স্যার স্যার শ্যামল-নেবু-কেলো এক সঙ্গেই হাহাকার করে উঠল। কিন্তু ভজরাম আর দাঁড়ালেন না, হনহন করে বাড়িতে এলেন।
ফিরে এসে এক পেয়ালা চা খেয়ে মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হল। ভাবলেন, এবার আচ্ছা জব্দ করে দিয়েছেন। প্রত্যেক বছর শুভ্রিকা বরণের দিন সন্ধেবেলায় প্যাণ্ডেলে একটা সাহিত্য-সভা হয়, পাড়ার ছেলেরা গল্প কবিতা পড়ে এবং সভাপতি হিসেবে ভজরাম তাঁদের নানারকম সদুপদেশ দেন। আট বছর ধরে বাঁধা সভাপতি হয়ে এই মহৎ কাজটি তিনি করে আসছেন। তিনি না গেলে সাহিত্য সভাই পণ্ড হয়ে যাবে।
ভজরাম ভাবলেন, ছেলেরা আজই তাঁর কাছে আসবে–ক্ষমা চাইবে-সালুতে শুভ্রা কেটে শুভ্রিকা লেখা হবে। কিন্তু একদিন–দুদিন–তিন দিন সাত দিন কেটে গেল, কোথায় কী! শুভ্রা তেমনি ঝুলতে লাগল, মিত্তিরদের বাড়ির সামনে খোলা জায়গাটায় প্যাণ্ডেলের বাঁশ পড়ল, শ্যামল-নেবু-কেলো-মন্টু-হাবু ন্যাদা চাঁদা আদায় করে, প্রতিমা বায়না দিয়ে, মাইকের ব্যবস্থা করে হয়রান হয়ে গেল, কিন্তু তাঁর কাছে আসবার জন্যে কারও এতটুকুও গরজ দেখা। গেল না।
এবং শেষ পর্যন্ত
হতভাগা নকুলটাই হাতে করে চিঠিখানা নিয়ে এল তাঁর কাছে।
সুধী! আমাদের শুভ্রা বরণে—
চিঠিটা তক্ষুনি ছুঁড়ে ফেলতেন, কিন্তু মনে হল সাহিত্যসভা? সাহিত্য সভার কী হবে?
স্বনামধন্য কবি শ্রীযুক্ত দোলগোবিন্দ দে সভাপতির আসন গ্রহণ করে
স্বনামধন্য! দাঁতে দাঁতে কিড়মিড় করলেন ভজরাম। কই, এই আট বছর ধরে তাঁর নামের আগে তো কখনও স্বনামধন্য লেখা হয়নি! শ্রীযুক্ত দিয়েই কাজ সারা হয়েছে। যত খাতির ওই ঢোলগোবিন্দের জন্যে! বটে!
নকুল গলা খাঁকারি দিয়ে বললে, বাবা!
বজ্ৰদৃষ্টিতে ভজরাম তার দিকে তাকালেন।
বাবা, ওরা তোমার কাছে আসবার সময় পেল না, আমাকে বলে দিয়েছে, দোলগোবিন্দবাবু মোটেই বক্তৃতা করতে পারেন না–তুমি যদি সভায় একটু ভাষণ দাও
পায়ের নখ থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত পাঁচ হাজার ভোল্ট ইলেকট্রিসিটি বয়ে গেল ভজরামের। এমন আকাট মুখখু গাড়ল ছেলেও মানুষের হয়! পিতার এই জ্বালাময়ী অপমানে কোথায় মরমে মরে যাবে তা নয়-দাঁত বের করে বলছে : যদি একটু ভাষণ দাও।
