কিন্তু আজ? আজ যেন চোখকে বিশ্বাস হয় না। বড়োকর্তা বেঁচে থাকলে তিনিও বিশ্বাস করতে পারতেন কি না বলা শক্ত। মন্দির আগে যা ছিল, তার শতগুণে উন্নতি লাভ করেছে। রাধাকৃষ্ণের গায়ে ঝলমল করছে জড়োয়ার গয়না। শুভ্র চামরের আন্দোলনে, ধূপ-ধুনো গুগগুলের গন্ধে, রাশি রাশি ফুলে আরতি হচ্ছে ঠাকুরের। থালায় থালায় বহুমূল্য ভোগ বেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই দুর্বৎসরে কোথা থেকে এত সব জোগাড় করলেন মেজোকর্তা!
নাটমন্দিরে নামসংকীর্তন চলছে বৈষ্ণবদের। খোল আর করতালের সঙ্গে সঙ্গে উঠছে নামকীর্তন। পদাবলির মাধুর্য উচ্ছলিত হয়ে পড়ছে ভক্তের আবেশবিহ্বল কণ্ঠস্বরে।
হেরিলাম নবদ্বীপে সোনার গৌরাঙ্গ,
দেহ-মনে উছলিল প্রেমের তরঙ্গ—
নীলমণি বললে, প্রণাম কর পুঁটি, প্রণাম কর। জয় রাধেকৃষ্ণ…
বিচলিত হয়ে মন্দিরের মার্বেল-বাঁধানো রোয়াকে প্রণাম করলে পুঁটি। যতটা ভক্তিতে নয়, তার চাইতে অনেক বেশি বিস্ময়ে এবং ভয়ে। আর গলবস্ত্র হয়ে সেই জনতারণ্যের মাঝখানে মুদিত-চোখে দাঁড়িয়ে রইল নীলমণি।
এসো হে গৌরাঙ্গ আমার সংকীর্তন মাঝে…
ধূপ-ধুনো, বত্রিশটা ঝাড়লণ্ঠনের আলো। জড়োয়ার গহনা থেকে রাধাকৃষ্ণের শ্রীঅঙ্গ দিয়ে যেন দিব্যদ্যুতি ঠিকরে পড়ছে। আবেশবিহ্বল নীলমণি যেন স্বপ্নের চোখে দেখতে লাগল–বৃন্দাবনলীলায় আবার নতুন করে রাধাকৃষ্ণ ফিরে এসেছেন, আর ভাবে বিভোর সোনার গৌরাঙ্গ নাচতে নাচতে নবদ্বীপের কঠিন মাটিতে মূৰ্জিত হয়ে পড়েছেন।
জয় রাধেকৃষ্ণ।
হঠাৎ চমক ভেঙে গেল নীলমণির। চরণামৃতের পাত্র হাতে স্বয়ং মেজোকর্তা সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন।
চরণামৃত?
জনতা একের-পর-এক ব্যগ্র ব্যাকুল হাত বাড়াতে লাগল, আর নীলমণি আশ্চর্য মুগ্ধদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেজোকর্তার দিকে। সর্বাঙ্গে চন্দন সেবা করেছেন তিনি, গরদের ধুতিতে কী চমৎকার মানিয়েছে তাঁকে। সত্যিকারের বৈষ্ণব মেজোকর্তা—সত্যিকারের ভক্ত।
চরণামৃতের পাত্র এগিয়ে এল। আরও দশজনের সঙ্গে হাত বাড়াল নীলমণি, তুলে ধরলে পুঁটির ছোটো হাতখানা। ভিড়ের মধ্যে মেজোকর্তা নীলমণিকে চিনতে পারলেন না।
কিন্তু সেই মূহুর্তেই বত্রিশ ডালের ঝাড়লণ্ঠনের আলো মেজোকর্তার হাতের ওপরে এসে পড়ল। নীলমণি যা দেখল তা যেন বিশ্বাস করার মতো নয়। মেজোকর্তার হাতের পিঠে একটা সাদা উজ্জ্বল দাগ, তার ভেতরে রক্তের আভা। নিঃসন্দেহে কুষ্ঠ। অথচ বড়োকর্তার হাত, সে-হাত ছিল অম্লান চাঁদের মতো নিষ্কলঙ্ক।
মুখে-মাথায় দিতে গিয়ে চরণামৃত নীলমণির পায়ে পড়ে গেল। ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় কুষ্ঠের অনিবার্য নিঃসন্দেহ দাগটা পাঁচটা সোনার আংটির চাইতে বেশি জ্বলজ্বল করছে। নীলমণি শুনেছিল, বেশি সোনা-রুপো ঘাঁটলে নাকি হাতে কুষ্ঠ হয় মানুষের।
রাত্রের বিলের মধ্য দিয়ে নীলমণির নৌকো চলছিল।
পুঁটি একপাশে ছোটো আর ঘন হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। চারপাশে ছড়ানো রয়েছে তার খেলনাগুলো। অন্ধকার ধানবনের ভেতর দিয়ে নৌকো চলেছে নীলমণির।
নির্জন, নিস্তব্ধ পৃথিবী। চাঁদ-ডুবে-যাওয়া কালো আকাশ, শুধু তারার একটা তরল আলো জলের ভেতর থেকে প্রতিফলিত হয়ে পড়ছে। কোনোখানে জনমানবের সাড়াশব্দ নেই, শুধু নীলমণির নৌকোর লগি পড়ছে : ছপ—ছপ—ছপ–
কাশেম ফকিরের ধানবন। শিরশিরে বাতাস—ধানের শিষে শিষে যেন অশরীরী কান্না। লগির ঘষায় নীলমণির বুড়ো আঙুলের নীচে খচখচ করে জ্বালা করছে।
হঠাৎ নীলমণির যেন চমক লাগল। যে-জায়গাটার ছাল ছড়ে গিয়েছে সেখানে সাদামতো ওটা কীসের দাগ দেখা যাচ্ছে! চকচক করে উঠছে তারার আলোয়। ঝাড়লণ্ঠনের তীব্র শিখায় মেজোকর্তার হাতে সে যা দেখেছিল—এ কি তাই? কুষ্ঠ?
ভজরামের প্রতিশোধ
এক আকাশে দুই সূর্য কখনও শোভা পায়? উহুঁ!
আর এক পাড়ায় দুজন সাহিত্যিক থাকলে? কী যে নিদারুণ অঘটন ঘটতে পারে সেটা বোঝা গেল সাতান্ন নম্বর বাড়িতে দোলগোবিন্দবাবু আসবার পর।
এতদিন বেয়াল্লিশ নম্বরের ভজরামবাবুই ছিলেন পাড়ার একমাত্র লেখক। গল্প উপন্যাস দুই-ই তিনি লেখেন। উপন্যাস অবশ্য এখনও ছাপা হয়নি, তবে খানকুড়িক পাণ্ডুলিপি তাঁর ঘরে মজুত আছে–ভজরামবাবু আশা রাখেন ভবিষ্যতে একদিন প্রকাশকেরা তাঁর কদর বুঝবে–তাঁর বই ছাপার জন্যে বাড়িতে এসে লাইন দেবে। গল্প-টল্প প্রায়ই সম্পাদকের দপ্তর থেকে ফেরত আসে, হঠাৎ দু-একটা ছাপাও হয়ে যায়। তোমাদের চুপি চুপি বলি, দু-চারজন সম্পাদককে যখন-তখন বাড়িতে নেমন্তন্ন করে তিনি চর্ব-চূষ্য খাওয়ান, আর তাঁরাই নেহাত চক্ষুলজ্জার খাতিরে এবং ভোজের আশায়–।
সে যাই হোক, পাড়ার লোকে ভজরামবাবুকে বেশ সমীহ করে থাকে। যাই লিখুন, একজন জলজ্যান্ত সাহিত্যিক তো বটে। ছাপার অক্ষরে নাম বেরোয় শ্রীভজরাম বসু–সে তো চারটিখানি কথা নয়। আর তাইতেই তিনি পাড়ার সাহিত্য সভায় সভাপতি হন, ছোটদের হাতে-লেখা পত্রিকায় বাণী দেন, লম্বা পাঞ্জাবি পরে বাসন্তী রঙের চাদর কাঁধে ফেলে–চুল উস্কোখুস্কো করে উদাস হয়ে হেঁটে যান। চাকরিবাকরি করেন না, ওসব তুচ্ছ জিনিস কি সাহিত্যিকদের জন্যে! খান তিনেক বাড়ি আছে, মোটা রকমের ভাড়া পান, আর ভজরামবাবু ভালো-মন্দ খেয়ে-দেয়ে উঁচু-উঁচু সাহিত্য-বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন।
