শেষপর্যন্ত ছোটোমেয়েটাকে নিয়েই নীলমণি রওনা হল বাবুর বাড়ির উদ্দেশে।
দেখতে দেখতে খাল পেরিয়ে নৌকো বিলে এসে নামল। আদিগন্ত সাদায় এবং শ্যামলে একখানা বিরাট চিত্রপট। জল দুলছে, জল ফুলছে, রুপোর ফেনা ছড়িয়ে নেচে উঠছে খুশিতে খেয়ালে। তার মাঝে মাঝে ধানের খেত। সাদা জলের ওপর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছে শ্যামল শস্য। বিলের প্রাণরসে পরিপূর্ণ হচ্ছে বঙ্গলীর সোনার ঝাঁপি।
আধোজাগা ধানের শিষ থেকে, ভুট্টার আগা থেকে উড়ে আসছে বড়ো বড়ো ফড়িং। ছোটো-মেয়েটা দু-হাতে ফড়িং ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল।
হঠাৎ লগিতে জোরে একটা খোঁচা দিলে নীলমণি।
কেমন ধান হয়েছে রে পুঁটি?
ভালো ধান বাবা! ফড়িংয়ের দিকে মনোযোগে রেখেই পুঁটি জবাব দিলে।
আমার ধান, বুঝলি? আমার কথাটার ওপর অস্বাভাবিক একটা জোর পড়ল। কুড়ি বিঘে থেকে একশো বিঘেয় পদার্পণের আনন্দটা নীলমণির কণ্ঠ থেকে উছলে উঠল যেন। সব আমার ধান। ওই সামনে, ওই চকের ধারে, যত দেখতে পাচ্ছিস, সব আমার।
সব তোমার? পুঁটি চোখ বড়ো বড়ো করলে।
সব আমার। এবার ঘরে আমার লক্ষ্মী পা দেবেন। তোকে সোনার মাকড়ি গড়িয়ে দেব, কেমন?
পুঁটি এতক্ষণে বড়ো একটা লাল ফড়িংকে ছোটো ছোটো হাতের মুঠোর মধ্যে ধরে ফেলেছে। ফরফর করে শব্দ করছে সেটা, পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। পুঁটি বললে, আর সোনার বালা?
সোনার বালা!
নীলমণি হো-হো করে হেসে উঠল। পুঁটি ছোটো হলেও বোকা নয়, বুদ্ধিসুদ্ধি তার আছে। মাকড়িতে কতটুকু সোনা থাকে আর! এক জোড়া সোনার বালার দাম যে অনেক বেশি সেটা সে এর মধ্যেই বুঝে নিয়েছে। শুধু দু-টুকরো মাকড়ি দিয়েই তাকে ভুলিয়ে দেওয়া যাবে না।
নীলমণি প্রসন্ন গলায় বললে, আচ্ছা আচ্ছা, সোনার বালাও দেব। কৃষ্ণের ইচ্ছায় এবারেও যদি ধানের দরটা চড়ে যায়…
একশো বিঘে জমির ঘন শ্যামল ধানের দিকে নীলমণি তাকাল। হঠাৎ নিজেকে মনে হল সম্রাট, মনে হল কী বিরাট ঐশ্বর্যের অধিস্বামী। সামনে যতদূরে তাকাও—তার ধান, তার শস্য, তার রাজকর। এই তো সূত্রপাত। সামনে এখনও দিন পড়ে আছে—পড়ে আছে যুদ্ধ। শেষপর্যন্ত নীলমণি কোথায় গিয়ে যে পৌঁছোবে কে বলতে পারে? তারপর একদিন হয়তো পাঁচ বছর, হয়তো-বা সাত বছর পরে একদিন সেও মেজোকৰ্তার মতো বড়ো হয়ে উঠবে। সেও একদিন জন্মাষ্টমীর উৎসবে দশখানা গ্রামকে নিমন্ত্রণ করতে পারবে।
শুধু একটা সমস্যা। সাত বছর ধরে যদি এমনি আকাল চলতে থাকে, তাহলে নিমন্ত্রণ খাওয়ার জন্যে মানুষ বেঁচে থাকবে তো? নইলে জন্মাষ্টমীর উৎসবটা জমে উঠবে কাদের নিয়ে? অথচ গত বছরের অভিজ্ঞতায় যা তার চোখে পড়েছে…
ওই যা, ফড়িংটা উড়ে গেল বাবা।
নীলমণি যেন আত্মস্থ হয়ে উঠল হঠাৎ। নৌকোটা ধানখেতের মাঝখানে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, বাতাসে চারিদিকে শিরশির করছে সরস শিষ। এই খেত আগে ছিল কাশেম ফকিরের, মহাজনির প্যাঁচে নীলমণি এবারে আত্মসাৎ করেছে এটা। কোথা থেকে দমকা একটা বাতাস এল, ধানের বনের শিরশির শব্দটাকে ছাপিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেজে উঠল যেন। মনে হল কাশেম ফকির অভিশাপ দিচ্ছে। জমিটা তুমি নিলে সরকারমশাই, কিন্তু ছেলেপুলেগুলো না খেয়ে মরে যাবে!
মনের প্রসন্নতাটা যেন মেঘের ছায়ায় কালো হয়ে গেছে। এমন জোরে লগিতে খোঁচা দিলে নীলমণি যে নৌকোটা প্রায় লাফিয়ে ছিটকে এল তিন হাত। অনেক দূরে কোথা থেকে বাজনার শব্দ, নিশ্চয় মেজোকর্তার বাড়িতে। ক্ষণিকের দ্বিধাগ্রস্ত মনটা হঠাৎ যেন আশ্রয় পেল, আশ্বাস পেল।
বাবা, ফড়িংটা পালিয়ে গেল।
পালাক। রূঢ়কণ্ঠে জবাব দিয়ে নীলমণি লগি উঠিয়ে বোঠে ধরলে। খেত ছাড়িয়ে এবার গভীর বিল। থইথই সাদা জল। বোঠের টানে নৌকো তরতরিয়ে এগিয়ে চলল। আর দূরে পিছনে বিকালের হাওয়ায় দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল কাশেম ফকিরের ধানের খেত।
বাবুর বাড়িতে পা দিয়েই নীলমণির তো চক্ষুস্থির।
হ্যাঁ, আয়োজন যদি করতে হয়, তাহলে এমনি করেই। বাড়ির সামনেকার মাঠটায় প্রকান্ড মেলা বসে গিয়েছে। বেলুন উড়ছে, ভেঁপু বাজছে, নাগরদোলা ঘুরে চলেছে। পোড়া তেলের কড়া গন্ধ ছড়িয়ে প্রকান্ড কড়াতে ভাজা হচ্ছে বেগুনি, নিমকি, জিলিপি। মাটির পাখি, কাঠের ঘোড়া। পুঁতির মালা, কাচের চুড়ি, মেটেসাবান, তাঁতের শাড়ি, রঙিন তোয়ালে। টিনের বাক্সে জার্মান বায়োস্কোপ :
দ্যাখো দ্যাখো যুদ্ধ হইল, কত মানুষ মরে গেল,
সাহেব বিবি চলে আইল–তামাশা লেও এক পইয়া—
পুঁটি আর চলতে চায় না।
বাবা, পাখি কিনব।
দু-পয়সার তেলেভাজা বাবা।
নীলমণি বললে, চল চল। আগে বাবুর সঙ্গে দেখা করি, প্রসাদ পাই ঠাকুরের, তবে না?
ঠাকুরবাড়িতে আরও বেশি ভিড়। আগে যখন নীলমণি দেখেছিল তখন রাধাশ্যামের আঙিনা জরাজীর্ণ। মন্দিরের দেওয়াল ফেটে গিয়েছে, ছাদ দিয়ে বর্ষার জল চুইয়ে পড়ে দেওয়ালের গায়ে গায়ে এঁকে দিয়েছে শ্যামল সরীসৃপ-চিহ্ন। কার্নিশে কার্নিশে আশ্রয় নিয়েছে। পারাবতের সংসার। কলকূজন আর আবর্জনায় তারা অত বড়ো মন্দিরটাকে পরিপূর্ণ করে রেখেছে। ঠাকুরের শীতল হয় নামে মাত্র, শুধু এক-একটা ক্ষীণ শঙ্খধ্বনি মন্দিরের ফাটলে ফাটলে অতীতের গোঙানির মতো মূৰ্ছিত হয়ে পড়ে।
কত বার দেবালয়ের এই শ্মশানে প্রণাম করে গেছে নীলমণি। চোখে জল এসেছে মন্দিরের এই অবস্থা দেখে। অথচ বডোকর্তার আমলে কত সমারোহ ছিল এর, কত প্রাণ ছিল। সেদিনের শঙ্খগুলো ধুলো হয়ে ঝরে-পড়া বালি আর কাঁকরের সঙ্গে মিশে গিয়েছে, বড়ো বড়ো ঘণ্টাগুলো ভেঙে মরচে ধরে ছড়িয়ে আছে আনাচেকানাচে, ইঁদুরে কেটে নিয়েছে চামর ছত্র, ঠাকুরের গায়ের সোনাদানা অবধি বিক্রি হয়ে গেছে দেনায়।
