মেজোকর্তার সঙ্গে এই বিলের কোথায় কী যেন মিল আছে একটা। হঠাৎ জল—হঠাৎ সমুদ্র। তরঙ্গে তরঙ্গে রুপোর ফেনা।
জন্মাষ্টমীর মেলায় আসার জন্যে বাবু নিজে থেকে বার বার বলে দিয়েছেন। আসতেই হবে। পালচৌধুরিদের সঙ্গে সাত পুরুষের সম্পর্ক, বাবুদের ওঠা-পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নীলমণি নিজেও তার আন্দোলন অনুভব করেছে। কী আশ্চর্য লোক ছিলেন বড়োকর্তা! নীলমণিকে যেন ছেলের মতো ভালোবাসতেন। সুন্দরগঞ্জের বাঁড়জ্যেদের সঙ্গে বড়ো মামলাটায় হারার খবর পেয়ে আচমকা মারা গিয়েছিলেন তিনি। ডাক্তার বলেছিল, এত বড়ড়া একটা আঘাত হঠাৎ তিনি সহ্য করতে পারেননি।মাথার শিরা ছিঁড়ে গিয়ে প্রচুর রক্তপাতের ফলে মৃত্যু ঘটেছিল তাঁর। আর নীলমণি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছারি-পিছাড়ি খেয়েছিল, নিজের বাপ মরার পরেও অমন করে চোখের জল ফেলেনি সে।
মেজোকর্তা অবশ্য একটু আলাদা জাতের মানুষ। কথা বলতেন কম, কিছুটা লেখাপড়া জানতেন বলেই হয়তো প্রজাদের সঙ্গে মেশামেশি বা মাখামাখি করতে তাঁর রুচিতে বাঁধত। কখনো কখনো পুকুরে বসে মাছ ধরতেন, কখনো কখনো কাটাতেন নিজের-হাতে-তৈরি তাঁর কলমের বাগানে। চোখে সোনার চশমা আর গায়ে গেঞ্জি, এই লোকটির সঙ্গে বডোকর্তার অমিলটা বড়ো বেশি করেই চোখে পড়ত। প্রকান্ড ভুড়ি নিয়ে কাঁধে লাল গামছা জড়িয়ে আসর জমিয়ে বসতেন বড়োকর্তা। মোটা মানুষ ছিলেন, জামা গায়ে রাখতে পারতেন না। হোহোহা করে হাসতেন, অকারণে চেঁচিয়ে কথা বলতেন। হাসির ধমকে ভাঁজে ভাঁজে ভুড়িটা দোল খেত।
বড়োকর্তা যতদিন বেঁচেছিলেন, ততদিন মেজোকর্তা ছিলেন যেন পাহাড়ের আড়ালে। তারপর একদিন সে-আড়াল সরে গেল। এতদিন কী করে যে জোড়াতাড়া দিয়ে সংসার চলছিল, বজায় থাকছিল তার ঠাটঠমক, সে-রহস্য একমাত্র বডোকর্তারই জানা ছিল। কিন্তু চমক ভেঙে মেজোকর্তা দেখলেন অকুল পাথার। চারদিকে দেনা, বাস্তুভিটে যায় যায়। জমিদারি তো দূরের কথা, দু-মুঠো ভাতই এখন জোটানো শক্ত হয়ে উঠেছে।
তারপরে দুঃখের ইতিহাস। মেজোগিন্নির গায়ের সোনাদানা গেল, গেল রুপোর বাসন কোসন। কলমি শাকের চচ্চড়ি আর রাঙা চালের ভাত সম্বল। কোথায় রইল কলমের বাগান, কোথায় রইল জার্মান হুইল আর সখের বঁড়শি। মেজোকর্তার পঞ্চাশ ইঞ্চি ধুতি উঠল হাঁটুর ওপরে।
তারও পরে একদিন মেজোকর্তা কলকাতায় চলে গেলেন। ভাগ্যের চাকাটা ঘুরেছে, তিনি গ্রামে ফিরেছেন। এবারে জাঁকিয়ে জন্মাষ্টমীর উৎসব।
নীলমণির মনটা খুশিতে ভরে উঠেছে। বাবুরা উঠুক, আবার দপদপা ফিরে আসুক মালঞ্চের পালচৌধুরিদের। নীলমণি প্রকান্ড একটা গর্ব অনুভব করছে নিজের মধ্যে। বাবুর বাড়ির সাত পুরুষের চাকর সে, বাবুরা উঠলে তারও উত্থান।
তা ছাড়া আরও একটা আশ্চর্য জিনিসও নীলমণিকে চমৎকৃত করে দিয়েছে। দেশে দুর্ভিক্ষ গেছে, না খেয়ে মরে গেছে মানুষ, কিন্তু বাবুদের সঙ্গে ভাগ্যের একটা অলক্ষ সূত্রে যোগাযোগ থাকার জন্যেই হয়তো এই দুর্দিনে তারও কপাল ফিরেছে।
সামান্য মহাজনির কারবার ছিল। সুদে আর বন্ধকিতে যা আসত তাতে দিন চলে যেত। কিন্তু রোজগারের সেই সংকীর্ণ খাতে হঠাৎ যেন জোয়ার নেমে এল তার। নিরুপায় মানুষ নামমাত্র মূল্যে ধানের জমি বিক্রি করতে শুরু করে দিলে। বিলের যেসব ডুবোজমিতে বর্ষার পরে সোনার মতো ফলন হয়, আট-দশ টাকা বিঘা দরে লোকে সেসব জমি ছেড়ে দিলে নীলমণিকে। বিক্রির প্রথম মরশুমে অতি লাভের আশায় যারা খুদকুঁড়ো অবধি বিক্রি করে দিয়েছিল, তাদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হল শেষপর্যন্ত জমি বিক্রি করে। আগে ছিল কুড়ি বিঘা, এখন নীলমণি একশো বিঘা ধানিজমির একচ্ছত্র মালিক।
দৈব, দৈব ছাড়া আর কী? মেজকর্তার ধুলোমুঠো সোনা হল, নীলমণির কুড়ি বিঘে হল একশো। হঠাৎ নীলমণির মনে হল বাবুদের সঙ্গে তার সম্পর্কটা শুধু সাতপুরুষের নয়, একেবারে জন্ম-জন্মান্তরের। অকারণেই মেজোকর্তার ওপরে তার শ্রদ্ধাটা বেড়ে গেল দ্বিগুণ। বাবুদের যত বাড়বে, তারও যেন সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলবে, সম্পর্কটা অঙ্গাঙ্গী।
সুতরাং জন্মাষ্টমীর উৎসবে যাওয়ার আহ্বানে নীলমণি উৎসাহিত হয়ে উঠল।
বউ কিছুদিন থেকে নানা জাতের অসুখে ভুগছে, বিছানা ছেড়ে নড়তে পারে না। ছেলেটাও ভুগছে ম্যালেরিয়ায়। অথচ মেজোকর্তা বলেছেন, নীলমণি, সবাইকে নিয়ে এসো, এ তো তোমার ঘরেরই কাজ।
নীলমণির রাগ হয়ে গেল। বউ কেন এভাবে পড়ে আছে বিছানায়, কেন অন্তত আজকের দিনটাতে সে মাথা তুলে উঠে বসতে পারে না, কেন খুশিতে ঝলমলে হয়ে যোগ দিতে পারে
বাবুর বাড়ির আনন্দোৎসবে? একটা প্রকান্ড ছন্দপতনের মতো বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে। সে। অসুখেরও কি দিনক্ষণ থাকতে নেই একটা?
বিছানার মধ্যে শুয়ে শুয়েই বউ নীলমণির উত্মাটা অনুভব করতে পারে।
অমন করে চেঁচিয়ে মরছ কেন?
চ্যাঁচাব না? বাবু কত করে বলেছেন সবাইকে নিয়ে যেতে, অথচ তুই দিব্যি বিছানায় পড়ে রইলি।
কী করব বলে। মরতে মরতে তো যেতে পারি না।
দরকার হলে মরতে মরতেও যেতে হয়।
গজগজ করতে করতে এল নীলমণি। ছোটোমেয়েটা সামনে এসে পড়েছে, নাকি সুরে বললে, বাবা, আমি বাবুদের বাড়িতে যাব কিন্তু।
নীলমণি নিরুত্তরে তার গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিলে।
