কী বিরক্ত করতে এলে কাজের সময়?
বাপু, যাচ্ছি আমি এক্ষুনি। ভয় নেই, তোমার সিন্দুকের চাবি আমি কেড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলব না। আরও ক-টা টাকা দিতে হবে আমাকে।
কেন? সন্দিগ্ধ কুটিল দৃষ্টিতে তাকাল নীলকণ্ঠ।
যা দিয়েছ ওতে সংসারের খরচ চলবে না।
চলবে না? হঠাৎ নীলকণ্ঠ যেন ফেটে পড়ল, কেন, মতবলটা কী? যা পার এই বেলা গুছিয়ে নিচ্ছ বুঝি? তারপর সময় পেলেই মায়ে-ব্যাটায় মিলে আমার গলায় ছুরি চালাবে?
উপসংহারে কদর্য খানিকটা গালাগালি। ডাক-চিৎকার ছেড়ে কেঁদে উঠল নিভাননী, ছুটে এল সিতিকণ্ঠ।
বাবা, কী হচ্ছে?
চোপ রও শুয়ার-কা বাচ্চা! জমিদার হবে, জমিদারের মা হবে! খুন করেঙ্গা। দোনোকে জান লে লেঙ্গা!
কী করছ বাবা? তোমার কান্ডজ্ঞান লোপ পেয়েছে? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?
কী, কী বললি? মুহূর্তে নীলকণ্ঠ নীল হয়ে গেল। এই ভয়ানক অনিবার্য কথাটার জন্যেই সে আশঙ্কা করছিল এতদিন—প্রতীক্ষা করছিল। একদিন নীলকন্ঠের সুযোগ এসেছিল, আজ সিতিকণ্ঠের। পৃথিবীতে একা ব্ৰজেন ডাক্তার নেই, অনেকে আছে—অনেক আছে সেই পাগলাগারদের দুঃস্বপ্ন। যেমন করে বিমলার চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছিল, মুখের দু পাশ দিয়ে থুতু গড়িয়ে পড়ছিল, কুকুরের মতো শব্দ করে তিনি নীলকণ্ঠকে কামড়ে দিতে এসেছিলেন, তেমনি করে নীলকণ্ঠও কি…
একটা নিমেষে একটা খন্ডপ্রলয় ঘটে গেল।
দেওয়ালে-ঝোলানো পাঁঠাবলির রামদাখানা সিতিকণ্ঠের কান ঘেঁষে যেন হাওয়ায় উড়ে গেল, ঝনাৎ করে বারান্দা থেকে একটা সিমেন্ট উঠিয়ে নিয়ে আছড়ে পড়ল উঠোনে। একটুর জন্যে লক্ষ্যভ্রষ্ট হল মৃত্যু।
থরথর করে কাঁপতে লাগল সিতিকণ্ঠ। নিভাননী অচেতনের মতো বসে পড়ল মেঝের ওপর।
পাগল! একেবারে পাগল! বেঁধে ফেলা দরকার।
এবারে নীলকণ্ঠ আর নড়তে পারল না। সমস্ত শক্তি যেন ওই রামদাখানা ছুড়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে। আর উপায় নেই, আর রক্ষা নেই। এবারে সিতিকষ্ঠের দিন এসেছে। এখন অমনি করেই তার চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসবে, তারও মুখ দিয়ে থুতু গড়িয়ে পড়বে, একটা কুকুরের মতো সেও…
হাত দুটো সিতিকণ্ঠের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নীলকণ্ঠ হঠাৎ হো-হো করে হাসতে শুরু করে
দিলে। দমকে দমকে হাসির ধাক্কায় গাল বেয়ে ফেনা গড়াতে লাগল।
বাঁধো, বাঁধো আমাকে। আমি সত্যিই পাগল, একেবারে উন্মাদ পাগল।
ব্যাধি
বাবুদের বাড়িতে জন্মাষ্টমীর মেলা, তারসঙ্গে উৎসবের আয়োজন তো আছেই। বাবুরা পরম বৈষ্ণব, এ উপলক্ষ্যে দীয়তাং ভূজ্যতাং-এর সমারোহ পড়ে যাবে তাঁদের বাড়িতে।
মাঝখানে মন্দা পড়ে গিয়েছিল। কয়েকটা বড়ো বড়ো মামলার পাপচক্রে মালঞ্চের পালচৌধুরিরা একরকম ডুবে গিয়েছিল বললেই হয়। কোনোমতে নমো নমো করে পূর্বপুরুষের ক্রিয়াকর্মগুলো রক্ষা করা হত। শোনা যাচ্ছিল পৈতৃক ভিটেটাও দিন কয়েকের মধ্যেই নিলামে উঠবে।
কিন্তু হাওয়া বদলে গেল। যুদ্ধ বাঁধল, দেখা দিল দুর্ভিক্ষ। আর আশ্চর্য, এই একান্ত দুর্বৎসরে যেন কোনো মন্ত্রবলে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল পালচৌধুরীরা। নোনাধরা দেওয়ালের কলি ফিরল, ভাঙা ঘরবাড়িগুলো নতুন করে গড়ে উঠল আবার। দশ বছর আগে হাতিটাও বিক্রি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু এবারে এল মোটর,-একখানা নয়, দুখানা। বাবুর বাড়ি আবার পূর্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হল। বাণিজ্যে লক্ষী বাস করেন। যুদ্ধের বাজারে বাবুরা নাকি জমিদারির আশা ছেড়ে ব্যাবসা ধরেছিলেন। সাধনায় সিদ্ধিলাভ হয়েছে, লক্ষী বর দিয়েছেন।
কলকাতায় লোহার কারবার করেন মেজোকর্তা। তিন বছর পরে তিনি দেশে ফিরেছেন। এবারে জাঁকিয়ে জন্মাষ্টমীর উৎসব করতে হবে। টাকার জন্যে পরোয়া নেই। নীলমণিকে স্পষ্টই বললেন, পাঁচ লাখ সাত লাখ টাকার জন্যে তিনি একবিন্দু মাথা ঘামান না। তিনি আজ ধুলোমুঠো ধরলেই তা সোনা হয়ে যাবে।
শুনে নীলমণি রোমাঞ্চিত হয়ে গিয়েছিল।
মেজোকর্তা গড়গড়ায় টান দিয়ে বললেন, বিশ হাজার টাকা খরচ করব এবার। তাক লাগিয়ে দেব আশপাশের বিশখানা গ্রামকে, সুন্দরগঞ্জের বাঁড়জ্যেদের। তোমার গাঁয়ের সব লোককে বলে দিয়ো নীলমণি, এখানে এবারে তাদের পাতা পড়বে। আর তুমি? তুমি তো ঘরের লোক, বাড়ির সবাইকে নিয়েই চলে এসো, কী বল?
চরিতার্থ হয়ে নীলমণি বলেছিল, আজ্ঞে আনব বই কী, নিশ্চয়।
ভাদ্রের ভরা বিল। ধানখেত আর ভুট্টার শিষের ভেতর দিয়ে নৌকো ঠেলে আসার সময় নীলমণির মনে হয়েছিল কপাল কি এমনি করেই ফেরে মানুষের! তিন বছর আগে এই মেজোকর্তাকেই আট হাত ধুতি পরে সুষ্ঠু কলমি শাক দিয়ে মোটা লাল বাগড়া ভাত খেতে দেখেছিল সে, এবং সেই রাঙা বাগড়া চালও যে কোথা থেকে আমদানি হয়েছিল সে-ইতিহাস নীলমণিই সব চাইতে ভালো করে জানে। সন্ধ্যার অন্ধকারে মেজোগিন্নির নাম লেখা রুপোর বাটিটাকে চাদর ঢাকা দিয়ে সে-ই বিক্রি করে এসেছিল হারান মুদির দোকানে, আর নিরানন্দ নিরালোক বাবুদের বাড়ির ভাঙা তুলসীমঞ্চটার পাশে দাঁড়িয়ে শুনতে পেয়েছিল ঘরের মধ্যে মেজোগিন্নি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।
বিলের জলে সন্ধ্যার বাতাস দোলা দিয়েছে। চারদিকে জল দুলে উঠছে, ফুলে উঠছে, ফেনায় ফেনায় ভেঙে পড়ছে সিন্ধুতরঙ্গের মতো। আর সমস্ত বিল জুড়ে পঞ্চমীর ম্লান অস্তোন্মুখ জ্যোৎস্নায় সেই ফেনা যেন গলিত পুঞ্জ পুঞ্জ রুপোর মতো ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে। অন্তহীন জল, সমুদ্রের মতো জল! মাঠ ডুবিয়েছে, পুকুর ডুবিয়েছে, ধানের খেত, ভুট্টা আর জোয়ারকে তলিয়ে দিয়েছে। ডুবিয়েছে মাঠের ছোটো-বড়ো গাছপালার কুঞ্জকে। এত জল কোথা থেকে এল হঠাৎ। শুকনো খটখটে মাঠ দিয়ে নৌকো যেত, পালকি যেত, পায়ে পায়ে লাগত ধারালো কুশের আচড়। কিন্তু তার পরেই দু-দিন দু-রাত টানা বর্ষাকালো মেঘ থেকে অবিরাম বৃষ্টি। দূরের নদী থেকে ঢালু মাঠের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে জল এল, জল এল কুন্ডলী-করা অসংখ্য কালো কালো অজগর সাপের মতো। দেখতে দেখতে মাঠ হল সমুদ্র। বারো হাত লগি আর থই পায় না, মাথাসুদ্ধ তলিয়ে যায় তার।
