কে?
নীলকণ্ঠ চমকে উঠল। বারান্দায় জুতোর শব্দ।
কে? কে ওখানে?
আমি।
আমি কে? প্রায় বিকৃত গলায় ঘর-ফাটানো চিৎকার উঠল।
আমি সিতিকণ্ঠ।
ঠক করে হাতের হুঁকোটা রেখে বিদ্যুৎগতিতে নীলকণ্ঠ দাঁড়িয়ে পড়ল। ধড়াস করে খুলে ফেললে দরজাটা, হাতের লণ্ঠনটার তেজ বাড়িয়ে দিলে।
এত রাত্তিরে বাইরে কী করছ?
আঠারো বছরের ছেলে সিতিকণ্ঠ বাপের মুখের দিকে বিহ্বলচোখে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। অপরাধীর মতো জবাব দিলে, ঘরে বডড গরম, একটু হাওয়া…
ঘরে বড় গরম! বিশ্রীভাবে মুখটাকে ভেংচে উঠল নীলকণ্ঠ, তাই দুপুররাতে বারান্দায় পায়চারি করে বেড়াচ্ছ? তুমি জমিদারের ছেলে, তাই না? টাকার গরমটা আজকাল বুঝি একটু বেশি ঠেকছে?
নীলকণ্ঠের মুখের ভাব দেখলে মনে হয়, যেকোনো সময় একটা প্রকান্ড চড় সে বসিয়ে দিতে পারে। এক-পা এক-পা করে পিছোতে লাগল সিতিকণ্ঠ।
জমিদারের ছেলে! বিকটভাবে নীলকণ্ঠ বলে চলল, সম্পত্তির মালিক হবে! সে-গুড়ে বালি, সে-গুড়ে বালি। আমি শিগগির মরব না, আমি পাগলও নই, বুঝেছ? যদি কোনো মতলব থাকে সেসব ছাড়ো, যাও, ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো। বুঝেছ? এক্ষুনি যাও।
পরক্ষণেই বেগে ঘরে ঢুকে পড়ল নীলকণ্ঠ। দড়াম করে সশব্দে আটকে দিলে হুড়কোটা। দরজাটা খুব শক্ত করে বন্ধ করা চাই—আরও শক্ত করে। কাল থেকে ভেতরেও একটা তালা লাগাবার বন্দোবস্ত করবে সে।
অথচ দিনের বেলা কোনো গোলমাল নেই। ভোর হওয়ার আগেই নীলকণ্ঠ বাইরে বেরিয়ে আসে। হাত-মুখ ধোয়, চা খায়, তারপর ঘোড়ায় জিন চাপিয়ে বেরিয়ে যায় খামারে। এখন খন্দের সময়, আদায় তহশিলের দিন। নিজে ভালো করে দেখাশোনা না করলে চলে না।
আশ্চর্য, প্রজাদের কাছে নীলকণ্ঠ যেন মাটির মানুষ। এত বড়ো সম্পত্তির মালিক, দশখানা গাঁয়ের ভেতরে একটা জাঁদরেল জমিদার; কিন্তু কোনো অহমিকা নেই। মাঠে যেখানে ফসল কাটা হচ্ছে সেখানে ঘোড়া বেঁধে একটা বাবলা গাছের ছায়ায় গিয়ে বসে। প্রজাদের সঙ্গে তামাক খায়, গল্প করে।
অত্যন্ত ঘরোয়া গল্প। অত্যন্ত অন্তরঙ্গ।
কী রে, তোর ছেলে কেমন? জ্বর ছেড়েছে? যদি না ছাড়ে আমার ওখানে পাঠিয়ে দিস, ভালো হোমোপ্যাথিক ওষুধ দেব—একেবারে সেরে যাবে। হ্যাঁ, এবার তোদের গাঁয়ে একটা কুয়ো করে দেব। ভারি জলের কষ্ট তাই না? কিন্তু দেখছিস তো যুদ্ধের বাজার—চুন-সুরকি কিছু পাওয়া যাচ্ছে না, নইলে…
প্রজারা খুশি হয়, কৃতজ্ঞ হয়, আনন্দে রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। নীলকণ্ঠকে সাক্ষাৎ দেবতা বলে মনে হয় যেন। দরকার হলে খাজনাপত্তরও মাপ পাওয়া যায় তার কাছে। তার দয়া আছে, বিবেচনা আছে।
নীলকণ্ঠ দুলে দুলে হাসে, স্নেহভরে তাকায় আর দা-কাটা তামাক টানে তারিয়ে তারিয়ে। বাবলা গাছের ঠাণ্ডা ছায়ায় খোলা মাঠের মধ্যে মনটাও যেন খুলে গেছে।
খুড়িঠাকরুনের আমলে কেমন ছিলি তাই বল?
বারে বারে নীলকণ্ঠ এই প্রশ্ন করে। কী জবাব পেলে সে খুশি হয় প্রজারাও তা জানে। উঃ, সেকথা বলবেন না বাবু! একেবারে সাক্ষাৎ যখ। একটি পয়সা রেয়াত করতেন না, বুকে হাঁটু দাবিয়ে আদায় করতেন।
এই দ্যাখ, এই দ্যাখ। তেমনি দুলে দুলে হাসে নীলকণ্ঠ, এ না হলে অমন হয়? এ হল পাপের প্রাচিত্তির, বুঝলি? রাইয়ত বলে কি মানুষ নয় তারা? ধর্ম জেগে আছেন না? তিনিই বিচার করেন।
প্রজারা সায় দেয়।
তাই ধর্মস্থানে গিয়েই একেবারে বেহেড পাগল। এ বাবা ধর্মের কল, বাতাসে নড়বে; এর ওপরে কোনো কথা আছে নাকি? বল, তোরাই বল-না? বল সত্য কি না?
সত্যিই তো। কোনো ভুল নেই, সন্দেহ নেই কারও। তবু বারে বারে জিজ্ঞাসা করে নীলকণ্ঠ, ঘুরে ঘুরে ওই একটা কথাকেই যাচাই করতে চায়, প্রমাণ করতে চায়। শুধু বাইরের পৃথিবী নয়, যেন নিজের মনের কাছেও সে আশ্বাস খোঁজে। ধর্মের কল বই কী। কত প্রজাকেই যে বিমলা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছন্ন করেছেন! নীলকণ্ঠ কে? শুধু নিমিত্ত মাত্র।
বেলা দুপুর গড়িয়ে গেলে সে ফিরে বাড়ির দিকে রওনা হয়। খর-রৌদ্রে ঘোড়াটা ভালো করে চলতে পারে না, চষা জমির শুকনো মাটির ডেলাগুলোতে বারে বারে হোঁচট খায়। রোদের তাতে চাঁদি গরম হয়ে ওঠে, বুকের ভেতরটা জ্বালা করে। সত্যিই তো, এ বিমলার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। সবাই একথা মেনে নিয়েছে, তবু নিজেকে কেন মানাতে পারে না নীলকণ্ঠ? যেন চারদিকের আগুনঝরা ধু-ধু প্রান্তরের মতো তারও মনের ভেতরে কী পুড়ে যায়। কোথায় যেন সুর মিলছে না, কোথায় যেন বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে। রাত্রে ঘুমুতে পারে না, দূরে কে চিৎকার করে, মুখের ওপরে কে গরম নিশ্বাস ফেলে, গভীর অন্ধকারে সন্দেহজনক পা ফেলে হাঁটে সিতিকণ্ঠ, নিভাননীর টাকার খাঁই আর মেটে না।
কেমন সন্দেহ হয়। ব্ৰজেন ডাক্তার মদের সঙ্গে তাকেও কিছু খাইয়ে দেয়নি তো? বিশ্বাস নেই, কিছুই বিশ্বাস নেই। জ্বলন্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছা হয় নীলকণ্ঠের। চিৎকার করে বলতে চায়, না না, দোষ নেই, কারও দোষ নেই। আমি কিছু করিনি, আমাকে নিষ্কৃতি দাও।
হঠাৎ ঘোড়ার পিঠে একটা হিংস্র চাবুক পড়ে। বনবাদার ভেঙে পাগলের মতো ছুটতে শুরু করে ঘোড়াটা, যেন একমাত্র সে-ই নীলকণ্ঠকে বুঝতে পেরেছে।
সন্ধ্যায় সামনে এসে দাঁড়াল নিভাননী।
শুনছ? এ মাসে আরও কিছু টাকা চাই যে। নীলকণ্ঠ চমকে উঠল। থাবা দিয়ে সামনে থেকে সরিয়ে নিলে সিন্দুকের চাবিটা।
