বিমলা চমকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সরে যেতে পারলেন না। অস্থিসর্বস্ব সেই কঙ্কাল হাতখানা চকিতে বিমলার চুলের গোছা আঁকড়ে ধরে ফেলেছে—টান দিয়েছে দানবীয় শক্তিতে। মাথা ঘুরে বিমলা সোজা মেঝের ওপরে পড়ে গেলেন, মুখ দিয়ে শুধু একটা গোঙানির শব্দ বেরুতে লাগল।
তক্তাপোশের তলায় কে যেন দাঁতে দাঁত কড়মড় করছে।
রাক্ষুসি, ডাইনি। সোয়ামিকে খেয়েছিস, আমার বারো বছরের মেয়েটাকে চিবিয়ে খেয়েছিস, আবার আমাকেও খেতে এলি। আজ আমি তোকেই চিবিয়ে খাব।
শেষ শক্তিতে একটা ঝটকা দিয়ে বিমলা উঠে বসলেন। দম আটকে আসছে, চোখে ধোঁয়া দেখছেন, লণ্ঠনের আলোয় ভৌতিক ঘরটা যেন দৃষ্টির সামনে ঘুরপাক খাচ্ছে। মাথার ভেতরে অসহ্য যন্ত্রণা, ওই সাদা কঙ্কাল হাতটা একগুচ্ছ চুল আঙুলে জড়িয়ে নিয়ে সমস্ত মেঝেটা হাতড়ে বেড়াচ্ছে—যেন বিমলাকেই খুঁজছে।
খোলো, খোলো-দরজা খোলো। ওগো কে আছ—বাঁচাও?
কিন্তু গলার স্বর তলিয়ে যাচ্ছে। রক্তাক্ত মাথা আর মুখ নিয়ে সেই মেয়েটা হাসছে। নিজের রক্ত গড়িয়ে পড়ছে তার মুখে, সেই রক্ত সে জিভ দিয়ে চেটে চেটে খাচ্ছে আর জানোয়ারের মতো একরাশ ধারালো দাঁত বের করে হেসে চলেছে অনবরত। মেঝের ওপর একখানা কঙ্কাল হাত অবিশ্রান্ত কী যেন খুঁজছে।
আতঙ্কের যতটুকু বাকি ছিল এবারে তাও পূর্ণ হয়ে উঠল।
অন্ধকার কোনা থেকে বিদ্যুৎচমকের মতো একটা মূর্তি লণ্ঠনের আলোয় যেন মাটি খুঁড়ে উঠে এল। সম্পূর্ণ উলঙ্গ একটি নারীমূর্তি। গায়ের রং পাথরের মতো কুচকুচে কালো। বুকের ওপর উজ্জ্বল একটা শুকনো ক্ষতচিহ্ন।
আগুনের মতো দুটো চোখ বিমলার দিকে ফেলে বললে, এই মড়া এনেছিস? আমি রক্ষাচন্ডী, মড়া খাব। কড়মড় করে মড়ার মাথা কাঁচা চিবিয়ে খেতে বড্ড ভালো লাগে, তুই মড়া আনিসনি?
পায়ের তলা থেকে সমস্ত পৃথিবী সরে যাচ্ছে।
কী, বিশ্বাস হচ্ছে না? বিশ্বাস হচ্ছে না এখনও? জটাবাঁধা একরাশ চুলে ঝাঁকুনি দিয়ে সেই উলঙ্গ মূর্তিটা গর্জন করে উঠল, তবে দেখবি? দ্যাখ, দ্যাখ।
বিমলা দেখলেন সেই বিকট মুখখানা থেকে আধ হাত লম্বা একখানা লকলকে কালো জিভ বেরিয়ে এল। আর জিভটা দুলতে দুলতে ক্রমেই তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল, যেন–যেন…
শেষ বার আর্তনাদ করে দরজার গায়ে হেলে পড়লেন বিমলা। নিজের রক্ত চাটতে চাটতে সেই মেয়েটা তখনও হাসছে, তখনও কঙ্কাল হাতখানা জোঁকের মতো কতকগুলো আঙুল জড়িয়ে মেঝের ওপরে কী খুঁজে বেড়াচ্ছে।
বাইরের ঘরে তখন মদের বোতল খুলে বসেছে ব্ৰজেন ডাক্তার আর নীলকণ্ঠ।
আকাশে বর্ষার মেঘ গুম গুম করে ডাকছে। দুর্যোগের আশঙ্কায় পৃথিবী নিস্পন্দ। লোকালয়ের সীমা থেকে বহুদূরে এই উন্মাদ আশ্রমে অন্ধকারের প্রেতছায়া।
রক্তের মধ্যে নাচছে মদের চমচমে নেশা, বুকের মধ্যে আনন্দ-আকাঙ্ক্ষার জোয়ার। পনেরো হাজার টাকার সম্পত্তির স্বর্ণদীপ্তি ছায়া ফেলছে নীলকণ্ঠের চেতনায়, ফেলছে ব্ৰজেন ডাক্তারের মনে।
আবেগে নীলকণ্ঠ ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল। ডাক্তারের একখানা হাত জড়িয়ে ধরে বললে, আর-জন্মে তুমি আমার কী ছিলে ব্রাদার? বাবা না বাবার শালা?
তোমার শালা। বলে নিজের রসিকতায় ব্রজেন ডাক্তার হেসে উঠল। কিন্তু তার কথা সে রাখলে। সাত দিন পরে যখন নীলকণ্ঠ গ্রামে ফিরল, তখন অবাকবিস্ময়ে সকলে শুনতে পেল, তারকেশ্বরে যাবার পথে বিমলার মাথা হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়—একবারে উন্মাদ পাগল। তাই কর্তব্যপরায়ণ নীলকণ্ঠ তাকে এখানে না এনে সোজা উন্মাদ নিকেতনে জমা দিয়ে এসেছে।
কুটিল সন্দেহে এক বার নীলকণ্ঠের মুখের দিকে তাকিয়ে গাঁয়ের লোকে বললে, আ…হা! চুক চুক।
তারপরে পথ পরিষ্কার। দিন কয়েক আদালত-কাছারি, উকিলের পরামর্শ সব সহজ হয়ে গেল। কোনো ক্ষোভ নেই নীলকণ্ঠের, কোনো অতৃপ্তি নেই। শুধু একমাত্র আশঙ্কা বিমলা হঠাৎ কবে ভালো হয়ে যান, হঠাৎ কোন দিন বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো…
কিন্তু ভরসা আছে ব্ৰজেন ডাক্তার। দুঃসময়ের বন্ধু, দুর্দিনের কান্ডারি। যতদিন সে বেঁচে আছে ততদিন ভাবনা নেই। তবু মনটা যেমন উৎকর্ণ, তেমনি উৎকণ্ঠ হয়ে থাকে। নীলকন্ঠের আজকাল ভয় করে—একটা অদ্ভুত অস্বাভাবিক ভয়। কালো মেঘের মতো ঘন সংশয়ে চেতনা আকীর্ণ হয়ে থাকে। রাত্রে ঘুমের মধ্যে মনে হয় বহুদূরে অন্ধকারে কারা যেন পাগলের মতো অস্বাভাবিক গলায় চিৎকার করছে। মুখের ওপর হঠাৎ যেন কার একটা উষ্ণ নিশ্বাস এসে পড়ছে,–কার? বিমলার? বাইরে অন্ধকারে শুকনো পাতার ওপরে কী চলাফেরা করছে,–শেয়াল না পুলিশ?
ঘুমের ঝোঁকটা ভেঙে যায়। চমকে বিছানার ওপরে উঠে বসে নীলকণ্ঠ। মাথার ভেতরে রক্ত দাপাদাপি করে, মাতালের মতো লাফাতে থাকে শিরাগুলো। ঘরে অন্ধকার, বাইরে অন্ধকার। জানলার কাছ থেকে কে সরে গেল? ব্রজেন ডাক্তারের ওপর বিশ্বাস রাখতে ভরসা হয় না, যদি কখনো মদের ঝোঁকে…
ঘরের এককোণে মালসা থেকে আগুন নিয়ে নিজেই হুঁকোটা ধরায় নীলকণ্ঠ। এত রাত্রে চাকরকে ডাকতে ইচ্ছে করে না—কেমন ভয় করে, কেমন সংশয় জাগে। ঘরে লোহার সিন্দুক, কোমরে চাবির তাড়া। যেকোনো অসতর্ক মুহূর্তে ওই চাকরটাই হয়তো গলাটা টিপে ধরতে পারে। বিশ্বাস নেই কাউকে, পৃথিবীর কাউকে না—ব্রজেন ডাক্তারকেও নয়।
