হাতের মালা জপ করতে করতে বিমলা বললেন, এ কোথায় এলাম নীলু?
সেকথার জবাব না দিয়ে নীলকণ্ঠ নিজেই কাঁধে তুলে নিলে বিমলার ভারী ট্রাঙ্কটা। বললে, চলো খুড়িমা।
কোথায় যেতে হবে? এ তো বাবার থান বলে মনে হচ্ছে না।
না, বাবার থান নয়। সকাল বেলায় এখান থেকে গাড়ি বদল করে তারকেশ্বরে যেতে হবে। চলো, ভালো ধর্মশালা আছে, রাতটা সেখানেই কাটিয়ে…
বিমলা বললেন, তা বেশ। কিন্তু আমি তো বাবা বিধবা মানুষ, ধর্মশালার আচার-বিচার…
সেসব তোমাকে ভাবতে হবে না খুড়িমা। আমি আছি কী করতে? নীলকণ্ঠ এমনভাবে একমুখ হাসলে যে বিমলার আর বলবার কিছু রইল না।
রেললাইন ছাড়িয়ে দুজনে মেঠোপথে নেমে পড়ল। আকাশ আজও অন্ধকার, দিগন্তে যে চাঁদ দেখা দিয়েছিল অনেকক্ষণ আগেই তা মেঘের অন্তরালে হারিয়ে গেছে। শুধুকতগুলো জ্বলজ্বলে তারা সংশয়াকুল চোখে দৃষ্টি ফেলছে পশ্চিমের দিকচক্র থেকে। দু-পাশের ডোবায় জমা বৃষ্টির জল থেকে উঠছে ব্যাঙের কোলাহল। পথের কাদায় বিমলার পা পিছলে যেতে লাগল।
হঠাৎ একটা সন্দেহে ভারী হয়ে উঠল বিমলার মন। নির্জন অন্ধকার পথ। চিৎকার করলেও কারও সাড়া পাওয়া যাবে না কোনোখানে। হাতের মালার ভেতরে বিমলার আঙুল আটকে গেল।
কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস নীলু? তোর মতলব কী?
এক মুহূর্তের জন্যে যেন পাথর হয়ে গেল নীলকণ্ঠ। বিমলা কি বুঝতে পেরেছেন সব? কিন্তু এক মুহূর্ত মাত্র, নিজেকে সামলে নিতে নীলকণ্ঠের সময় লাগল না।
কেন ভয় পাচ্ছ খুড়িমা, এসে পড়েছি। ওই যে আলো দেখতে পাচ্ছ না?
সত্যিই আলো দেখা গেল। অন্ধকার মাঠের ভেতরে ব্রজেন পালের উন্মাদ নিকেতনে আলো জ্বলছে। আগে থেকেই পাকা বন্দোবস্ত আছে নীলকণ্ঠের।
বিমলা আলো দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন, ওইটেই কি ধর্মশালা নাকি?
নিশ্চয়। শেয়ালের মতো শব্দ করে নীলকণ্ঠ হেসে উঠল, ধর্মশালা বই কী। চমৎকার জায়গা। ওখানে এক বার ঢুকলে তুমি আর বেরুতে চাইবে না।
বিমলার সর্বাঙ্গে চমক লাগল। পথের মাঝখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, যেন এই মুহূর্তে তাঁর বুকের ভেতর থেকে একটা উদ্দাম ভয়ংকর চিৎকার বেরিয়ে আসবে। কিন্তু বিমলা কিছু করবার আগেই একটা লণ্ঠন হাতে করে এগিয়ে এল ব্রজেন ডাক্তার। একগাল আপ্যায়নের হাসি হেসে বললে, এই যে, আসুন আসুন!
ব্ৰজেন ডাক্তার বললে, চলুন, তাহলে আপনার শোবার বন্দোবস্ত করে দিই। ভয় নেই, কোনো কষ্ট হবে না।
বিমলা সংশয়গ্রস্ত হয়ে বললেন, কিন্তু নীলু?
উনি পুরুষ, ওঁর ব্যবস্থা আলাদা। চলুন। সামনে এটা অন্ধকার ঘর। বাইরে থেকে একটা লণ্ঠন নিয়ে ব্রজেন ডাক্তার বিমলার হাতে তুলে দিলে। বললে, সব ঠিক করা আছে, গিয়ে শুয়ে পড়ুন।
লণ্ঠন নিয়ে বিমলা ঘরে ঢুকলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে নিঃশব্দে দরজা বন্ধ হয়ে গেল, শিকল পড়ল খুট করে।
শিকল তোলবার শব্দ বিমলা হয়তো শুনতে পেতেন, কিন্তু শুনতে তিনি পেলেন না। লণ্ঠনের আলোয় সমস্ত ঘরটা ভালো করে আভাসিত হয়ে ওঠবার সঙ্গে সঙ্গেই এমন একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা গেল যে, বিমলার হৃৎস্পন্দন যেন ত্রস্ত হয়ে থেমে দাঁড়াল।
টাকা দাও, টাকা দাও বলছি। নইলে আমি মাথা খুঁড়ে রক্তগঙ্গা হয়ে মরব।
একখানা লম্বা ঘর। তার দরজা-জানলা সব বন্ধ-করা। বাতাসের অভাবে যেন নিশ্বাস আটকে আসে। একটা চাপা ভ্যাপসা গরম, তার ভেতরে জমাট হয়ে আছে তীব্র দুর্গন্ধ–বমির গন্ধ। ঘরের তিন দিকে তিনটি তক্তাপোশ, তার বালিশ-বিছানা মেঝেতে পাকার হয়ে পড়ে আছে। আর সেখানে একটি মানুষ!
একটি মানুষ! এক লহমার মধ্যেই বিমলা সংবিৎ ফিরে পেলেন। ছুটে পালাতে চাইলেন বাইরে। কিন্তু দরজা বন্ধ—ভালো করেই বন্ধ। নুনের গুণ জানে ব্রজেন ডাক্তার।
বিমলা চিৎকার করে বললেন, দরজা খুলে দাও—শিগগির খুলে দাও। এ আমি কোথায় এলাম? শুনছ? দরজা বন্ধ করে দিলে কেন? খুলে দাও।
বাইরে থেকে সাড়া এল না, কিন্তু সমস্ত ঘরটা সজীব হয়ে উঠল। হি-হি-হি করে একটা প্রচন্ড কৌতুকের হাসিতে বিমলার কণ্ঠস্বর তলিয়ে গেল।
কে হাসছে? অমন করে কে হাসছে?
যে হাসছে সে একটি মেয়ে। তার সমস্ত কপালটা তাজা রক্তে রাঙা, তার গাল মুখ বেয়ে টপ টপ করে রক্ত বুকের ওপরে গড়িয়ে পড়ছে। চোখে দেখলেও বিশ্বাস করা যায় না সারা গায়ে অমন রক্তস্রোত নিয়ে কেউ অমন করে হাসতে পারে কখনো। ভ্যাপসা বন্ধ ঘরে বমি আর নোংরার দুর্গন্ধের মধ্যে লণ্ঠনের অস্বচ্ছ একটা রহস্যময় আলোর একটা ভয়ংকর বিভীষিকা।
ভয় পাচ্ছ? কেন ভয় পাচ্ছ? টাকা দেবে না? তাহলে আমি মাথা খুঁড়ে মরব, ঠিক মাথা খুঁড়ে মরব। মেয়েটা সেই রক্তাক্ত মাথাটা তেমনি করে দেওয়ালের গায়ে ঠুকতে লাগল, সাদা চুনের গায়ে জ্বলজ্বল করতে লাগল এলোমেলো রক্তের ছোপ।
ভাঙা-গলায় আর্তনাদ করে প্রাণপণে দরজা ধাক্কাতে লাগলেন বিমলা। খুলে দাও। ওগো কে আছ, খুলে দাও। এ আমাকে কোথায় নিয়ে এলে?
মুহূর্তে পাশের তক্তাপোশের তলা থেকে একখানা হাত বেরিয়ে এল। একখানা সাদা হাত, তাতে একপর্দা পাতলা চামড়া আর কয়েকখানা হাড়ের টুকরো ছাড়া কিছু নেই। লণ্ঠনের আলোয় তক্তাপোশের নীচে কিছু দেখা যায় না, মনে হয় যেন কোনো একটা দেহহীন
অশরীরী একটা অমানুষিক হাত লোলুপভাবে বিমলার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
