তবু ব্ৰজেন ডাক্তারের সংশয় যাচ্ছে না। নীচে বাঁধের জলে গর্জন বাজছে, ওদিকে স্টেশনের আলোগুলো তেমনি তাকিয়ে আছে নিষ্পলক ভৌতিক দৃষ্টিতে। ওপরের মেঘে-ভরা আকাশটা যেন কালো মার্বেল পাথর দিয়ে বাঁধানো। একটা অশুভ এবং বিশ্রী ভীতিকর পরিবেশ। ব্রজেন পালের গায়ের রোমকূপগুলো শিরশির করতে লাগল। ঘামে ভিজে যেতে লাগল জামাটা।
অন্ধকারের ভেতরে একটা সাপের মতো নিঃসাড়ে এগিয়ে এল নীলকণ্ঠের ঠাণ্ডা হাতটা। আর সাপের ছোঁয়া লাগলে যেমন করে মানুষ আঁতকে ওঠে, ঠিক তেমনিভাবেই চমকে উঠল ব্ৰজেন ডাক্তার। কিন্তু এ সাপের ফণায় বিষ নেই, আছে একতাড়া নোট।
নীলকণ্ঠ বললে, এখন এই দেড়শো রাখুন। কাজ হয়ে গেলে বাকিটা পাবেন। আর তা ছাড়া মাসে মাসে… অসমাপ্ত কথাটাকে সমাপ্ত করে দিয়ে একসারি ঝকঝকে দাঁতের ঝিলিক পাওয়া গেল।
হাতের মধ্যে পনেরোখানা নোটের স্পর্শ। কেমন গরম, যেন জীবন্ত। খসখস খচখচ শব্দে দুর্বোধ্য ভাষায় যেন কী-একটা তারা বলবার চেষ্টা করছে। যেন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে অনেক ভবিষ্যতের, অনেক রোমাঞ্চকর সোনালি সম্ভাবনার। দূর সম্পর্কের বিধবা খুড়িমা বিমলা দেব্যাকে রাতারাতি পাগল করতে পারলে পনেরো হাজার টাকার ওয়ারিশ হবে নীলকণ্ঠ। আর সেদিন—সেদিন পরোপকারী ব্ৰজেন ডাক্তারও যে ফাঁকি পড়বে না, এ আশা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি সংগত। আর তা ছাড়া আইনের একটি দড়িতেই যখন দুজনেরই ভাগ্য বাঁধা পড়েছে, তখন আর…
প্রায় নিঃশব্দ গলায় ব্রজেন ডাক্তার বললে, রাজি।
আকাশে তারা নেই, শুধু স্তুপাকার নীরন্ধ্র মেঘ। দূরে স্টেশনের আলোগুলো তেমনি নিষ্পলক ভৌতিক চোখ মেলে তাকিয়ে রইল। আর তেমনি করে বাঁধের খরস্রোতা বর্ষার জলের সঙ্গে ঐকতান মিলিয়ে ব্ৰজেন ডাক্তারের বুকের রক্তও গর্জন করতে লাগল।
কলকাতা থেকে মাইল পনেরো দূরে ব্রজেন ডাক্তারের উন্মাদ নিকেতন।
ক্যাম্বেল থেকে পাস করে কিছুদিন পসার জমাবার চেষ্টা করেছিল শ্রীরামপুরে, কিন্তু পসার জমল না। দেনার জ্বালায় ডিসপেন্সারি বিক্রি হয়ে গেল, মনের দুঃখে গভীর একটা সংসার বৈরাগ্য অবলম্বন করে সে নিরুদ্দেশযাত্রা করলে। কম্পাউণ্ডার হারাধন খবরের কাগজে বার কয়েক বিজ্ঞাপন দিয়েও যখন কোনো হদিশ পেলে না, তখন গোটা কয়েক আয়ুর্বেদীয় মহৌষধের শিশি সাজিয়ে সে ভৈষজ্যশাস্ত্রী হয়ে বসল।
ব্ৰজেন ডাক্তার ফিরল প্রায় এক বছর পরে। হরিদ্বার না লছমন ঝোলায় কোন এক ত্রিকালদর্শী মহাপুরুষের সে সাক্ষাৎ পায়। বহুদিন তাঁর সেবা করায় তিনি তুষ্ট হয়ে যাবতীয় উন্মাদ রোগের দৈবচিকিৎসার পদ্ধতি ব্ৰজেন ডাক্তারকে বাতলে দিয়েছেন। তাঁরই উপদেশে এবং আদেশে শুধু মানবসমাজের কল্যাণের জন্যেই ব্রজেন ডাক্তার লোকালয়ে ফিরে এসেছে। কোনো লাভ না নিয়ে একমাত্র ওষুধ তৈরির খরচার বিনিময়েই নিঃস্বার্থ সেবাব্রতী ব্রজেন ডাক্তার এখানে উন্মাদ নিকেতনের প্রতিষ্ঠা করেছে।
তারপর আস্তে আস্তে পসার জমে উঠেছে। প্রথমে ছিল টালির ঘর, এখন সেখানে তুলেছে তিনখানা ছোটো ছোটো দালান। কোনোখানে রোগী রেখে যারা সুফল পায়নি, তারা এসে ব্ৰজেন ডাক্তারের দ্বারস্থ হয়েছে। চিকিৎসা কতদূর কী হয় তা জানে ব্ৰজেন ডাক্তার আর জানেন সেই ত্রিকালদর্শী মহাপুরুষ। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষের সেটা দ্রষ্টব্য নয়। একটা আশ্বাস দরকার, একটা অপ্রিয় কর্তব্যবুদ্ধিকে পরিতুষ্ট রাখা দরকার। মৃত্যুকে সহ্য করা যায়, সে চিহ্ন রাখে না। দু-দিন পরে আপনা থেকেই যায় বিস্মৃতিতে বিলীন হয়ে, নিছক একটা মনোবিলাসের মধ্যেই তার পরিসমাপ্তি। কিন্তু মৃত্যুর চাইতে যা ভয়ংকর, যা জীবনের একটা মর্মান্তিক বিদ্রূপ, তাকে সহ্য করা অসম্ভব। মানুষ পাগলকে গুলি করে মারতে পারবে না, গলা টিপে শেষ করে দিতে আইনের বাধা আছে, তাই তাকে পাগলাগারদে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হয়।
সুতরাং, নীলকণ্ঠের দোষ নেই। খুড়িমা বিমলা দেব্যা অবশ্য পাগল নন, কিন্তু পাগল হলে কী ক্ষতি ছিল? অন্তত নীলকণ্ঠের সহজ বুদ্ধিতে তার জবাব মেলে না। নিঃসন্তান বিধবা মানুষ, অত বিষয়সম্পত্তি তাঁর কী প্রয়োজনে লাগবে? শুধু যখের মতো আগলে থাকা, শুধু নীলকণ্ঠের লোলুপ ভোগাতুর মনটাকে বিড়ম্বিত করা। একমুঠো আতপ চাল, একখানা সাদা থান আর দশ টাকা করে কাশীবাসের মাসোহারাই যথেষ্ট বিমলা দেব্যার পক্ষে। কিন্তু সেকথা বুঝবেন না বিমলা। তিনি আগলে রাখবেন, আঁকড়ে রাখবেন। যে-টাকা হাতে পেলে নীলকণ্ঠের এই উপবাসী দরিদ্র জীবন পৃথিবীর যা-কিছু উপভোগকে নিঃশেষে আয়ত্ত করতে পারে, সেই টাকা আটকে রাখবেন বিমলা, বন্দি করে রাখবেন—আর সেইসঙ্গে বঞ্চিত করে রাখবেন তৃষ্ণার্ত ক্ষুধাতুর নীলকণ্ঠকে।
যে-কারণে মানুষ পাগলকে খুন করে না, সেই কারণেই নীলকণ্ঠ একটা নিষ্ঠুর নির্মম থাবা বসিয়ে দেয়নি বিমলার গলায়, নিষ্পেষিত করে দেয়নি তাঁর কণ্ঠনালিকে, একটা দা-এর কোপ বসিয়ে দেয়নি তাঁর ঘাড়ে। কিন্তু পাগল হলে ক্ষতি কী? যে-জীবন নিরর্থক, ভাগাড়ের শকুনের মতো যা দিনরাত পাহারা দিয়েই চলেছে, তার পক্ষে পাগল হওয়াই স্বাভাবিক এবং সংগত।
অতএব বিমলার হাঁপানির জন্যে তারকেশ্বরে ধন্না দেওয়াটা অত্যন্ত দরকার। বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করালে নীলকণ্ঠ। বিকাল বেলায় রওনা দিয়ে রাত প্রায় আটটার সময় ওরা দুজনে এসে নামল জংশন স্টেশনটাতে।
