চমকে মাদলের শব্দ থেমে গেল, হাত থেকে নাগাড়া টিকারা খসে পড়ল। শাল ফুলের গন্ধে বাতাসের গতি যেন স্তব্ধ হয়ে রয়েছে।
সাঁওতালেরা হাহাকার করে উঠল। মেয়েদের মুখ থেকে বেরিয়ে এল ভয়াতুর আর্তনাদ। একসঙ্গে কলরব উঠল, কী উপায় হবে আমাদের বাবাঠাকুর?
সুন্দরলালের কণ্ঠে দৈববাণীর সুর আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। ঝড় ওঠবার আগে থমথমে কালো মেঘে আবৃত ঈশান দিগন্তের মতো তার মুখ।
উপায় আছে। নাঙ্গাবাবার শিষ্য এই সাধু সুন্দরলালকে আঁকড়ে ধরা ও তোদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে, ওর সঙ্গে তোরা উত্তরে চলে যা। সেখানে ঘর পাবি, জমি পাবি, এর চেয়ে অনেক সুখে থাকবি।
আপত্তির ক্ষীণ প্রতিবাদ তুলে ঝড় মোড়ল বললে, কিন্তু বাবা, ঘরবাড়ি সব ফেলে…
ঘরবাড়ি, ঘরবাড়ি! বিকৃত কুটিতে সুন্দরলালের রক্তমাখা কুটিল মুখখানা প্রেতের মতো দেখাতে লাগল। ঘরবাড়ি আঁকড়ে থেকে সব মরবি তাহলে। করমবাবা তোদের কাউকে আস্ত রাখবে ভেবেছিস? হাড়-মাংস চিবিয়ে খাবে—মনে রাখিস। কুকুর বেড়ালের মতো মরবি সব।
সুন্দরলালের চোখ দুটো রক্তে ভিজিয়ে আনা। সেই দুটো চোখের ভেতর সাঁওতালেরা যেন ভারী মহামারির প্রতিচ্ছবি দেখতে পেল।
বনবাস ছেড়ে আবার সংসারের দিকে ফিরতেই হল সুন্দরলালকে। উপায় নেই! করম দেবতার কোপ থেকে এই নিরীহ সাঁওতালদের তাকে রক্ষা করতেই হবে। আর বিপন্নকে উদ্ধার না করলে তার কীসের সন্ন্যাস।
সকালের আলোয় সাঁওতাল পরগনার বনশ্রী অপরূপ হয়ে উঠেছে। পাহাড়ে পাহাড়ে বসন্ত যেন আনন্দের উল্লাসে তরঙ্গিত। ছোটো ছোটো গোলাপজামের মতো সাদা মহুয়ার ফুল তিক্ত মধুর রসে পরিপূর্ণ হয়ে টুপ টুপ করে খসে পড়ছে। ডালে ডালে সবুজের ছিট দেওয়া হরিয়ালের নাচ, ঘুঘুর একটানা করুণ ডাক।
গলার সামনে গাঁটরিবাঁধা সুন্দরলালের ভুটিয়া খচ্চরটা টুক টুক শব্দে খুদে খুদে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে। পেছনে মাদল বাজছে। একটা অস্ফুট গানের গুঞ্জন সাঁওতাল পুরুষেরা ঘর ছাড়ার দুঃখ ভোলবার জন্যেই কেউ হয়তো বাঁশিতে সুর দিয়েছে। মেয়েদের মুখে কোনো ক্ষোভের ইঙ্গিত নেই। পথ চলবার আনন্দে তারা লীলায়িত, মাদলের ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে তাদের কালো চুলে সাদা ফুলের মঞ্জরিগুলি দুলে উঠছে। বুধনির চোখে স্বপ্ন। শহর, চুড়ি, তেল আর শাড়ি। দেবতার হুকুম পেয়েছে সে।
আসামের চা-বাগানে কুলি-জোগানো কী-যে অসম্ভব ব্যাপার, সেটা সাহেব জানে। কালাজ্বরে দলে দলে লোক মরছে, আশপাশ থেকে একটি কুলি আনবারও জো নেই। বুধনিকে বাদ দিয়ে—আড়কাঠি সুন্দরলাল হিসেব করতে লাগল, বুধনিকে বাদ দিলে বেয়াল্লিশ জন কুলিতে তার কমিশন পাওনা হয় কত?
সাঁওতাল পরগনার বিমুক্ত প্রকৃতিকে পরিপ্লাবিত করে দিয়েছে বসন্তের অকৃপণ আনন্দধারা। সকালের হাওয়া লেগে পাহাড়ি পথের ওপর কৃষ্ণচূড়ার একরাশ রাঙা পাঁপড়ি ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল।
বৃত্ত
প্রথমটায় ব্রজেন পাল রাজি হয়নি। কিন্তু নীলকণ্ঠ টাকার অঙ্কটা যত বেশি বাড়াতে লাগল, অন্ধকারে তত বেশি করে হিংস্র জানোয়ারের মতো জ্বলে উঠতে লাগল ব্ৰজেন পালের চোখ। তারপরে একসময়ে দেখা গেল তিনটে আগুন একসঙ্গে জ্বলছে। দুটো চোখ আর একটা বিড়ির রক্তদীপ্তি।
রাতটা যেমন অন্ধকার তেমনি থমথমে। সামনে তিনটে টানা রেললাইন পড়ে আছে। অন্ধকারে তাদের দেখা যাচ্ছে না, শুধু ঘষা ইস্পাত ঝিকিয়ে উঠছে। আর রেলের যে-বাঁধটার ওপরে ওরা বসে আছে, তার তলা দিয়ে খরস্রোতে চলেছে বর্ষার জল। পাথরে পাথরে ঘা খেয়ে তা থেকে তীব্র একটা গর্জন উঠছে—আর সেই গর্জনের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছে ব্ৰজেন পাল, শুনতে পাচ্ছে নিজের রক্তের মধ্যে। তা ছাড়া সমস্ত নীরব, সমস্ত নিঃসাড়। শুধু দূরের জংশন স্টেশনটা একরাশ লাল-সবুজ আলোর মালা দুলিয়ে জাগছে রাত্রির অতন্দ্র প্রহর।
হাতের বিড়িটা নীচের খরধারার ভেতরে ফেলে দিয়ে ব্রজেন পাল এক বার ঠোঁট দুটোকে চেটে নিলে। টাকার অঙ্কটা মগজের মধ্যে যেমন মদের নেশার মতো ঝিমঝিম করছে, তেমনি শুকিয়ে উঠেছে বুকের ভেতরটা। স্টেশনের একটা লাল সিগন্যালের দিকে চোখ রেখে ব্রজেন পাল বললে, কিন্তু দায়িত্বটা বুঝতে পারছেন তো? যদি ফাঁস হয়ে যায় তাহলে যথাসর্বস্ব তত যাবেই, বছর পাঁচেক শ্রীঘরবাসও করতে হবে নির্ঘাত।
আরে না না। এবারে বিড়ির বদলে পকেট থেকে সিগারেটের বাক্স বের করলে নীলকণ্ঠ। পরম সমাদরে তারই একটা ব্রজেন পালের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললে, দু-দিন ওখানে বন্ধ থাকলেই আর দেখতে হবে না। আপনার বন্দোবস্ত ঠিক আছে তো? তাহলেই হল।
ঘচ করে দেশলাই জ্বাললে নীলকণ্ঠ। তার আলোতে ব্রজেন পালের লোভাতুর ভীত মুখখানা মুহূর্তের জন্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। নীলকণ্ঠের মনে হল সে-মুখ যেমন বীভৎস, তেমনি ভয়ানক।
আমার বন্দোবস্ত? কর্কশভাবে ব্রজেন পাল হেসে উঠল, যেসব নমুনা আমার আছে, তাদের পাল্লায় পড়ে মাঝে মাঝে আমারই মাথা বেঠিক হওয়ার জো হয়। আর এ তো মেয়েমানুষ। ওদেরই ক-টার সঙ্গে এক রাত একটা ঘরে পুরে রাখলেই আর দেখতে হবে না।
যাক, তাহলে ভাবনা নেই। নীলকণ্ঠের গলা প্রশান্ত আর নিরুদবিগ্ন শোনাল। আপনি কিছু ভয় পাবেন না ডাক্তারবাবু। অত বড়ো একটা সম্পত্তির ওয়ারিশন যদি হয়ে যেতে পারি তাহলে আপনাকেও যে ঠকাব না এ একেবারে পাকা কথা বলে দিচ্ছি।
