সুন্দরলালের চোখে-মুখে অতি প্রকট তীক্ষ্ণতা।
কী রে বুধনি?
কিন্তু বুধনিকে কিছু আর বলতে হল না। বাঁধ ভেঙে উচ্ছ্বসিত কলতরঙ্গে যেন বেরিয়ে এল জোয়ারের জল। হাসির দোলায় মেয়েদের পরিপূর্ণ অপরূপ তনুসৌষ্ঠব ছন্দময় হয়ে উঠল। সুন্দরলালের মনে হল–কামনায় যেন শানিত খানিকটা কালো আগুন দেহপ্রদীপগুলিতে উঠল শিখায়িত হয়ে।
এত হাসছিস যে? সুন্দরলালের চোখ দুটো নির্লজ্জভাবেই ঘুরতে লাগল বুধনির সর্বাঙ্গকে বিশ্লেষণ করে। এ দৃষ্টি হয়তো শরীরের কেবল বাইরেটাকেই দেখছে না, হয়তো তীক্ষ্ণএকটা
সন্ধানী আলো ফেলে বুধনির মনটাকেও দেখে ফিরছে। এ যোগীর দৃষ্টিভোগীর নয়।
বুধনির সাহসের যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, সুন্দরলালের দ্বিতীয় প্রশ্নে তাও যেন মিলিয়ে গেল নিঃশেষ হয়ে। মেয়েদের হাসি দ্বিগুণ হয়ে উঠল। পরক্ষণেই রূপের প্রখর বিদ্যুৎ ছড়িয়ে দিয়ে তারা পথের ওপর দিয়ে এক ঝলক দখিনা বাতাসের মতো বয়ে গেল। সুন্দরলাল হাঁ করে তাদের দিকে তাকিয়েই রইল।
দু-মাস মাত্র সময়, কিন্তু দুটি দিন মাত্র বেশি দেরি হয়ে গেলে সত্যিই কী আর ক্ষতি হবে। বাগানে অনেক মেয়ে আছে, কিন্তু বুধনির জুড়ি নেই। সুন্দরলালের দুটো চোখে যেন গোখরো সাপ উঁকি মারতে লাগল। সাহেব ভালোমানুষের কদর বোঝে, দু-দিন বিলম্ব তার কাছে। কিছুই নয়।
আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে সুন্দরলাল যে অনেকটা এগিয়ে গেছে, তাতে আর সন্দেহ কী?
সন্ন্যাসী মানুষ, ঘর ছেড়ে সেই কবে বেরিয়ে পড়েছে। বিষয়বাসনার কোনো প্রলোভনই নেই, সংসারে পরের উপকার ছাড়া আর কিছুই সে জানে না। ঝড় সাঁওতাল একথা বিশ্বাস করে, বুধনির সন্দেহমাত্র নেই, সুন্দরলালের মুখের দিকে তাকাতেও গা কেঁপে ওঠে তিলকের।
কিন্তু পশুপতিনাথের মন্দিরে পাওয়া সেই সিদ্ধমন্ত্র—তার বলে কী-না সম্ভব হয়। সুন্দরলাল টাকা তৈরি করতে পারে নিশ্চয়। কারও দরকার পড়লে অযাচিতভাবেই সে কাঁচা করকরে টাকা বের করে দেয়; নতুন টাকা, ঝকঝকে টাকা। হয়তো অনেকটা এই কারণেই সাঁওতালেরা এত বেশি করে তার কাছে মাথা বিকিয়ে বসে আছে। ইচ্ছে করলে সে নাকি নুড়ি পাথরগুলোকে অবধি তাল তাল সোনা বানিয়ে দিতে পারে। জিজ্ঞেস করলে কোনো জবাব দেয় না, রহস্যময়ভাবে হাসে।
আরও কয়েক দিন পরে।
বিলি সাঁওতালনির কী-একটা মানসিক। শালবনের মাঝখানে সিঁদুর-মাখানো ওই যে বড়ো কালো পাথরটা, ওখানে শিং বোঙার পুজো। উপচার মুরগি আর মহুয়ার মদ।
খচ্চরে চড়ে সুন্দরলাল এসে উপস্থিত হল।
তখন বলি শেষ হয়ে গেছে। পাথরটার চারপাশে ছিন্নকন্ঠ মুরগির রক্ত। শাল ফুলের গন্ধে বাতাসটা কেমন ভারী, যেন নিশ্বাস ফেলতেও কষ্ট হয়।
মাদল বাজছে, তার সঙ্গে চলেছে নাচ। কিন্তু জ্যোৎস্নারাতের মহুয়ামদির অসংযত নাচের দোলা এ নয়। সে-নাচে রক্তে রক্তে একটা তরল নেশা ঘনিয়ে আসে, আর এ নাচে যেন মনের ওপর অস্বস্তির আমেজ দেয়। পাহাড়ের কোলজুড়ে বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে নিবিড় নিবন্ধ শালের বন। বড়ো বড়ো পাতা স্তরে স্তরে সূর্যকে আড়াল করে সৃষ্টি করেছে প্রায়ান্ধকার একটা নিভৃতলোক। সেই নিভৃতলোকের মাঝখানে অশরীরী শিং বোঙা যেকোনো মুহূর্তেই হয়তো-বা দলবল নিয়ে সশরীরী হয়ে উঠতে পারে।
সুন্দরলাল আসতেই মদের পাত্র এগিয়ে এল। মহুয়ার সুরায় আকণ্ঠ পরিপূর্ণ করে নিলে সুন্দরলাল। শিং বোঙার কালো পাথরটার গায়ে রক্ত আর সিঁদুর লেপা। হঠাৎ দেখলে মনে হয় পাথরটা যেন কার একখানা প্রসারিত মুখ। সত্যি সত্যিই যেন রক্ত খেয়েছে; যেন আরও রক্ত খাওয়ার জন্যে তাকিয়ে আছে তৃষ্ণার্ত চোখে।
সুন্দরলাল হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠল। এক বার স্থির রক্তচোখ মেলে তাকাল সকলের দিকে। তারপর টলতে টলতে এগিয়ে গিয়ে সোজা পাথরটার সম্মুখে আছড়ে পড়ল। পায়ে লোহার নালতোলা কাঁচা চামড়ার জুতা আর কুর্তার পকেটের টাকাগুলোয় মিলে উঠল একটা চকিত যুগ্মধ্বনি।
কয়েক মুহূর্ত পরেই আবার উঠে দাঁড়াল সে। জামায় খানিকটা ধুলোর দাগ। একটু আগেই পান খেয়েছিল, মুখের দু-পাশে খানিকটা লাল লঙের গ্যাঁজলা বেরিয়ে রয়েছে বীভৎসভাবে। সকলের ওপর দিয়ে এক বার তীক্ষ্ণদৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে হঠাৎ সে তান্ডব তালে নাচতে শুরু করে দিলে।
সোৎসাহে মাদল বেজে উঠল, ডুম ডুম করে উল্লাস জানাল নাগাড়া টিকারা। সুন্দরলালের ওপর ভর হয়েছে—শিং বোঙার ভর। সাঁওতালদের চেতনার ওপর চাড়িয়ে পড়ল ভয় আর আনন্দের একটা বিচিত্র অনুভূতি।
হেলেদুলে সুন্দরলাল নাচতে লাগল। মুরগির খানিকটা রক্ত সে হাতে-মুখে মেখে নিয়েছে, এই মুহূর্তে তাকে পৈশাচিক বলে মনে হতে পারে। পায়ের কাঁচা চামড়ার জুতাটা দূরে ছিটকে পড়েছে, পকেটের টাকাগুলো সমান তালে বাজছে ঝনঝন করে।
আকস্মিকভাবে সুন্দরলাল থেমে দাঁড়াল।
অপ্রকৃতিস্থ চোখ দুটো যেন রক্তে ভিজিয়ে আনা। আর কণ্ঠে সেই দৈববাণীর সুর।
ঝড় সাঁওতাল, শুনছিস? আমি শিং বোঙা, তোদের ডাকছি—শুনছিস?
আরও জোরে জোরে টিকারা বাজতে লাগল, আকাশ চিরে উঠল মাদলের শব্দ। সাঁওতালেরা সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করলে। ঝড় সাঁওতাল কাঁপা গলায় বললে, কী হুকুম বাবা?
আমার কথা শোন। তোদের গাঁয়ে মড়ক লাগবে—হয়জার মড়ক! একটি প্রাণীও বাঁচবে, মরে সব শেষ হয়ে যাবে। করম দেবতার রাগ পড়েছে তোদের ওপর, তোদের কাউকে রাখবে না কাউকেই নয়।
