তিলক সাঁওতাল অপ্রতিভ হয়ে বললে, তাই বলছিলুম…
তাই বলছিলি? তাই আবার কী বলবি? সেবার আসামের চা-বাগানের এক সায়েবকে মেরে দিলুম না? তিনটা দিনও পেরোল না, মুখে রক্ত উঠে একেবারে… হুঁহুঁ…
কাবার হয়ে গেল?
বিলকুল। খালি বাণ? ইচ্ছে হলে পিশাচ চালান করতে পারি। তিলক রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। বাণ মারা! কী ভয়ানক! তুমি জানও না মাটিতে রেখা দিয়ে তোমার মূর্তি আঁকা হয়ে গেল, আর সেই মূর্তির বুকে মেরে দেওয়া হল মন্ত্রপূত তির। নিশ্চিন্ত মনে সারাদিন খেতে কাজ করে সন্ধে বেলায় তুমি বাড়ি ফিরেছ, হঠাৎ অসহ্য ব্যথা উঠল তোমার বুকে। তারপর কাশির সঙ্গে সঙ্গে তোমার ফুসফুস দুটো ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল, সাতটা দিনের ভেতরেই তুমি পুরোপুরি নিকাশ হয়ে গেলে। আর পিশাচ! যে পিশাচসিদ্ধ তার অসাধ্য কী আছে? এই সাঁওতাল পরগনার পাহাড়ে পাহাড়ে কত অশরীরী প্রেতাত্মা ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায় কে বলতে পারে? সন্ধ্যার কালো আবরণের তলায় যখন শালের বনগুলো ভয়ংকর হয়ে ওঠে, তখন তাদের বড়ো বড়ো খসখসে পাতার মর্মরে সেই প্রেতাত্মারা নিশ্বাস ফেলে যায়। সে-নিশ্বাস যার গায়ে লাগে, গোড়াকাটা লতার মতো শুকোতে শুকোতে একদিন শেষ আয়ুর বিন্দুটি অবধি তার মিলিয়ে যায় বাষ্প হয়ে। যেদিন রাত্রে পাহাড়ের মাথায় মাথায় ঝড় ওঠে, মহুয়া গাছগুলো উপড়ে পড়ে, রাতচরা হরিণগুলো অবধি প্রাণের ভয়ে গমের খেতে নেমে আসে না, সে-রাত্রিতে তারা উৎসব করে। সে-সময় যদি কেউ এক বার ভুল করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, তাহলে পরের দিন তার হাড়-মাংসের একটি টুকরোও কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এই সমস্ত প্রেতাত্মা, এই সমস্ত ভয়ংকর পিশাচেরা সব সুন্দরলালের হাতধরা।
কাকে মারতে হবে?
তিলক চমকে উঠল। সুন্দরলাল হাসছে। হাসিটা মনোরম নয়। কী-একটা অজ্ঞাত কারণে সমস্ত মনটাকে সংকুচিত, সন্ত্রস্ত করে আনে।
ব্যস্ত কণ্ঠে তিলক বললে, ও-গাঁয়ের ডোমন মাঝিকে। কিছুদিন থেকেই আমার পিছে লেগেছে। বললে বিশ্বাস করবে না বাবাঠাকুর, ওর তুকমন্তরের চোটেই গত মাসে আমার ছেলেটা মরে গেল। তাগড়া জোয়ান ছেলেটা। দেখতে দেখতে ছটফটিয়ে মরে গেল।
তিলকের চোখের কোণ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।
হুঁ! গম্ভীর হয়ে গেল সুন্দরলাল। তোর কাজটা করে দেব আমি, পিশাচ চালান দিয়ে দেব। পরশু শনিবার কয়েকটা ফুল আর সিঁদুর নিয়ে আসবি, আমি তিনটে নরমুন্ড জোগাড় করে রাখব। তাই দিয়ে পিশাচ পুজো করতে হবে। তাহলে কী হবে জানিস?
তিলক ঘাড় নাড়ল।
তাহলে রোজ রাত্তিরে সে যখন ঘুমিয়ে থাকবে, প্রকান্ড একটা কালো পিশাচ এসে চেপে বসবে তার গায়ের ওপর। তারপর সেই পিশাচটা তার মুখখানাকে নলের মতো ছুঁচোলো করে দিয়ে তার মাথার ভেতর থেকে চোঁ চোঁ করে রক্ত আর ঘিলু শুষে খাবে। তারপর…।
কথাটা অসমাপ্ত রেখে সুন্দরলাল হেসে উঠল। তার বলার ভঙ্গিতে এই সকালের আলোতেও তিলকের মাথার চুলগুলো খাড়া হয়ে উঠেছে আতঙ্কে। দৃশ্যটা সে মনের সামনে কল্পনা করতে লাগল।
যা মাঝি, পরশু আসিস। ফুল আর সিঁদুর যেন মনে থাকে। আর একটা কথা, এর পরে কিন্তু ক-দিন তোকে গাঁয়ের বাইরে আর-কোথাও গিয়ে থাকতে হবে। ডোমনের রক্ত খাওয়া শেষ হয়ে গেলে পিশাচটা আশেপাশে খুঁজে বেড়াবে তোকে। পেলে কিন্তু আর রক্ষা রাখবে না।
আর এক বার তিলকের আপাদমস্তক নিদারুণ বিভীষিকায় চমকে উঠল।
তিলক চলে যাওয়ার পর সুন্দরলাল অনেকক্ষণ বসে রইল নীরবে। সামনে রামচরিত মানস-এর ভোলা পাতাগুলো ফরফর করে উড়ে যাচ্ছে। উড়ন্ত একরাশ কালো কালো পলাতক হরফের মাঝখানে গন্ধমাদনধারী হনুমানের একখানা বীরমূর্তি। পলকের জন্যে উঁকি মেরে গেল রূঢ় খানিকটা রঙের প্রলেপ। দূর মাঠের ওপর চরছে একদল মহিষ, দুটির গলায় বাঁশের বড়ো বড়ো চোঙা বাঁধা। আর সব কিছুর ওপর দিয়েই সকালের রোদ প্রসন্ন একটা দীপ্তিমন্ডলের মতো উদ্ভাসিত।
তত্ত্বচিন্তায় বিভোর হয়ে উঠেছে সুন্দরলালের মন। এমন করে আর চলে না। দু-মাস, মাত্র দু-মাস সময়, অথচ এমন একটু একটু করে এগোতে গেলে গোটা বছরই যে কাবার হয়ে যাবে। ওদিকে সিজন টাইম পেরিয়ে গেলে এসবের কোনোটারই কোনো অর্থ হয় না।
চেনা হাসির আকস্মিক একটা বন্যা শুধু কান নয়—সমস্ত মনের ওপরেই যেন ভেঙে আছড়ে পড়ল। নদীর ঢেউয়ের মতো উচ্ছলিত চটুলতায় রাঙা কাঁকরের পথ বেয়ে একদল মেয়ে এগিয়ে আসছে। দিকে দিকে বসন্তের বিহ্বল মদিরতা, আর তার মাঝখানে এরা যেন পরিপূর্ণ পানপাত্র। হাতের ছোটো ছোটো ঝাঁপিগুলি ভরে মহুয়া কুড়িয়ে নিয়েছে, আর খোঁপায় জড়িয়েছে পত্রপল্লবে সমৃদ্ধ একগুচ্ছ নাগকেশরের ফুল।
সুন্দরলালকে দেখেই থমকে দাঁড়াল মেয়েরা। নিজেদের ভেতরে কিছুক্ষণ কী সতর্ক আলোচনা চলল তাদের। সুন্দরলালকে তারা ভয় করে, কিন্তু তার চারদিক দিয়ে অতীন্দ্রিয় রহস্যের যে ঘন একটা কুয়াশা-ঘেরা, তাদের কৌতূহলী মন মাঝে মাঝে সেই কুয়াশার ভেতরে প্রচ্ছন্ন জগৎটাকে আবিষ্কার করতে চায়।
বুধনি ইতস্তত করছে, কিছু যেন একটা বলবার আছে তার। অত্যন্ত বিপন্ন মুখে আঙুল দিয়ে গলার রুপোর হাঁসুলিটা খুঁটতে লাগল সে। একটি মেয়ে আলগাভাবে তাকে ধাক্কা দিলে, যেন তাদের সকলের কাছেই বুধনি কী-একটা কৌতুক এবং কৌতূহলের বস্তু হয়ে উঠেছে।
