সুন্দরলাল আপত্তি করলে না। সন্ন্যাসের শেষ স্তরে উঠে সে নির্বেদ লাভ করেছে বলা চলে। মাটির পাত্রে করে উগ্রগন্ধী মহুয়ার মদে গলা ভিজিয়ে নিলে সুন্দরাল।
জ্যোৎস্নায় জোয়ার এসেছে ততক্ষণে। বাতাসে শাল ফুলের গন্ধ। এদেশের লোক ও গন্ধটাকে স্বাস্থ্যের অনুকূল মনে করে না, কিন্তু ওর সঙ্গে মহুয়ার তিক্ত মদিরতা মিশে গিয়ে আফিমের মতো একটা বিষাক্ত নেশায় যেন আচ্ছন্ন করছে চৈতন্যকে। কী কার্যকারণযোগে
ওপাশের একটি তরুণী মেয়ের আন্দোলিত দেহবল্লরির ওপর গিয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়ল সুন্দরলালের দৃষ্টি। যেন মূৰ্ছিত হয়ে গেল বললেই ঠিক বলা হয়।
সর্বাঙ্গে স্বাস্থ্যপুষ্ট সম্পূর্ণতা। এমন মেয়ে এই অবাধ স্বাস্থ্যসৌন্দর্যের দেশেও বিরল। সুন্দরলালের চোখ জ্বলতে লাগল।
ওই মেয়েটা কে রে মোড়ল?
প্রশ্ন শুনে ঝড় সাঁওতাল কৃতার্থ হয়ে গেল যেন।
ওই ওর কথা বলছ? ও তো আমারি মেয়ে–বুধনি।
চাপকানের পকেটে হাত দিয়ে সুন্দরলাল টাকাপয়সাগুলোকে নাড়াচাড়া করতে লাগল। সে বৈরাগী, সে-হিসেবে ধাতব বস্তুর ওপরে তার যতটা অনাসক্তি থাকা উচিত তা নেই। সুন্দরলালের ভারি ভালো লাগে টাকা-বাজানোর শব্দটা। ঠিক যেন গানের মতো কানে বাজে।
বুধনি? বা, বেশ নাম তো! ডাক তো ওকে!
বুধনি এগিয়ে এল। কতকটা বিস্ময়, কিছুটা কৌতুক। ভয়ও একেবারে না-আছে তা নয়। সুন্দরলাল হাত দেখতে পারে, ভূত ছাড়াতে পারে, আরও কত কী জানে ঠিক নেই। তার সামনে এসে দাঁড়াতে বুক যে খানিকটা দুরদুর করবেই—এই তো স্বাভাবিক।
কয়েক মুহূর্ত বুধনির মুখের দিকে স্তব্ধ হয়ে রইল সুন্দরলালের দৃষ্টি। গায়ের কাপড়টা ভালো করে টেনে দিয়ে সংযত হওয়ার চেষ্টা করলে বুধনি।
জামার পকেট থেকে দুটো টাকা বের করে আনল সুন্দরলাল, এই নে, তোদের খেতে দিলুম। আর–আর…
মুহূর্তে কোথা থেকে কী হয়ে গেল। হয়তো মহুয়ার প্রভাবেই বিচিত্র রকমে গাঢ় ও গভীর হয়ে উঠেছে তার কণ্ঠস্বর, তুই কেন এখানে পড়ে আছিস বুধনি। তোর যে ভারি জোর বরাত। নাঙ্গাবাবার কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে শহরে গিয়ে যে তোর কপাল ফিরে যাবে এ তো আমি চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি।
সুন্দরলাল যেন দৈববাণী করছে। এ যেন সে নয়, যেন তার সত্তার ভেতর থেকে আর একজন কে আবির্ভূত হয়ে এল। সাঁওতালেরা জানে, মাঝে মাঝে তার ওপর ঠাকুরদেবতার ভর হয়।
চলে যা, চলে যা তুই। দেবতার নাম করে বলছি, তুই চলে যা। শাড়ি, চুড়ি, তেল—যা চাস সব পাবি।
ভয়ে বিস্ময়ে সর্দারের চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বিস্ফারিত হয়ে বেরিয়ে আসবার উপক্রম করছে। দেবতার নামে যা বলবে অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাবে সব। দেবতার একটি কুদৃষ্টিতে ঝাঁকে ঝাঁকে জ্যান্ত মানুষ মরে নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে, গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে ছারখার হয়ে যেতে পারে। ভীত চঞ্চল সাঁওতালেরা চারপাশে এসে ভিড় করে দাঁড়াল, এই সুযোগে নিজেদের ভাগ্যটাকে এক বার যাচাই করে নিলে হয়।
শহর! শাড়ি-চুড়ি-তেল! একটা অদ্ভুত স্বপ্নলোক। বুধনির চিন্তা আকস্মিকভাবে যেন খেই হারিয়ে ফেলছে।
সুন্দরলালের ওপর যেন এখন পুরোপুরি ঠাকুরের আবির্ভাব। বুড়োজ্যাঠা টুডুকে সে বাতলে দিচ্ছে হাঁপানির ওষুধ। দিগদিগন্ত উদ্ভাসিত করে নির্মল চাঁদের আলো অসীম প্রীতি আর বিশ্বাসের মতো ঝরে পড়ছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে যেন রজনিগন্ধার অসংখ্য ছিন্ন পাঁপড়ি। মহুয়ার গন্ধে শাল ফুলের বিষাক্ত নিশ্বাস চাপা পড়ে গেল। শুধু অকারণে চঞ্চল হয়ে উঠেছে ভুটানি খচ্চরটা। কী-একটা অস্বস্তি অনুভব করে খট খট শব্দে সে মাটির ওপর পা ঠুকতে লাগল।
খুব ভোরে ওঠা সুন্দরলালের অভ্যাস।
সূর্য সামনের পাহাড়টাকে ভালো করে রাঙিয়ে তোলার আগেই সে ঘরের বাইরে দড়ির খাঁটিয়ায় এসে বসে। তারপর হয়তো সুর করে তুলসীদাস পড়া শুরু হয় তার :
ঘটহ বঢ়হ বিরহিণী দুখ দাই
গ্রসহ রাহু নিজ সন্ধিহি পাই,
কোক শোকপ্রদ পঙ্কজদ্রোহী,
অবগুণ বহুত চন্দ্রমা তোহি—
কিন্তু সীতার বিরহ নিয়ে বেশিক্ষণ সময় কাটাবার জো নেই। সাঁওতালেরা তাকে গুরু বলে মানতে শুরু করেছে আজকাল, সব কিছু কাজেই তার পরামর্শ ছাড়া এখন আর চলে না।
পাহাড় থেকে হরিণের পাল নেমে গম খেয়ে যাচ্ছে, তার কী প্রতিকার? বড়কা সাঁওতাল কী এক সাঁওতাল মেয়ের কপালে সিঁদুর লেপে দিয়েছে, অথচ সমাজের আইনে তাদের বিয়ে হতে পারে না, এর কী ব্যবস্থা করা যেতে পারে? অমুকের পায়ের ঘা আজ তিন মাস ধরে সারছে না, কেউ কি তার কোনো অনিষ্ট করল?
এমন অনেক প্রশ্নের মীমাংসাই করতে হয় সুন্দরলালকে। কিন্তু নাঙ্গাবাবার আশীর্বাদের জোর আছে তার ওপরে। পশুপতিনাথের মন্দির থেকে লাভ করা সিদ্ধি—সহজ কথা নয়। তিরিশ বছর বয়স পেরোনোর আগেই প্রাক্তন পুণ্যের বলে ইহলোক-পরলোকের সড়ক পাকা করে নিয়েছে সে।
আজও সকালে তিলক সাঁওতাল এসে দেখা দিলে।
তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে বাবাঠাকুর।
প্রকান্ড একটা ভাঙের গুলি মুখে পুরে দিয়ে সুন্দরলালের মনটা প্রসন্ন হয়ে উঠল। রামচরিত মানস একপাশে ঠেলে সরিয়ে রেখে প্রশ্ন করলে, কী কথা?
তিলক সাঁওতাল গলার আওয়াজ নীচু করে আনল, তুমি বাণ মারতে জান?
বাণ? একটা বিচিত্র হাসিতে সুন্দরলালের চোখ-মুখ সমুজ্জ্বল হয়ে উঠল। আমি বাণ মারতে জানিনে? আমি জানিনে তো কে জানে শুনি?
