কোথা থেকে এলে বাবাঠাকুর?
প্রশ্ন শুনে সুন্দরলাল তাকাল। সামনে ঝড় সাঁওতাল। গ্রামের লোকে মোড়ল বলেই মান্য করে তাকে। পরনে বস্ত্রের বেশি বাহুল্য নেই, শুধু ছোটো একটি ফালি নেংটির মতো করে পরা। মাথার ঝাঁকড়া চুলগুলোকে ঘিরে আর এক টুকরো কাপড়, তার একপাশে গোটা তিনেক পালক গোঁজা। হাতে বাঁশের ছিলা-দেওয়া কুচকুচে প্রকান্ড একটা ধনুক, আর সেইসঙ্গে গোটা কয়েক বাঁটল।
কে, মোড়ল? কী শিকার পেলি রে?
কিছু নয় বাবাঠাকুর। মহুয়াবনে গিয়েছিলুম হরিয়াল মারতে, কিন্তু বরাত খারাপ। তুমি কোথা থেকে এলে?
আমি? প্রশান্ত হাসিতে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠল সুন্দরলালের মুখ। এ হাসিটাকে আধ্যাত্মিক মনে করলে দোষ হয় না। সাধনার পথে সে যে কতখানি এগিয়ে গেছে, এ হাসি দেখে তার কিছুটা অনুমান করা চলে।
আমি? আমি গিয়েছিলুম ওপারের ওই গাঁয়ে। ওখানে একজনকে ভূতে ধরেছিল কিনা, এসে বড় কান্নাকাটি করছিল। তাই এক বারটি ঝেড়ে দিয়ে আসতে হল।
প্রগাঢ় শ্রদ্ধায় ঝড় এক বার সর্বাঙ্গ নিরীক্ষণ করলে সুন্দরলালের। সত্যি কথা—সন্ন্যাসের কোনো লক্ষণ নেই সুন্দরলালের শরীরে। চুলটি দিব্যি করে আঁচড়ানো, চাপকানের পকেট থেকে পিতলের ডিবে বের করে তা থেকে মস্ত একটা খিলিপান মুখে পুরে দিল। জর্দার চমৎকার গন্ধটা দস্তুরমতো লোভনীয়। চলার সঙ্গে সঙ্গে পকেটের টাকাগুলো ঝনঝন করে বেজে উঠছে।
তবু সুন্দরলাল যে সাধু মোহান্ত, তাতে সন্দেহ করবার হেতু কী!
মুগ্ধবিস্ময়ে ঝড় বললে, ভূত ছাড়ল?
ছাড়বে না? চালাকি নাকি? এ কি যে-সে মন্ত্র! হিমালয়ের চুড়োয় পাঁচশো বছর ধরে ধ্যান করছেন নাঙ্গাবাবা। ইয়া লম্বা লম্বা সাদা দাড়ি, লুটিয়ে পড়েছে একেবারে পা পর্যন্ত। আর সে কী চেহারা, দাঁড়ালে তাল গাছের মাথায় গিয়ে ঠেকে। সে-বার আমি নেপালে পশুপতিনাথের মন্দিরে ধ্যান করছি বসে; মাঝরাত্রির, ঘুটঘুট করছে অন্ধকার, হঠাৎ যেন পূর্ণিমার চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। তাকিয়ে দেখি ওই মূর্তি! পেছনে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে।
সূর্য অস্ত গেছে। পায়ের তলায় মড়মড় করছে শুকনো শালের পাতা। ঝড় মোড়লের সারা গা ভয়ে ছমছম করে উঠল।
তারপরে?
তারপরে আর কী! সুন্দরলালের কণ্ঠে গর্বের আভাস লাগল, নাঙ্গাবাবা বললেন, যা ব্যাটা, তোর হয়ে গেছে। আজ থেকে সিদ্ধিলাভ করলি তুই। ভূত-পিরেত-পিশাচ-দানো তোর ছায়া দেখলেও ছুটে পালাতে পথ পাবে না।
দু-পাশের বনজঙ্গলগুলি সন্ধ্যার সঙ্গে আরও ঘন করে ছায়া ছড়িয়ে দিয়েছে। সুন্দরলালের মুখ দেখা যায় না, তবু ঝড় এক বার সে-মুখখানাকে দেখবার চেষ্টা করলে। এমন একটা লোকের পাশে পাশে হেঁটে চলেছে, ভাবতেও সে রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল।
বনের পথটা পেরোতেই সামনে গ্রাম দেখা দিল। আকাশের এককোণে শুক্লা ত্রয়োদশীর চাঁদ এতক্ষণ কোথায় আত্মগোপন করেছিল কে জানে! জঙ্গলের আড়ালটা কেটে যেতেই কাঁকর-বিছানো পথটার ওপর তার আলো ঝিলমিল করে উঠল। সাঁওতাল পাড়ার মাদলের শব্দ। মহুয়ার গন্ধের সঙ্গে ওই শব্দটার চমৎকার একটা ছন্দগত ঐক্য আছে বোধ হয়।
ঝড় সবিনয়ে বললে, এক বার নাচ দেখতে যাবে না বাবাঠাকুর?
নাচ? আচ্ছা চল।
দু-দিকে মাটির দেওয়ালগাঁথা ছোটো ছোটো নীচু বাড়ি। মাঝখানে একটুখানি ফাঁকা জায়গায় বসেছে নাচের আসর। কষ্টিপাথরের মতো কালো চেহারার দুজন পুরুষ দুলে দুলে মাদলে ঘা দিচ্ছে, আর সেই মাদলের তালে তালে ঝুঁকে ঝুঁকে কয়েকটি মেয়ে নৃত্য করছে। পরস্পরের বাহুতে তারা আবদ্ধ, মুখে অস্ফুট গানের উচ্ছ্বাস। সে-গানের ভাষা বোঝবার জো নেই, কিন্তু তার ধ্বনিটা একটা বিচিত্র গুঞ্জনের মতো বাজছে।
সুন্দরলালকে আসতে দেখে মাদল আর নাচ দুই-ই থেমে গেল। মেয়েদের কালো চোখে দেখা দিল কৌতুকের উজ্জ্বল আভা, পুরুষদের কণ্ঠে উঠল ভক্তিমুগ্ধ কলরব। কেউ কেউ উঠে এসে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করলে, কেউবা আবার কোথা থেকে কাঠের একটা চৌপাই টেনে নিয়ে এল।
যথোচিত মর্যাদা আর গাম্ভীর্য নিয়ে চৌপাইটাতে আসীন হল সুন্দরলাল। পুরুষেরা ঘিরে বসল তার চারপাশে। নাকের রুপোর আংটির ভেতরে আঙুল দিয়ে মেয়েরা তাকিয়ে রইল নির্বোধ দৃষ্টিতে।
সুন্দরলাল গম্ভীর হয়ে বললে, নাচ থামালি কেন? চলুক-না।
ঝড় মোড়লের কণ্ঠস্বর ব্যর্থ হয়ে উঠল, হাঁ হাঁ, নাচ চলুক। ভালো করে নাচ দেখিয়ে দে বাবাঠাকুরকে।
আবার মাদলে ঘা পড়ল। শালবনের ওপর দিয়ে চাঁদ তখন অনেকখানি উঠে এসেছে।
মেয়েদের উজ্জ্বল চোখগুলিতে, সুঠাম সম্পূর্ণ দেহশ্রীর ওপর দিয়ে জ্যোৎস্না গড়িয়ে পড়তে লাগল তরল লাবণ্যের মতো। সংসার-বিরক্ত সুন্দরলাল নিজের অজ্ঞাতেই খানিকটা সংসক্ত হয়ে উঠল হয়তো। হয়তো-বা রক্তের এই চাঞ্চল্যটা পুরোপুরি দার্শনিক ভাবেই অনুপ্রাণিত নয়।
দশ-বারোটি মেয়ে একসঙ্গে নাচছিল। তাদের ভেতর প্রায় প্রৌঢ়া থেকে নিতান্ত বালিকা পর্যন্ত সব স্তরের মেয়েই আছে। তবে যুবতির সংখ্যাই বেশি। অথবা অল্পেতেই এরা বুড়িয়ে যায় না বলেই হয়তো এদের যৌবন সবসময়ে বয়সের হাত ধরে চলে না। সুন্দরলালের সংসারাশ্রমের কথা মনে পড়ে। তার স্ত্রীর বয়স তো এখনও কুড়ি পার হয়নি, কিন্তু…।
চমক ভাঙল। এক ভাঁড় মহুয়ার মদ এসে গেছে। ঝড় বললে, পেসাদ করে দাও বাবাঠাকুর।
