সুন্দরলালের মোহ কেটে গিয়েছে অন্তত। আজ যে তোমার বন্ধু, সামান্য অর্থের জন্যে কাল সে তোমার গলা টিপে ধরতে পারে। বড়ো আদরের যে-সহোদর ভাইটিকে তুমি একদন্ড চোখের আড়াল করতে পার না, এক ছটাক জমির জন্যে কাল হয়তো সে তোমার নামে এক নম্বর ফৌজদারি রুজু করে দেবে। যে-রূপবতী স্ত্রীর পায়ে যথাসর্বস্ব পণ করে তুমি কাপড়ে গহনায় নৈবেদ্য সাজিয়ে দিচ্ছ, একদিন ভোর বেলা হয়তো দেখবে গাঁয়ের ছটু তেওয়ারির সঙ্গে সে রাতারাতি হাওয়া হয়ে মিলিয়ে গিয়েছে। সুতরাং, মোহমুদগুরের ভাষায় একদিন কা তব কান্তা কস্তে পুত্রঃ বলে বেরিয়ে পড়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
এবং সুন্দরলাল বুদ্ধিমান লোক। তাই তিরিশ বছর না পেরোতেই সংসার ছেড়ে শুরু হয়েছে তার অগস্ত্যযাত্রা। কোনো বন্ধুই আজ আর তাকে পিছু টানে না। মহিষ চুরির ব্যাপার নিয়ে গাঁয়ের জমিদারের সঙ্গে এখন আর মামলা করতে হয় না। ছটু তেওয়ারির সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ করবার জন্যে দিনরাত চোখ-কান খাড়া করে থাকবার দরকার নেই। পাথরের মতো নির্মম রাঙামাটিতে কঠিন পরিশ্রমে লাঙল ঠেলে যদি ভালো গমের ফলন না করা যায়, তা হলেও এখন আর সংবৎসরের ভাবনা ভাবতে হয় না।
এ জীবনের সঙ্গে তার তার কি তুলনা হয়? সামনে একখানা ছবির মতো নীল পাহাড়, তার সর্বাঙ্গে সাঁওতাল পরগনার অপূর্ব বনশ্রী। দুমকা যাওয়ার রাস্তাটা পাহাড়ের গা ঘেঁষে ঘেঁষে অনেক দূর দিয়ে বেরিয়ে গেছে, সেখান থেকে এতটুকুও পোড়া পেট্রোল গ্যাসের গন্ধ এসে এখানকার আকাশ-বাতাসকে আবিল করে দেয় না। হর্নের বিকট শব্দে ভয়ত্রস্ত গোরুর পাল এখানে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালায় না। লাল রঙের বড়ড়া বাসখানা থেকে এক টুকরো পোড়া সিগারেট বা রেশমি শাড়ির একটা চলতি ঝলক মুহূর্তের মধ্যে যে একটা চাঞ্চল্যকর জগতের সংবাদ দিয়ে যায়, তার প্রভাব থেকেও এ জায়গাটা একেবারেই মুক্ত।
এখানে জঙ্গলের মধ্যে ডুম ডুম করে টিকারা বাজে। হাওয়ায় হাওয়ায় স্বপ্নের মতো শালের ফুল উড়ে যায়। যখন মহুয়াবন আকুল হয়ে ওঠে, ছোটো ছোটো গোলাপজামের মতো মহুয়ার সাদা ফুলগুলি তিক্তমধুর রসে টসটস করতে থাকে, আর তার গন্ধে হরিয়ালের দল এসে ডালে পাতায় নাচানাচি করে, তখন সুন্দরলালের যেন নেশা ধরে যায়। সত্যিকারের আনন্দ তো এইখানেই। মোতিহারির আদালতে যারা ফৌজদারি মামলার তদবির করে, কিংবা সীতামারির চিনির কলে আখের দালালি করেই যারা দিন কাটিয়ে যাচ্ছে, তারা এর মর্ম কী বুঝবে?
তারা না-ই বুঝল, কিন্তু সুন্দরলাল বুঝেছে। এখানকার সাঁওতালদের মনের ওপর রীতিমতো আসন গেড়ে বসেছে সে। তারা তাকে শ্রদ্ধা করে, হয়তো বিশ্বাসও করে আজকাল। সুন্দরলাল গেরুয়া নেয়নি বটে, তবু সে সন্ন্যাসী। দন্ডী কিংবা ব্রহ্মচারী, এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্যে সাঁওতালেরা কখনো ব্যগ্র হয়ে ওঠে না। সুন্দরলাল হাত দেখতে জানে, যা বলে তা নাকি হুবহু মিলে যায় সব। শিকড়-বাকড় সম্বন্ধেও তার প্রচুর জ্ঞান, বহু কঠিন রোগে তার ওষুধ নাকি অব্যর্থ ক্রিয়া দেখিয়ে দিয়েছে।
সে শৈব না রামায়েত না গাণপত—এ নিয়ে তর্ক চলতে পারে, কিন্তু দেখা যায় তার কোনোটার ওপরেই বিদ্বেষ নেই। বোমভোলার নামে সে গাঁজার কলকিতে দম চড়িয়ে দেয়, সুর করে তুলসীদাসী রামায়ণ পড়ে। এখনও যারা বোঙার পুজোয় মুরগি বলি দেয়, তাদের পুজোর প্রসাদ নিতে তাকে কখনো আপত্তি করতে দেখা যায় না। সময় তো মোটে দু-মাস, কিন্তু এর মধ্যেই সাধু সুন্দরাল মহাপুরুষ সুন্দরলালে রূপন্তরিত হওয়ার উপক্রম করছে।
আকাশে সন্ধ্যার রং। সাঁওতাল পরগনার পাহাড়ের অরণ্যমন্ডিত চুড়োয় চুড়োয় নিবিড় ছায়া সঞ্চারিত হতে লাগল। শালবন ঘেরা দূরের উপত্যকাটা থেকে যে ছোটো পথটা ঘুরে ঘুরে ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেছে, তাকে দেখে মনে হয় যেন মৃত একটা বিশাল অক্টোপাসের প্রসারিত নিশ্চল বাহু; যেন মৃত্যুর আগে এক বার ওই পাহাড়টাকে মুখের ভেতরে টেনে আনবার শেষ চেষ্টা করেছিল।
পাহাড়ের গায়ে গায়ে ওই পথটা বেয়ে সুন্দরলালের ভুটানি খচ্চরটা নেমে এল। এটা ওর সন্ন্যাসের সঙ্গী-নাগাসন্ন্যাসীর লোটা-চিমটার মতোই অপরিহার্য। সন্ন্যাসী হলেও সুন্দরলাল একেবারে বাবা ভোলানাথের মতো ছাই মেখে নিরঙ্কুশ হয়ে বেরিয়ে পড়েনি, অশন-বসনের দায়টা সে মানে। তাই ডেরা তুলতে হলে তার ছোট্ট গাঁটরিটাকে খচ্চরের পিঠেই বেঁধে নিতে হয়। তা ছাড়া কেন কে জানে, অন্তত সপ্তাহে এক বার তাকে শহর থেকে ঘুরে আসতে হয়, শিষ্য-সামন্তদের দর্শন দেবার জন্যেই হয়তো। সে-কারণেও খচ্চরটাকে বাদ দিয়ে চলবার জো নেই।
ছোটো ছোটো পায়ে খট খট করে হাঁটতে হাঁটতে খচ্চরটা একেবারে সাঁওতাল পাড়ার মাঝখানে এসেই থামল। মাথার পাগড়িটা খুলে একপাশ দিয়ে লাফিয়ে পড়ল সুন্দরলাল। কাঁচা চামড়ায় তৈরি পুরোনো নাগরা জুতোটার কাঁটা লোহাগুলোতে একটা কর্কশ শব্দ বেজে উঠল, আর সেই শব্দটাকে ছাপিয়ে ময়লা চাপকানটার লম্বা পকেটে ঝনঝন করে সাড়া দিলে কয়েকটি ধাতুমুদ্রা।
বহুদূর থেকে আসতে হয়েছে। খচ্চরটারও পরিশ্রম হয়েছে খুব। ঘাড়ের ওপরকার ছোটো ছোটো খাড়া লোমগুলোর তলাটা ঘামে ভিজে গেছে, মুখের পাশে পাশে ফেনার আভাস। দড়ির লাগামটা ধরে তাকে ধীরে ধীরে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল সুন্দরলাল।
