চমকে উঠল বুড়িও।
অ সুদাম!
শুনছি, বলো।
তোর ছেলে কাঁদে কেন?
আমার ছেলে নয়। ওটা পাখি।
না, লুকোচ্ছিস আমায়। চোখে তো কিছু দেখতে পাইনে, তাই মিথ্যে করে বলছিস। কী হয়েছে ছেলের?
আচ্ছা জ্বালা তো। এই নৌকোয় ছেলে আসবে কোত্থেকে? বললুম-না ওটা পাখি?
নৌকো কেন সুদাম? তুই আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?
তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না দিদিমা। বার বার করেই তো বলছি, তোমায় নিয়ে যাচ্ছি শিমুলতলির বিশালাক্ষীর মন্দিরে।
হুঁ, মায়ের মন্দির। কতদিন বউকে বলেছি, এক বার নিয়ে চল। বউ বলে, এই শরীল নিয়ে তুমি যাবে কোথায়? আমি বলি, বউ, আমার দিন তো ফুরিয়ে এল, যাহোক করে নিয়ে চল—শেষ বার মায়ের পায়ে একটা পেন্নাম করে আসি।
বোঠেটা এক বারের জন্যে সুদামের হাতে আটকে গেল। বুড়িটাও তা হলে মরণের কথা ভাবে। ঠিক এই সময় এই কথাটা শোনবার জন্যে সুদাম তৈরি ছিল না।
সেই বিড়িটার ধোঁয়া কী করে যেন গলায় আটকে আছে এখনও। আবার খানিকটা কাশি এল।
তুই কাশছিস সুদাম।
না গো, ও কিছু নয়।
খুব পুরোনো ঘি আছে আমার কাছে। তোর ঠাকুর্দার ঠেয়ে চেয়ে নিয়েছিলুম। তোর বুকে একটু মালিশ করে দেব।
আবার মায়া বাড়াচ্ছে বুড়িটা। সুদামের ভয়ংকর খারাপ লাগল। কী-একটা যন্ত্রণার মতো চমকে গেল মনের ভেতর, বুড়ির ওপরে খানিকটা প্রবল বিদ্বেষ অনুভব করল সুদাম।
আমার কিছু দরকার নেই, আমি বেশ আছি।
কিন্তু মরণের ভাবনা বুড়িকে পেয়ে বসেছিল। এমনি করেই এক-একটা ভাবনার ঘোর ওর আসে। মরণের কথাটা মনে হলেই যেন এতদিনের জীবনটাতে যত মৃত্যু সে দেখেছে— সবাই, সবগুলো, ছবির মতো ভিড় করে আসতে থাকে তার ন্যাবা চোখের সামনে।
তোর দাদামশাই হঠাৎ মরে গেল। বেশ বসে ছিল দাওয়ায়—কী যে হল, বললে, বুকটায় বড্ড ব্যথা করছে। কবিরাজ এল, কিছুই করতে পারল না। আগের দিন নতুন কাপড় কিনে এনেছিল, সেইটে দিয়ে ঢেকে শুইয়ে রাখল ছাতিম গাছটার তলায়। সুদাম, আমিও একদিন…
চরায় নৌকো ভেড়াল সুদাম। চাঁদ এতক্ষণে বেরিয়ে এসেছে মেঘের আড়াল থেকে। লালচে আলোয় নদীর জলে কচি বাদাম পাতার রং লেগেছে মনে হয়। চরাটা পড়ে আছে প্রকান্ড একটা বোয়াল মাছের সাদা পেটের মতো।
বুড়ি বললে, সুদাম, আমিও একদিন অমনি করে মরে যাব। একটা কথাও বলতে পারব না হয়তো। তা ছাড়া সবই তো ভুলে যাই। সুদাম, আমার বালিশটার ভেতরে দু-কুড়ি রুপোর টাকা লুকোনো রয়েছে। মনে করে বার করে নিস কিন্তু। আর পারিস তো আমাকে একখানা নতুন কাপড় দিয়ে…
দাঁতে দাঁত চাপল সুদাম। বোঠে রেখে উঠে দাঁড়াল। বললে, দিদিমা এসে গিয়েছি।
কিছু না, কিছু না। ঘণ্টা দুই আরও বুড়িকে বসে থাকতে হবে ভিজে চড়াটার ওপর। তারপরে জোয়ার আসবে। তারও পরে আর কিছুই নেই।
তুলসীর কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে, গাঁয়ের লোকেও জানতে চাইবে। কিন্তু কী জানে সুদাম? হয়তো দোর খুলে রেখেছিল, শেয়ালে টেনে নিয়ে গেছে। হয়তো অন্ধকারে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল, তারপর উঠোন ডিঙিয়ে কোনো সময় খালে গিয়ে পড়েছে। সারাদিন খেটেখুটে অঘোরে ঘুমুচ্ছিল সুদাম, এসব কিছুই তার জানবার কথা নয়। সে তো আর রাত জেগে বসে চৌকি দিতে পারে না।
বুড়ি মরার কথা ভাবছিল। আবার কী-একটা যন্ত্রণার মতো চমকে গেল সুদামের মাথার ভেতর দিয়ে। এত দিন তো কেটেছে, না-হয় যেতই আরও ক-টা দিন। বুড়ি নিজেই হয়তো…
লগি দিয়ে নৌকোটাকে সরিয়ে আনতে আনতে সুদাম নিজের বিরুদ্ধেই প্রাণপণে মাথা নাড়ল। না, মরবে না। ওই ভূশন্ডি কাগের মরণ নেই। তার ভিটের সব মানুষগুলোকে খেয়ে শেষ করবার পরে পোড় পোতার ওপর বুনো ওল, আকন্দ আর বিছুটি বনের মধ্যে ধূমাবতীর মতো লকলকে জিভ মেলে আকাশের দিকে চেয়ে বসে থাকবে বুড়িটা। তার পাটের মতো চুলগুলোর ভেতরে খেলে বেড়াবে লাউডগা সাপ…
চরার দিকে কীরকম একটা আওয়াজ এল কানে। সুদাম ফিরে তাকাল। ভিজে বালির ওপর হাঁটুর ভেতরে মাথা গুঁজে বসে আছে বুড়িটা। জবুথবু ভাঙা চাঁদটা লালচে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে মুঠো মুঠো। সেই আলোয় লাল গামছা-জড়ানো বুড়িকে ঠিক নতুন কনেবউয়ের মতো মনে হল।
আরে! চরার দিকে পোড়া কাঠের মতো ভেসে যাচ্ছে কী ওটা? তারই তো আওয়াজ পেয়েছিল সুদাম! মরা জ্যোৎস্নায় ওর দুটো চোখ জ্বলছে যে। শালা কুমির! বুড়িকে খেতে যাচ্ছে।
হেই হেই–হেই…
জলের ওপর সজোরে বোঠে আছড়াল সুদাম। তিরবেগে নৌকো ঘুরাল চরার দিকে। চোখের সামনে কুমিরে টেনে নিয়ে যাবে? ব্যাটাচ্ছেলে আর আধ ঘণ্টাও দেরি করতে পারল না?
কুমির ডুব মেরেছিল। সুদাম লাফিয়ে পড়ল চরার ওপর।
না, হল না। তুমি খুনি হতে পারো, কিন্তু চোখের সামনে আর একটা খুন সহ্য করবে কী করে?
আবার উজান ঠেলে ঠেলে ফিরে যাওয়া। ক্লান্তি, বিরক্তি আর না-ঘুমোনো রাতের অবসাদে পাড় ঘেঁষে হিংস্রভাবে লগি মেরে এগিয়ে চলল সুদাম। বুড়ি ডিঙির ওপর তেমনি পুঁটলি পাকিয়ে নিথর। হয়তো সব বুঝেছে, হয়তো কিছুই বোঝেনি। হয়তো আবার ওর চোখের সামনে দিয়ে ছায়ার মিছিল চলে যাচ্ছে।
হারামজাদা কুমির! আর আধ ঘণ্টাও দেরি করতে পারল না?
নীচের ঠোঁট দাঁত দিয়ে শক্ত করে চেপে লগি ঠেলতে লাগল সুদাম। তার মনে পড়ল— এই এতক্ষণ ধরে বুড়ি এক বারও খেতে চায়নি, এক বারও বলেনি–বউ খিদেয় যে আমি মরে গেলুম। যদি বলত—পরাভূত সুদামের মনে হল, তা হলে কুমিরটাও কিছু করতে পারত না।
বীতংস
সংসার-আশ্রমে থাকবার আর কোনো অর্থ হয় না।
