সুদাম, আমার শীত যায় না।
বুড়িকে নদীর চড়ায় নামিয়ে দিতে চলেছে বলে নয়, কতদিনকতকাল তাকে একখানা কাপড় কিনে দেয়নি। হঠাৎ সেই কথাটা মনে হওয়ায় সুদামের নিজেকে কেমন অপরাধী বলে বোধ হয়। হতে পারে কাপড়ের অনেক দাম, কিন্তু…
সুদাম, ভারি শীত লাগে আমার।
অপরাধবোধটা তীব্র বিরক্তির ভেতরে বাঁক ঘুরল। তোমার শীত কোনোদিন আর যাবেও। মনে মনে দাঁত খিচোয় সুদাম। কোমরে বাঁধা বড়ো নতুন গামছাটা খুলে বুড়ির গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বললে, নাও-হল এবার?
হল কি না কে জানে, বুড়ি চুপ করল। আবার সেই হাঁটুর মধ্যে মাথাটা গুঁজে চুপ করে বসে থাকা। সুদাম বিড়ি ধরাল একটা। দেশলাইয়ের একটুখানি আলোতে হঠাৎ কেমন একটা চমক লাগল তার। লাল গামছায়-জড়ানো বুড়িটাকে এক বারের জন্যে লাল শাড়িপরা ভারি ছেলেমানুষ একটা বউয়ের মতো মনে হল। সুদামের মা বলত, বয়েসকালে নাকি বুড়ির চেহারা খুব সুন্দর ছিল।
সে কতকাল আগে কে জানে! সুদাম অবশ্য সেরকম কোনো চেহারা দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। ছেলেবেলা থেকেই দেখছে পাকধরা চুল, শুকনো মুখ, রোগা রোগা হাত পা নিয়ে হয় ধানসিদ্ধ করছে, নইলে গোরুর জন্যে জাবনা কাটছে; আর নয়তে দাওয়ায় মাটি লেপছে। অল্প বয়সে লালশাড়ি পরলে তাকে কেমন লাগত সে আছে বুড়ির স্বপ্নের ভেতর, সুদাম তা দেখতে পাচ্ছে না।
অ সুদাম!
আবার কী?
বউয়ের গলা শুনিনে কেন? সে কোথায়?
সুদাম ঝপাং করে জলে বোঠে ফেলল।
কেন? তাকে কী দরকার আবার?
বাড়ি যে নিঝুম মেরে রয়েছে। সে গেল কোথায়?
কী জ্বালা! তোমাকে যে শিমুলতলির মন্দিরে নিয়ে চলেছি। নৌকো করে যাচ্ছি যে। বউ তো সঙ্গে আসেনি।
বুড়ি মাথা তুলল। মাথাটা নড়তে লাগল থরথর করে। বেশ জেগে উঠেছে এখন। বউ কেন এল না সুদাম?
তার ঘরসংসার আছে-না? সব ফেলে সে কি বেরুতে পারে সবসময়?
মিথ্যেকথার জের টানতে সুদামের খারাপ লাগছিল, তোমার অনেক দিনের শখ, তাই নিয়ে এলুম।
তবু নিয়ে আসতে হত। যেন পলকা একটা সুতোয় বাঁধা রয়েছে এইভাবে বুড়ির মাথাটা নড়নড় করতে লাগল। বউমানুষ মায়ের পুজো দিলে সোয়ামি-পুত্তুরের মঙ্গল হয়।
আর মঙ্গলে দরকার নেই, বেশ হয়েছে। সুদাম আস্তে আস্তে বললে। বুড়ি শুনতে পেল।
নৌকোটা প্রায় নিঃশব্দে ছুটছে ভাটার টানে। সুদাম চোখ ছড়িয়ে দিলে অন্ধকার-ছড়ানো ধু-ধু নদীটার সাদাটে জলের ওপর। ভালো করে কিছু বোঝা যায় না, কিন্তু সুদামের সব চেনা, পুরো আন্দাজ আছে তার। আর বেশি দেরি নেই, যে-চরাটার কথা ভেবেছে সেটা প্রায় এসে পড়ল বলে।
বিড়িতে একটা শেষ টান দিতে গিয়ে গলায় লাগল। খক খক করে কাশি এল খানিকটা। বুড়ির বোধ হয় আবার ঝিম আসছিল, জেগে উঠল সঙ্গে সঙ্গে।
অ সুদাম! বাঁ-হাতের তেলোয় মুখটা মুছে ফেলে সুদাম বললে, কী বলছ আবার?
তোর ভারি কাশি হয়েছে না?
না, কিছু হয়নি।
হয়েছে বই কী, কাশছিস বলে মনে হল যে! চোখে তো দেখতে পাইনে দাদা, একটু কাছে সরে আয় দিকি, তোর বুকে একটু হাত বুলিয়ে দিই।
দরকার নেই, আমি বেশ আছি। সুদামের খুব খারাপ লাগল। বুড়িটা বুঝতে পেরেছে? তাই কি মায়া বাড়াতে চায়?
বুড়ি একটু চুপ করে রইল। তারপর ভাঙা গলায় বললে, তুই জানিস?
কী জানব আবার?
ঠিক কথা, তুই কী করে জানবি! তুই তখনও হসইনি। তোর বাপের বুকে সে-বার সর্দি বসে খুব কাশি হয়েছিল। আমাকে বলত, মাসি, তুমি আমার বুকে একটু হাত বুলিয়ে দাও, তা হলেই আমার সব কষ্ট চলে যাবে। বলতে বলতে গলা জড়িয়ে গেল, খেই হারিয়ে গেল কথার, অনেকগুলো ছায়ার মিছিল এল চোখের সামনে। কী বিষ্টি—কী বিষ্টি সে-বার! দশ দিন ধরে একনাগাড়ে চলেছে, থামেই না। মাঠ-ঘাট-পুকুর সব ভেসে গিয়েছিল। উঠোনে উঠে এসেছিল কী বড়ো বড়ো সব কই মাছ। তোর বাবা ধরছিল, পেরানকেষ্ট একটা মস্ত বোয়াল গেঁথে তুলেছিল। ঘরের দাওয়ায় এক জোড়া চন্দ্রবোড়া সাপ…
বুড়ির কথাগুলো আবছা হতে হতে স্বপ্নের ভেতর মিশে গেল। শুনতে শুনতে এক বারের জন্য অন্যমনস্ক হল সুদাম। সেও হয়তো এমনি করে বুড়ো হয়ে অনেক অনেক দিন যতদিন তার বেঁচে থাকা ভালো, তারও চেয়ে ঢের বেশিদিন এই বুড়িটার মতো বেঁচে থাকবে। সেদিন তারও চোখ এমনি করে বাইরের জগৎ থেকে হারিয়ে গিয়ে ভেতরে তলিয়ে যেতে থাকবে। এমনিভাবেই আজকের চেনা মানুষ, চেনা দিনগুলো ছাড়া ছাড়া ছবি ছবি হয়ে, আর…
আর সেদিনও কি তার ছেলে কিংবা তার নাতি মাঝরাতে তাকে এমনি করে নৌকোয় তুলে নিয়ে… দুত্তোর।
কী আজেবাজে ভাবনা হে! না, এমন করে বেঁচে থাকা তাদের বংশে নেই। তার বাপ মরেছিল ষাটের ঘরে, তখনও ভারি জোয়ান ছিল সে, জ্বরে পড়বার দিনও সে সারাটা সকাল মাঠে লাঙল দিয়েছিল। সুদামের বেশ মনে আছে, বাড়িতে মা সেদিন বড়ো বড়ো লাল ধেনোকাঁকড়ার ঝোল বেঁধেছিল। মাঠ থেকে ফিরে গায়ে কাঁথা জড়িয়ে শুতে শুতে বাবা বলেছিল, আজ আর কিছুটি খাব না সুদামের মা, শরীলটা যেন কেমন কেমন লাগছে। মা-র বয়েস কত হয়েছিল সুদাম জানে না। কিন্তু বাবা চলে যাওয়ার পর তিনটে বচ্ছরও সে রইল না। বড়ো ভালোবাসত বাবাকে।
ক্যাঁও-ক্যাঁও-ক্যাঁও–
সুদাম চমকে উঠল। কী বেয়াক্কেলে একটা বিচ্ছিরি পাখি হে! এই মাঝরাত্তিরে বাজখাঁই গলায় ডাকতে ডাকতে চলেছে, বুকের ভেতরটা যেন কাঁপিয়ে দিলে একেবারে। এত বড় নদীটা পড়েই রয়েছে দু-ধারে, ঠিক মাথার ওপর দিয়েই ডাকতে ডাকতে না গেলেই আর চলছিল না?
