এখনই যেন কত দর্শন করতে পারবে! চোখের মাথা তো খুইয়ে রেখেছে। কথাটা মুখে এলেও সুদাম বলল না। বরং তার মনে হল, দর্শনের ব্যবস্থাটা পাকাঁপাকিই করে দিচ্ছি। এবার। আমার ঘাড় থেকে নেমে সেখানে গিয়েই বাস্তু বাঁধে এখন।
মেঘে আধখানা আকাশ ঢাকা, চাঁদের ভাঙা টুকরোটা তাই ভেতর থেকে ফুটতে পারছিল। সারা গ্রাম মাঝরাতেই ঘুমে নিথর। একটু হাওয়া নেই, একটা পাতা নড়ছে না, একটা কুকুর পর্যন্ত ডাকছে না কোথাও। মেঠো শামুকের মতো রং নিয়ে ক্যানালের গেরিমাটি জল ভাটার টানে নদীর দিকে ছুটেছে। বুড়িকে নৌকোয় তুলে সুদাম স্রোতে ভেসে পড়ল।
সেই থেকে বুড়ি নিশ্ৰুপ। যেখানে বসিয়েছিল, সেইখানেই হাঁটুর ভেতরে মাথা গুঁজে একটা তামাকের ময়লা পুঁটলির মতো পড়ে আছে। আবার স্বপ্ন দেখছে হয়তো। অনেককাল আগেকার মরে-যাওয়া মানুষগুলো এখন একে একে সার দিয়ে তার মনের সামনে দিয়ে সরে যাচ্ছে। একটু পরেই হয়তো চেঁচিয়ে উঠবে, কে যায়, কে যায় ওখান দিয়ে? আজ কি তোরা আমাকে একমুঠো খেতে দিবিনে?
চাঁদটা উঠতে চেষ্টা করছে, উঠতে পারছে না। আশেপাশে, দূরে, অনেক দূরে একটা আলোও জ্বলছে না। কার দায় পড়েছে আলো জ্বালবার, কেরোসিন তেল কি এতই সস্তা? জোনাকি ঝিলমিল করছে ঝোপজঙ্গলে, কিন্তু জোনাকির আলোয় কেউ কিছু দেখতে পায় না, জোনাকিরা কারও সাক্ষী থাকে না। এই ভালো, আজ এই অন্ধকারটাই সুদামের দরকার।
নৌকো নদীতে এসে পড়ল। ভাটার ডাক উঠেছে জলে। এতক্ষণ গুমোট ছিল, এবারে হঠাৎ খানিকটা হাওয়া যেন হা-হা করে উঠল। ডিঙিটা দুলতে লাগল অল্প অল্প, ফিকে সাদাটে জল চিকচিক করতে লাগল।
সুদাম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিলে চারদিক। না, কোথাও কেউ নেই। দু-মাইল দূরে বাঁকের মুখে গঞ্জে এক-আধটা আলোর বিন্দু দেখা যায় কি যায় না। এদিকে অন্ধকারে সাদাটে রঙের প্রকান্ড নদীটা ধু-ধু করছে, বাতাসে হা-হা করছে। আজ রাতে সুদামের এইটেই দরকার ছিল।
মনে মনে সে হিসেব করেই রেখেছে। চার-পাঁচ ঘণ্টা ভাটা আছে এখনও। একটা চরায় পৌছুতে কতক্ষণই-বা। বুড়িকে তার ওপর নামিয়ে দিয়ে নিঃসাড়ে ফিরে আসা। তারপরে জোয়ার আসবে। তারও পরে…
বইঠা টানতে টানতে সুদাম যেন নিজেকেই জিজ্ঞেস করতে চাইল–কাজটা অন্যায়? কিন্তু কেন অন্যায়? মরবার সময় হলেও যে মরে না, সম্পূর্ণ অকারণে যে জ্যান্ত মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে খায়, এ ছাড়া আর কী করা যেতে পারে তার জন্যে? সুদাম জানে, সরকারি চাকরিরও একটা মেয়াদ আছে; সময় হলেই তোমাকে ছাড়িয়ে দেবে—সে তুমি হাকিমই হও আর পেয়াদাই হও। তেমনি বেঁচে থাকারও একটা সীমা থাকা দরকার, তারপরে তুমি আর কেউ নও, কোথাও তোমার আর দরকার নেই।
সুদাম, সুদাম।
সুদাম চমকে উঠল। প্রথমটা শুনতে পায়নি, কিন্তু শব্দটা এত অস্বাভাবিক, নদীর একটানা কলধ্বনির ভেতরে এমনই বেসুরো যে হঠাৎ যেন ওটা তার কানে গিয়ে ঘা মারল, হাত কেঁপে উঠল তার।
বুড়ি তাকে ডাকছিল।
ডাকছিল তার কাছ থেকে দু-হাত দূরে বসেই। অথচ সুদামের মনে হল যেন আধ মাইলের ওপার থেকে ডাকটা তার কানে আসছে।
সুদাম বললে, হ্যাঁ গা, বলছ কিছু?
আমরা কোথায় যাচ্ছি? হ্যাঁ রে সুদাম?
বললুম-না, শিমুলতলির মন্দিরে?
ঠিক, শিমুলতলির মন্দিরে? বুড়ি বিড়বিড় করতে লাগল— কতদিন মাকে দশশন করিনি। কিন্তু… আচ্ছা সুদাম!
আবার কী হল?
বড়ো গাঙের মতো আওয়াজ পাই যেন! গায়ে ঠাণ্ডা লাগে যেন! ও সুদাম!
কী বাজে বকছ? সুদাম বিরক্ত হয়, একটু চুপ করে বসে থাকো দিকিনি।
বুড়ি চুপ করে। হাঁটুর ভেতর মাথাটা গুঁজে দিয়ে আবার তলিয়ে যায় সেই না-জাগার স্বপ্নের ভেতরে। সুদাম আস্তে আস্তে দাঁড় বাইতে বাইতে সেই স্বপ্নগুলোর কথা ভাবতে চেষ্টা করে। কারা বেঁচে ছিল অনেক দিন আগে, এখন আর নেই, কিন্তু বুড়ির মনের সামনে তারা এখনও আসে-যায়। কেউ এই মাত্তর ধান কেটে ফিরল মাঠ থেকে, কেউ কলমি শাক তুলছে একটা পুরোনো পুকুর থেকে, নতুন জলে-ভরা বর্ষার নদীতে কারা যেন নাইতে এসেছে দুপুর বেলা, নাকে নোলক আর ধানি রঙের শাড়ি পরে একটি নতুন বউ এসেছে তাদের সঙ্গে–বুড়িই হয়তো। কে যেন নতুন বউটার হাতে রাঙা রাঙা কাচের চুড়ি পরিয়ে দিতে দিতে বলছে, হাট থেকে অনেক খুঁজে নিয়ে এলুম তোর জন্যে, এমন হাতে এ চুড়ি না হলে কি মানায়?
সুদামের হঠাৎ হাসি পায়। দুত্তোর, তাকেও তো আচ্ছা পাগলামিতে ধরল। বুড়ির মতো সেও কি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।
যে-হাওয়াটা উঠে এসেছিল, আবার থেমে গেছে সেটা। নদীতে ঢেউ আছে কি নেই, শুধু ভাটার জলের কলকল ডাক শোনা যায়। চোখে পড়ে—অনেক দূরে উত্তরের আকাশটা এক এক বার লালচে হয়ে উঠেই আবার ঢেকে যাচ্ছে কালচে ছাইয়ের রঙে। ইস, এই রাত্তিরে আবার কার সুখের ঘরে আগুন লাগল হে!
সুদাম! বুড়িটা নড়ে উঠল।
কী হল তোমার?
আমার শীত করে।
শীত কোথায় এখন এই চত্তির মাসের রাত্তিরে? তোমার যত বাজে কথা।
আমার শীত করে সুদাম।
ভালো জ্বালা। সুদাম বিরক্ত হল। বোঠে ছেড়ে দিয়ে একটু ঝুঁকে পড়ল বুড়ির দিকে, গিটবাঁধা ছেঁড়া আঁচলটা ভালো করে জড়িয়ে দিলে তার গায়ে। কিন্তু জড়াতে গিয়ে কী করে ফেঁসে গেল অনেকখানি। বুড়ির কাপড়টায় আর পদার্থ নেই, পচে গলে শেষ হয়ে গেছে একেবারে। কতদিন যে বুড়িকে কাপড় কিনে দেয়নি সুদাম, তা মনে করতে পারল না।
