জানেন, কী বলছেন আপনি?
ডাক্তার ভয় পাননি। স্থিতপ্রজ্ঞের গাম্ভীর্য নিয়ে চশমাটা রুমালে মুছতে মুছতে বলেছিলেন, জানি। যদি বিশ্বাস না করেন, আপনার আর আপনার মেয়ের ব্লাড দিয়ে যান। কাল কান টেস্টের রিপোর্ট পাঠিয়ে দেব, তা থেকেই আশা করি সব বুঝতে পারবেন।
জীবনে এই প্রথম থমকে গিয়েছিলেন নৃপেন রায়, যেন কুঁকড়ে গিয়েছিলেন। শিথিল হয়ে গিয়েছিল মুখের পেশিগুলো, মুঠিটা ঢিলে হয়ে এসেছিল চেয়ারের গায়ে। আর দাঁড়াননি তারপর।
ডাক্তারের টেবিলের ওপর প্রায় ছুড়ে দিয়েছিলেন ফি-এর টাকাগুলো। মেয়ের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলেছিলেন, চল।
কিন্তু আর চিকিৎসা হয়নি গৌরীর।
চিকিৎসা করেও কোনো লাভ হবে না, একথা বুঝতে পেরেছিলেন নৃপেন রায়। কিছুদিন একটা গভীর অপরাধবোধ তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখল। তারপর ক্রমশ নিজের মধ্যেই একটা জোর খুঁজে পেলেন তিনি। অন্যায় যদি তাঁর হয়ে থাকে, তবে তার প্রতিকারের দায়িত্বও তাঁরই হাতে। গৌরীকে তিনি জাগিয়ে তুলবেন, চেতনার আলো ছড়িয়ে দেবেন তার অন্ধকার মনের প্রান্তে প্রান্তে।
প্রাণ যদি নাই পায়, অন্তত অন্য দিক থেকে সজাগ করে তুলবেন একটার পর একটা নিষ্ঠুর হিংসার খোঁচা দিয়ে।
হিংসা! তাই বটে। কী বিরাট, কী প্রচন্ড শক্তি! রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার যখন তাঁকে সামনাসামনি চার্জ করেছে, তখন সে-শক্তির বিদ্যুঝলক টের পেয়েছেন রক্তের মধ্যে। শালবনের ভেতরে মাতলা হাতি শিকার করতে গিয়ে সেই শক্তির উৎক্ষেপে দুলে উঠেছে তাঁর হৃৎপিন্ড। সেই শক্তি, সেই হিংসা। জীবনে নৃপেন রায় তার চেয়ে কোনো বড়ো জিনিসের কথা ভাবতেও পারেননি।
গৌরী জাগুক, কেটে যাক তার চৈতন্যের ওপর থেকে এই কুয়াশার আবরণ। তারপর ডাক্তারকে তিনি দেখে নেবেন।
আজও অস্পষ্টভাবে তাঁর মাথার মধ্যে যেন ঘুরে যাচ্ছিল এই চিন্তাটাই। আধবোজা চোখে গৌরীর দিকে তিনি চেয়ে রইলেন আবিষ্টের মতো।
হাঁস দুটো আজ বড়ো ভুগিয়েছে, না?
তেমনি প্রাণহীন গলায় গৌরী বললে, হ্যাঁ বাবা।
শিকারে যেতে পোর ভালো লাগে না?
লাগে।
কষ্ট হয় না?
হয়। গৌরী জানলার বাইরে আম গাছটার দিকে দৃষ্টি মেলে দিলে। অনেক কাঁটা আর বড্ড রোদ, হাঁটতে পারা যায় না।
ওটুকু কষ্ট না করলে শিকারি হতে পারে কেউ? উৎসাহে নৃপেন রায় দৃষ্টিটা সম্পূর্ণ মুক্ত করে ধরলেন।
শিকার কি আর ধরা দেয় অত সহজে? অনেক পরিশ্রম করতে হয়, অনেক রোদ কাঁটা সইতে হয়। একবার নেশা ধরলে দেখবি দুনিয়ার আর সব একেবারেই ভুলিয়ে দেবে।
কিন্তু পাখি মেরে কী হয় বাবা? গৌরীর নিষ্প্রাণ চোখে একটা জান্তব বেদনা পরিস্ফুট হয়ে উঠল, কেমন সুন্দর দেখতে! আর কী মিষ্টি করে ডাকে!
হঠাৎ একটা খোঁচা খেলেন নৃপেন রায়, চমকে উঠলেন কীসের অশুভ সংকেতে। উলটো সুর বলছে গৌরীর গলা; এমন কথা ছিল না, এমন হওয়া উচিত নয়।
কাউচের উপর উঠে বসলেন তিনি। মানসিক অধৈর্যে বুটপরা পা দুটোকে সশব্দে নামিয়ে আনলেন মেঝের ওপর। স্বগতোক্তির মতো পুনরাবৃত্তি করলেন গৌরীর কথা দুটোর, খুব সুন্দর দেখতে, না? খুব মিষ্টি করে ডাকে কেমন?
হকচকিয়ে গেল গৌরী। নীহারিকার মতো অস্বচ্ছ মনের ধোঁয়াটে পর্দায় জান্তব ভীতির পূর্বাভাস পড়েছে। চাপা উৎকণ্ঠায় গৌরী বললে, হ্যাঁ বাবা!
হ্যাঁ বাবা! নৃপেন রায় বিশ্রীভাবে ভেংচে উঠলেন একটা। ইচ্ছে করল থাবার মতো তাঁর প্রচন্ড মুঠিটা সজোরে বসিয়ে দেন মেয়েটার মাথার ওপর।
আর খেতে কেমন লাগে? কেমন লাগে নরম তুলতুলে মাংসগুলো? বিকৃত গলায় তিনি একটা তিক্ত প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, চাবুকের আওয়াজের মতো যেন বাতাসে কেটে গেল কথাটা।
সভয়ে গৌরী চুপ করে রইল কিছুক্ষণ।
কী, কথা কইছিস না যে? পায়ের নীচে একটা কিছু থেঁতলে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছেন এমনই ভঙ্গিতে বুটজোড়া মেঝেতে ঠুকলেন নৃপেন রায়।
প্রায় নিঃশব্দে জবাব এল গৌরীর, খেতে ভালোই লাগে বাবা।
খেতে যা ভালো লাগে, তা মারতেও মন্দ লাগা উচিত নয়। হিপনটাইজ করবার মতো একটা নির্নিমেষ খরতা জ্বলতে লাগল নৃপেন রায়ের চোখে। যা, পাখিগুলোর পালক ছাড়িয়ে কেটেকুটে তৈরি করে রাখ গো
আমি? ব্যথিত বিস্ময়ে গৌরী বললে, আমি তো কখনো করি না বাবা। ওসব তো বৃন্দাবন করে।
না, আজ থেকে বৃন্দাবন আর করবে না, তোকেই করতে হবে। নৃপেন রায়ের সমস্ত মুখোনা মুছে গিয়ে গৌরীর দৃষ্টির সামনে প্রত্যক্ষ হয়ে রইল শুধু দুটো আগ্নেয় চোখ। তুই-ই করবি এর পর থেকে। যা।
কলের পুতুলের মতো উঠে পড়ল গৌরী। তারপর পিঠের ওপর বাপের প্রখর দৃষ্টির উত্তাপ অনুভব করতে করতে তাড়া-খাওয়া একটা জানোয়ারের মতো পাখিগুলোকে তুলে নিয়ে ছুটে পালাল।
লাল হয়ে আসা শেষ রোদে বাগানের মধ্যে পায়চারি করছিলেন নৃপেন রায়। অদ্ভুত কৌতুকের সঙ্গে লক্ষ করছিলেন সূর্য ডোবার আগেই কোথা থেকে বেরিয়ে পড়েছে একটা পাহাড়ি মথ। বেশ বড়ো আকারের, প্রায় পাঁচ ইঞ্চি করে ফিকে নীলের ওপর সাদা ডোরাকাটা ডানা। মথটা ঘুরে ঘুরে কেয়াপাতার ওপর বসবার চেষ্টা করছে, কিন্তু তারপরেই তীক্ষ্ণধার কাঁটার ঘায়ে উড়ে যাচ্ছে সেখান থেকে।
সুন্দর পাখা, খাসা রং। কিন্তু নির্বোধটা জানে না, এই কেয়াকাঁটার ঝাড়ে রঙিন পাখনা নিয়ে বসবার মতো জায়গা নেই কোথাও। হঠাৎ একটা অমানুষিক আনন্দে নৃপেন রায় থাবা দিয়ে ধরলে মথটাকে। মুঠির মধ্যে পড়তে-না-পড়তে সেটা পিষ্ট হয়ে গেল, হাতের তালুতে পরাগের মতো জড়িয়ে রইল একরাশ সাদা গুঁড়ো।
