পরনে ব্রিচেস, কাঁধে ঝোলানো দু-দুটো বন্দুক, ভয়ংকর মানুষটাকে তা আরও বীভৎস করে তুলেছে। কিন্তু তিনি একা নন, তাঁর সঙ্গে একটা মেয়েও আছে—তাঁরই মেয়ে। তার আকর্ষণও কম নয়।
বছর বারোর মেয়ে। ববছাঁটা ধূলিরুক্ষ চুল। খাকিরঙা সালোয়ারের ওপর একটি খাকি শার্ট পরা। মেয়েটির গলায় টোটার মালা। শুধু টোটা নয়, আর এক ছড়া মালাও আছে। তাতে ঝুলছে রক্তমাখা গোটা পাঁচেক স্নাইপ এবং এক জোড়া চায়না ডাক। মেয়েটির জামার এখানে-ওখানে সে-রক্তের ছোপ লেগেছে—যেন ভৈরবীর মূর্তি।
সব মিলিয়ে দৃশ্যটাকে ভয়ানক বললেও কম বলা হয়। পৈশাচিক।
ভিড়ের মধ্য থেকে কে একজন মন্তব্য ছুড়ে দিলে একটা।
দেখেছ কান্ড! মেয়েটাকেসুদ্ধ কী বানিয়ে তুলছে।
আর একজন বললে, লোকটা একেবারে অমানুষ!
যা বলেছ। কেউ সরস করে ব্যাখ্যা করে দিলে—জিনিসটা মানুষ নিশ্চয় নয়, রাক্ষস।
বাপ-মেয়ে কথাগুলো কেউ শুনতে পেলেন কি না বোঝা গেল না। শুনলেও ভ্রূক্ষেপ করলেন না নৃপেন রায়। জীবনে করেনওনি কোনোদিন।
মাথার ওপর উঠে আসা দুপুরের সূর্যের কড়া রোদে দুজনে সোজা চলে গেলেন। দুজনেই বুটপরা, শুধু বহুদূর থেকেও সেই দু-জোড়া বুটের অস্পষ্ট হয়ে আসা মচমচানি শোনা যেতে লাগল।
শহরের একটেরেয় নৃপেন রায়ের বাড়ি। সামনে একখানা মাঝারি ধরনের বাগান। তাতে একটি গন্ধরাজ, একটি ম্যাগনোলিয়া এবং দুটি শিউলি। একপাশে বহু পুরোনো একটি আম গাছ, তাতে আজকাল আর ফল ধরে না। বসন্তের হাওয়ায় কয়েকটি শীর্ণ মুকুল দেখা দিয়েই ঝরে যায় বিবর্ণ জীর্ণতায়। একদিকে বেশ পুরু একটি কেয়াঝোপ। বাড়ির গায়ে কেয়াবন কোনো গৃহস্থের ভালো লাগার কথা নয়, বর্ষায় ফুল ফুটলে তার পাগল-করা-গন্ধে নাকি আনাগোনা শুরু হয় গোখরো সাপের। কিন্তু ওসব কোনো কুসংস্কার নেই নৃপেন রায়ের। আর এ ছাড়া বাগানের সবচেয়ে বিশেষত্ব হল, সযত্নরোপিত নানা জাতের ক্যাকটাস। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গা থেকে এদের সংগ্রহ করা হয়েছে। বেশিরভাগই তীক্ষ্ণকাঁটায় আকীর্ণ, নানা বিচিত্র ধরনের ফুল ফোটে তাতে। শিকার আর ক্যাকটাসের পরিচর্যা—এই হল নৃপেন রায়ের প্রধান ব্যসন।
বাড়িটা বড়ো কিন্তু এখন শ্রীহীন। প্রায় হাজার পঞ্চাশেক টাকা আর চা-বাগানের মোটা রকমের শেয়ার রেখে বাপ চোখ বুজেছিলেন। আন্তরিক নিষ্ঠার সঙ্গে ওই পঞ্চাশ হাজার টাকা কয়েকটি বছরের মধ্যেই উড়িয়েছেন নৃপেন রায়। এখন সংসার চলে বাঁধা মাইনের মতো শেয়ারের একটা নিয়মিত আয়ে। তারও পরিমাণ উপেক্ষার নয়। খুশিমতো আর অপচয় করা চলে না বটে, কিন্তু রুচিমাফিক অপব্যয়ে বাধা নেই এখনও। সে-অপব্যয়টা চলে শিকার আর বিলাতি মদের রন্ধ্রপথে।
নৃপেন আর তাঁর মেয়ে গৌরী, এই দুজনকে নিয়েই সংসার। একটা বুড়ো চাকর আছে বাপের আমলের; চোখে অল্প অল্প ছানি পড়েছে, কানেও কম শোনে। সংসারের ঝক্কিটা পোয়াতে হয় তাকেই। গৌরীর বছর দুই বয়েসের সময় নৃপেন রায়ের স্ত্রী স্বামীর আটত্রিশ বোরের রিভলবারটা দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। সেই থেকে ওদিকটাতে নিশ্চিন্ত হয়েছেন নৃপেন রায়। তারপরে আর বিয়ে করেননি। মেয়েদের তিনি সহ্য করতে পারেন না।
বাইরের ঘরে ঢুকে একটা সোফার ওপর বন্দুক দুটোকে নামিয়ে রাখলেন। তারপর বুটসুদ্ধ পা দুটোকে তুলেই এলিয়ে পড়লেন একটা কাউচে।
পাখি আর টোটার মালা গলায় নিয়ে গৌরী তখনও সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কী করতে হবে জানে না—বাপের আদেশের অপেক্ষা করছে সে।
পাখাটা খুলে দে তো গৌরী। আর ওগুলো নামিয়ে রাখ মেঝেতে।
গৌরী তাই করল।
আয়, বোস আমার কাছে। নৃপেন রায় ডাকলেন। গলার স্বরে মেশাতে চাইলেন স্নেহের নমনীয় আমেজ। সে-স্বরে স্নেহ ফুটল কি না বোঝা গেল না, কিন্তু গৌরী যেন আশ্বস্ত বোধ করল একটু। একটা টুল টেনে নিয়ে নীরবে বাপের পাশে এসে বসল।
আজ খুব কষ্ট হয়েছে, না রে? আবার সস্নেহ স্বরে জানতে চাইলেন নৃপেন রায়।
হ্যাঁ বাবা। আস্তে আস্তে জবাব দিলে গৌরী।
মিষ্টি, ক্লান্ত গলার আওয়াজ। এতক্ষণ পরে মেয়েটিকে যেন দেখতে পাওয়া গেল ভালো করে। অলঞ্জীর মতো বব-করা রুক্ষ চুলের পটভূমিতেও শান্ত কমনীয় একখানা মুখ। গভীর কালো চোখের তারায় ব্যথিত শঙ্কা। বাইরের পোশাকের সঙ্গে যেন কোনো মিল নেই তার মনের চেহারার।
আরও একটু লক্ষ করলে চোখে পড়ে—তার মুখে কোথাও যেন ভাবের স্পষ্ট আভাস নেই কিছু, কেমন প্রাণহীন। একটা জন্তুর মতো প্রাকৃতিক ভয়, প্রাকৃতিক দুঃখানুভূতি। কোনো ডাক্তার দেখলে প্রথম দৃষ্টিতেই বলে দেবে মেয়েটা হাবা। তার শিশুর মতো অপরিণত চেতনা চিরকাল নীহারিকায় বাষ্পচ্ছন্ন হয়ে থাকবে, কোনোদিন অভিজ্ঞতার কঠিন আকৃতি-বন্ধনে পূর্ণ হয়ে উঠবে না।
প্রথমদিকে একবার ডাক্তার দেখানো হয়েছিল অবশ্য। পরীক্ষা করে ডাক্তার শুধু মাথা নেড়েছিলেন বার কয়েক। তারপর ধিক্কারভরা চোখে নৃপেন রায়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আপনার পাপেরই ও প্রায়শ্চিত্ত করছে, এর কোনো ওষুধ নেই।
তার মানে?
মানে এখনও জানতে চান? ডাক্তারের মুখে ঘৃণার চিহ্ন ফুটে উঠেছিল, জন্মের আগেই ওর সমস্ত জীবনকে আপনি নষ্ট করে রেখেছেন। আজ আর ওর ভালো করবার চেষ্টা বৃথা।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন নৃপেন রায়। নিস্পন্দ হয়ে থেমে গিয়েছিল মুখের সমুদ্যত কঠিন হাড়ের সঙ্গে জড়ানো মাংসপেশিগুলো। শক্ত থাবায় চেয়ারের হাতলটাকে ধরেছিলেন মুঠো করে।
