সুদাম বলে, বুড়িটার গলা টিপে মেরে ফেলবে একদিন।
আঃ, কী-যে বক!
তবু সুদাম জানে, মুখে যা-ই বলুক, মনে মনে কোথায় তুলসীর একটা মায়া আছে বুড়ির জন্যে। মনটন ভালো থাকলে বলে, আহা—বলছে বলুক, ওর কি আর বোধভাষ্যি আছে। কোনো? এককালে তো বিস্তর করেছে তোমাদের। নতুন বউ হয়ে যখন তোমাদের বাড়িতে এলুম, রাতদিন কাঁদতুম মা-র জন্যে; তখন কত আদর করত আমায়, চোখের জল মুছিয়ে দিত, লুকিয়ে লুকিয়ে মিষ্টি এনে খাওয়াত। এখন অথর্ব হয়ে পড়েছে বলে…
সুদাম তাকিয়ে থাকে তুলসীর মুখের দিকে। মেয়েদের মন বোঝা ভগবানেরও সাধ্যি নয়। একটু আগেই চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করছিল— হয় বুড়িটাকে যেখানে তোক বিদেয় করো, নইলে আমিই বিদেয় হই। এখন ঠিক উলটো সুর ভাঁজতে শুরু করেছে। বুড়িটাও নিশ্চয় তুলসীকে বোঝে। তাই মরতে মরতেও মরে না, রাতদিন কোকিলের ছানার মতো হাঁ করে থাকে, ভাবে দুনিয়ায় যা-কিছু খাওয়ার আছে এই বেলা তা পেটপুরে খেয়ে নিই।
না, সুদামের কোনো মায়া নেই বুড়ির জন্যে। এক বিন্দুও না। কবে বুড়ি তাকে আদর করে দু-চারটে নাড়-মোয়া খাইয়েছে কিংবা কোলে বসিয়ে রূপকথা শুনিয়েছে, সেকথা ভেবে সুদামের মন মমতায় ভরে ওঠে না। এই সংসারে থেকেছ, যেটুকু করবার করেছ। তারপর মানে মানে, সময় থাকতে যদি চলে যেতে হলে সুদাম ডাক-চিৎকার ছেড়ে কাঁদত তোমার জন্যে, কাঁধে করে শ্মশানে নিয়ে যেত, এমনকী শ্রাদ্ধশান্তি করতেও তার আপত্তি হত না।
কিন্তু এ কী ব্যাপার?
বাপ-ঠাকুরদার আমলে যা ছিল, ছিল। কিন্তু সেসব দিন তো আর নেই। অবস্থা পড়ে গেছে। সামান্য যা জমিজমা আছে, তাতে ছ-মাসের খোরাকির টানও উঠে আসে না। তরিতরকারি বেচে, কখনো-বা আরও দু-চারটে খুটখাট কাজকর্ম করে কোনোমতে চালিয়ে দিতে হয়। আষাঢ়-শ্রাবণের দুটো মাস একবেলার বেশি খাওয়াই হয় না। সামনে আরও আকাল আসছে, চোখের সামনেই দেখা যাচ্ছে সেটা। তিন টাকা ছাড়িয়ে উঠেছে চালের কিলো, আর কটা দিন বাদে গাঁয়ের আরও অনেক বাড়ির মতো তাকেও হয়তো মধ্যে মধ্যে উপোস দিতে হবে।
এর ভেতরে একটা বাড়তি পেট। কোনো আয় দেয় না—শুধু বাজে খরচ। দিন-রাত, সকাল-সন্ধে ঘোর ভাঙলেই মুখে কেবল খাই খাই রব। সুদামের মাথার ভেতরে আগুন ধরে যায়। একটা ধূমাবতী এসে ঘরে ঢুকেছে। কখনো কখনো তার মনে হয় বাড়িসুদ্ধ সব মরে গিয়ে যখন শ্মশান হয়ে যাবে, পোড়া ভিটের ওপর গজিয়ে উঠবে সাপের জঙ্গল, দাওয়ায় গর্ত করে শেয়ালে বাসা বাঁধবে, তখনও সেই শেয়াকুল কাঁটা আর ধুতরো-আকন্দ-বুনো ওলের মাঝখানে ডাকিনীর মতো জিভ মেলে বসে থাকবে বুড়িটা। তার পাটের মতো চুলগুলোতে লাউডগা সাপ খেলে বেড়াবে আর সন্ধ্যার লালচে আকাশের দিকে চেয়ে সে ডাক ছাড়তে থাকবে— দে দে, আরও খাই, আরও খাই।
ভাবতে গিয়ে রক্ত হিম হয়ে আসে। সুদামের মনে হয় সব বুড়িটার জন্যে। তারা তো মোটামুটি সচ্ছল গেরস্তই ছিল, কেন এমনভাবে একটু একটু করে সব যাচ্ছে? কেন দু-বছর আগে অমন দুধল রাঙা গাইটাকে মা মনসায় কেটে দিলে? ধানগুলোর অমন সর্বনাশ হয়ে গেল কেন? যে-মাটিতে প্রতিবার কম করে একশো কুমড়ো ফলে সেখানে এ বছর বিশ পঁচিশটার বেশি হলই না!
আশ্চর্য, বুড়িটা মরেই না! বয়েস কত হল? সত্তর-পঁচাত্তর-আশি? কিংবা আরও বেশি, সুদাম জানে না। তুলসীই ঠিক বলেছিল, ওটা ভূশন্ডি কাগ। ওদের বয়েসও নেই, মরণও নেই।
আজ তিন মাস ধরে এই মতলবটা তার মাথায় এসেছে। তুলসীটা এমনিতে বুড়ির ওপর যতই গর্জাক কিছুতেই এতে সায় দেবে না, বরং নিজের ভাত ক-টা নিয়ে গিয়ে বুড়ির মুখে গুঁজে দিয়ে আসবে। তাজ্জব মেয়েদের মন, ভগবানও বুঝতে পারেন না!
কিন্তু সুদামের ধৈর্য শেষ হয়ে গেছে। আর চলে না, চলতেই পারে না।
সুযোগ এসেছে তিন মাস পরে। কাল ছেলে-মেয়ে নিয়ে তুলসী গেছে বোনের বাড়িতে, ফিরতে আগামীকাল সন্ধে। অতএব এই বেলাই…
বুড়ির তত দিনও নেই রাতও নেই। চোখে কিছু দেখতে পায় না, কানের কাছে মুখ নিয়ে চেঁচিয়ে না উঠলে শুনতেও পায় না। তাই সুদাম যখন তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিলে, তখন বুড়ি বিড়বিড় করে বললে, কে ও? জগৎ নাকি?
মা কালীই জানেন জগৎ মানুষটা কে! কোন কালে কোথায় বেঁচে ছিল, কবে মরে শেষ হয়ে গেছে। হয়তো বুড়ি এখন সেই লোকটাকে দেখছিল বসে বসে। না চেঁচিয়ে, বুড়ির কানের কাছে ঝাঁঝাঁ করে চাপাস্বরে সুদাম বললে, আমি সুদাম।
অ, সুদাম।
বুড়িকে তুলে নিয়ে উঠোন পেরিয়ে সুদাম এগোতে লাগল। একেবারে ওজন নেই গায়ে, পাখির মতো হালকা। জটাবাঁধা চুলগুলো সুদামের মুখে লাগছিল, একটা বিশ্রী দুর্গন্ধে গা গুলিয়ে যাচ্ছিল। নাকের পাশ দিয়ে পিপির করে কী উঠে যাচ্ছিল—নিশ্চয় বুড়ির চুল থেকে উকুন। অসম্ভব ঘেন্না করতে লাগল সুদামের। আশ্চর্য, এটাকে তুলসী নাওয়ায়-ধোয়ায় খাওয়ায় কী করে! মেয়েরা সব পারে, ওদের অসাধ্যি বলে কিছু নেই।
বুড়ি বিড়বিড় করে বললে, আমাকে কোথায় নিয়ে চললি সুদাম?
তুমি যে শিমুলতলির মন্দিরে যেতে চেয়েছিলে গো। তাই নিয়ে যাচ্ছি।
কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস বললি?
শিমুলতলির মন্দিরে।
আ–হা! বেঁচে থাক, বেঁচে থাক। বুড়ির জড়ানো অস্পষ্ট আওয়াজ যেন খুশিতে দুলে উঠল এক বার, আ–হা! কতদিন মাকে দশশন করিনি।
