তা-ও যদি পেটে রাখতে পারত।
ছেলেবেলায় একবার শখ করে একটা কোকিলের ছানা ধরে এনেছিল সুদাম। মনে মনে ভারি সাধ ছিল, ছানাটা বড়ো হবে, তারপর রাত-দিন কুহু-কুহু করে গান গেয়ে প্রাণ একেবারে মাতোয়ারা করে দেবে। হয়তো দিতও, কিন্তু বড়ো হওয়ার আগেই সে সুদামকে প্রায় পাগল করে দিলে। বাচ্চাটার খাঁই আর মেটে না। সব সময়ে ক্যাঁ-ক্যাঁ করে চিৎকার আর লাল টুকটুকে একটা হাঁ সে মেলেই রয়েছে। ছাতুর গুলি, ময়দার পিন্ডি সেই হাঁ-এর ভেতরে ছেড়ে দিতেই টপ করে গিলে ফেলা, তারপরেই আবার কান-ফাটানো চ্যাঁচানি। যেন বিশ্বসংসার গিলে ফেলেও তার খাঁই মিটবে না।
ঠিক একরকম। বুড়িটার সঙ্গে কোকিলের ছানার কোনো তফাত নেই।
মেঘের আড়াল থেকে এক টুকরো ভাঙা আর জবুথবু চাঁদ উঠবে উঠবে করছে, কিন্তু এখনও মুখ বার করতে পারছে না। মনমেজাজ ভালো থাকলে সুদাম বেশ রস দিয়ে বলতে পারত— ঘোমটার আড়াল থেকে নতুন বউ এক বার দেখে নিতে চাইছে। কিন্তু সামনে থেকে খাণ্ডার শাশুড়িটে আর নড়ে না। কিন্তু এখন আর রসিকতা করবার অবস্থা নয় তার। অত্যন্ত অস্বস্তির সঙ্গে সুদামের মনে হল আরও কিছুক্ষণ চারদিক এইরকম থমথমে অন্ধকারে তলিয়ে থাকুক, সারা আকাশটা মেঘে ঢেকে যাক। এই ডিঙিটাকে পৃথিবীর কেউ যেন এখন দেখতে না পায়, কেউ না।
ক্যানালের গেরিমাটি জল এই অন্ধকারে মেঠো শামুকের মতো রং ধরেছে। দু-ধারের ঝোপজঙ্গলে চাপবাঁধা অন্ধকারে ঝিকমিক করছে জোনাকি, এক-আধটা খড়ের ছাউনি কিংবা টিনের চালা ছায়া ছায়া হয়ে দেখা দিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে আবার। এরই ভেতরে কোথায় একটা ছোটো বাচ্চা ট্যাঁ-ট্যাঁ করে কেঁদে উঠল। সুদাম মনে মনে বললে, কাঁদো কাঁদো, এখন থেকেই গলায় জোর করে নাও। কান্নার এখুনি হয়েছে কী? দিন তো সামনে পড়েই রয়েছে।
এক টুকরো আলোও কোথাও জ্বলছে না। কার দায় পড়েছে এই মাঝরাত্তিরে একটা লণ্ঠন জ্বেলে বসে থাকতে? কেরোসিন পেতে যা ঝঞ্ঝাট আর যা তার দাম! কেবল ঝিলমিল করে জোনাকি জ্বলছে। ওদের কোনো ভাবনা নেই, পয়সা দিয়ে ওদের কেরোসিন কিনতে হয় না।
সুদাম এক বার আড়চোখে চেয়ে দেখল বুড়ির দিকে। মাথাটা হাঁটুর ভেতরে গুঁজে একটা ময়লা তামাকের পুঁটলির মতো বসে রয়েছে। না, ঘুমুচ্ছে না। সুদাম জানে বুড়িটা কখনো ঘুমোয় না। রাত-দিন-সন্ধ্যা-সকাল সব এখন একাকার হয়ে গেছে। যখন জেগে থাকে তখন থাকে; যখন জেগে থাকে না, তখনও সম্পূর্ণ ঘুমোয় না। ঘুম আর জাগার মাঝামাঝি একটা অদ্ভুত জায়গায় তার মন নানারকম ছবি দেখে। তিরিশ বছর আগে যে মরে গেছে সে এসে তার সামনে দাঁড়ায়। কোনকালে কোন সধবা স্বামী-পুত্রের সংসার রেখে চলে গিয়েছিল, তুলসীতলায় নামানো তার আলতা-রাঙানো পা দুখানা দেখতে পায় বুড়ি। কে যেন তাকে ডাক দিয়ে বলে, বাড়িতে দশসেরি রুই মাছ এয়েছে গো, ও নতুন বউ, কুটতে যাবে না? আর এইসব ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নের ভেতর তার খিদে পায়, যন্ত্রণায় তার পেটের নাড়ি ছিঁড়ে যেতে থাকে, ঘোর ভেঙে গিয়ে বুড়ি হঠাৎ বিকট গলায় গোঁ-গোঁ করে ওঠে; এবাড়িতে সব মরে-হেজে শেষ হয়ে গেল নাকি গো? আমাকে কেউ চাট্টিখানি খেতেও দেবে না?
রাগে ঝনঝন করে ওঠে সুদামের বউ তুলসী।
এবাড়ির সব মরে শেষ না হয়ে গেলে তোমার খাঁই মিটবে কী করে? তুমি যে যমের খিদে নিয়ে এসেছ। নিজে তো আর মরবে না, তিন যুগের ভূশন্ডি কাগ হয়ে বসে রয়েছ।
না, বুড়ি যে মরবে না এ ব্যাপারে সুদামও নিঃসন্দেহ হয়েছে। তারও তো একদিন ঘরসংসার সব ছিল; স্বামী, ছেলে-মেয়ে সব। কী করে যে মরে-হেজে একাকার হয়ে গেল, সুদাম তার খবর রাখে না। তার ছেলেবেলা থেকেই বুড়িকে এবাড়িতে সে দেখছে। সম্পর্কে তার মায়ের কীরকম যেন মাসি হয়, অনাথা দেখে তার মা এনে এখানে ঠাঁই দিয়েছিল। তখনই বুড়ির চুলে পাকধরা। তবু খাটাখাটনি করত, ধান সেদ্ধ করত, গোরু দেখত। তারপর সুদাম বড়ো হল, বিয়ে-থা করল, মা-বাপ চলে গেল। কিন্তু বুড়ি সেই যে ঠায় যক্ষী বুড়ির মতো বসে রয়েছে তার আর নড়বার নামটিও নেই। এবাড়ির ওপর দিয়ে এত বার যমের আনাগোনা ঘটে গেল, কিন্তু এর দিকে চেয়েও দেখল না একটি বার।
এখন না পারে চলতে-ফিরতে, না পারে উঠে দাঁড়াতে। বছর দুই আগেও পিঠটাকে সামনে ঝুঁকিয়ে একটা লাঠি নিয়ে এক-আধটু ঘুরে বেড়াত। এখন তা-ও পারে না। কখনো পিন্ডি পাকিয়ে বসে থাকে, কখনো কুকুরের মতো কুন্ডলী করে ঘুমোয়। না, ঘুমোয় না। ঘুম আর জাগার মাঝখানে একটা অদ্ভুতজগতে একরাশ ছায়ার মিছিল দেখে আর থেকে থেকে চমকে ওঠে— কে— কে ওখানে? আজ কি তোরা আমাকে একমুঠো খেতেও দিবিনে? অথচ একটু আগেই—হয়তো আধ ঘণ্টা আগেই তুলসী যে তাকে এক কাঁসি ভাত-তরকারি গিলিয়ে গেছে সে তার মনেও থাকে না।
শুধু তাই নয়। ভাঙা গলায় দাঁত-পড়ে-যাওয়া-মুখের জড়ানো আওয়াজে শাপমন্যিও দিতে থাকে, হে ভগবান! এদের এত আছে, তবু একমুঠো খেতে দেয় না আমাকে। তুমি এর বিচার কোরো।
জ্বলন্ত চোখে তুলসী বলে, শুনলে? শুনছ তো?
হুঁ।
তুমি আর কতটুকুন বাড়িতে থাক, রাতদিন ওই শাপশাপান্ত আমাকে শুনতে হয়। রাগে দুঃখে তুলসীর চোখে জল আসে, ছেলে-মেয়ের পেট মেরে সমানে খাওয়াই—এই তার প্রিতিদান।
