কিন্তু তার আগেই সাধুবাবা তার হাত চেপে ধরেছেন। বলেন, ভাবছ পরিহাস করছি–না? টাকা তোমার দিতে হবে না–সন্ন্যাসী আমি, টাকার কোনও প্রয়োজন নেই। এমনিই ওটা তোমায় দিয়ে দেব। বিশ্বাস হচ্ছে না? এসো আমার সঙ্গে।
মনে খটকা ছিলই, তবু পান্নালাল গুটি গুটি সাধুর সঙ্গে এগোল। খানিকদুর এগিয়ে একটা কানাগলির মধ্যে ঢুকল দুজনে। এইবারে পান্নালাল আরও ভয় পেয়ে গেল। এই নির্জন কানাগলিতে সাধু যদি গালে থাবড়া দিয়ে পকেটের টাকাকড়ি সব কেড়ে নেয়–তা হলে
সাধু বললেন, বৎস, মাভৈঃ, ওই দেখো আমার শিষ্য জনার্দন পাখি নিয়ে বসে আছে।
একটা রোয়াকের ওপর রোগা আর বেঁটে জনার্দন ছোট একটা বাঁশের খাঁচা কাপড়ে ঢেকে নিয়ে বসে আছে।
পান্নালাল সামনে যেতেই একমুখ দাঁত বের করে সে কাপড় তুলে খাঁচাটা দেখাল।
ওফ! সে কি পাখি একখানা! ময়ূরের পেখমের মতো সাতরঙা ল্যাজ-হলদে, সোনালি, কালো, বেগুনী কত রকমের রঙ। দেখে পান্নালাল একেবারে হাঁ।
সাধু মিটমিট করে হেসে বললে, দেখছ কী, বার্ড অফ প্যারাডাইজ। যাকে বলে, স্বর্গের পাখি। প্রশান্ত মহাসাগরের একটা নির্জন দ্বীপে থাকে; তোমাদের চিড়িয়াখানায় দুএকটা আছে বটে, কিন্তু এ-জিনিস তারা চোখেও দেখেনি।
জনার্দন ঝট করে খাঁচাটা ঢেকে ফেলেছে।
পানালাল বললে : আপনি কোথায় পেলেন?
সাধু হাসলেন : যোগবলে।
পান্নালাল তিনটে ঢোক গিললে, আপনি আমায় পাখিটা দেবেন?
–দেবই তো!
–দাম নেবেন না?
–এর দাম রাজা-মহারাজারাও দিতে পারেন না। তবে কালী করালবদনীর পুজোর জন্যে কিছু দিতে চাও-দাও। তোমার যা ইচ্ছে।
বার্ড অফ প্যারাডাইজের কথা মেজদার মুখে শুনেছে পান্নালাল। এই পাখি দেখলে-ওঃ, মেজদা তো নাচতে আরম্ভ করে দেবে। পান্নালাল তক্ষুনি খালি ট্রামভাড়া রেখে পঞ্চাশটা টাকা সাধুর দিকে এগিয়ে দিলে।
সাধু বললেন, টাকা আমি স্পর্শ করি না–জনার্দনকে দাও।
এর পরে আর অবিশ্বাসের কিছু থাকে? জনার্দনকে টাকাটা দিয়ে, সাধুকে পেন্নাম ঠুকে পান্নালাল খাঁচা নিয়ে ড্যাং ড্যাং করে চলে এল। জনার্দন খিকখিক করে হেসে বললে, খুব দাঁও মেরে নিলে খোকাবাবু-হেঁ-হেঁ-হেঁ।
.
গল্প শেষ করে পান্নালাল বললে, সেই পাখি লুকিয়ে রেখেছি দারোয়ানের ঘরে। ভজুলাল দেশে গেছে, ঘরটা খালিই আছে এখন। তুই আমার পরম বন্ধু, তোকেই আগে দেখাব। তারপর মেজদাকে চমক লাগিয়ে দেব, মেজদা বলে, আমি একটা ইডিয়ট। আমার মগজে নাকি কিছু নেই। আজ মগজটা দেখিয়ে দিচ্ছি। হুঁ–হুঁ।
পান্নালালের বাড়ির কাছাকাছি গেছি, দেখি ওর মেজদা একটা লোকের সঙ্গে কী যেন কথাবার্তা বলছে। দেখেই পান্নালাল থমকে গেল। বললে :প্যালা–কুক।
কী দেখব?
–ওই যে লোকটা মেজদার সঙ্গে কথা কইছে–দেখছিস? ওই ঝোল্লা মতন গোঁফ, মাথায় টাক? ওই তো আমাকে রং করা চড়ুই বেচতে চেয়েছিল? নিশ্চয়ই মেজদাকে ঠকাতে এসেছে। হারি আপ।
পান্নালাল প্রায় দৌড়ে মেজদার কাছে গিয়ে হাজির। আমিও
–মেজদা, ওর পাখি কিনো না। ভারি জোচ্চোর। ভীষণ ঠক। হাঁউমাউ করে চেঁচাতে লাগল পান্নালাল।
মেজদা আর সেই লোকটা একসঙ্গে চমকে উঠল।
-কী বলছিস আবোল-তাবোল? জোচ্চোর হবে কেন? এ তো রামলাল–বরাবর আমায় পাখি এনে দেয়।
রামলাল না ছাই। এই তো দুপুর বেলায় মুনিয়া পাখি বলে আমাকে রং করা চড়ুই গছাতে যাচ্ছিল। ভাগ্যিস সাধুবাবা ছিল, নইলে
মেজদা বললে–তাই নাকি রামলাল! লোক ঠকানো ব্যবসা ধরেছ নাকি আজকাল?
ঝোল্লা গোঁফ আর টাক নিয়ে তো লোকটা একেবারেই কাঁচুমাচু। হাত-টাত কচলে লোকটা বললে : নানা বাবু। না–মানে এই একটু ইয়ে মানে আপনার ভাই বোলে তো জানতুম না। কিন্তু রামলাল হঠাৎ যেন চমকে উঠল।–খোকাবাবু, তুমি বার্ড অফ প্যারাডাইজ কেনোনি তো?
এবার পান্নালাল তাক করে একটা লাফ মারলতু-তু-তুমি জানলে কী করে?
রামলাল একগাল হাসল। আমি জানব না? পাখি রংকরা বিদ্যের উনিই তো আমাদের গুরুদেব। অমনি করে সাধু সেজে খদ্দেরকে ভোলান–তারপর নিরিবিলিতে কোথাও নিয়ে গিয়ে পঁচিশ-ত্রিশ-পঞ্চাশ-একশোয় একটা রং করা কাক বিক্রি করে দেন। তার পিঠের সঙ্গে সরু কালো সুতো দিয়ে কয়েকটা ময়ূরের পালক বাঁধা থাকে আর গায়ে মাখানো খানিকটা লাল-হলদে-সোনালি রং। দুদিন পরেই রং উঠে যায়, ময়ূর পাখা ঝরে যায় ব্যস।
মেজদা বললে, কী সর্বনাশ! এ যে দারুণ জোচ্চোর। পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া উচিত।
রামলাল বললে, পুলিশে পাত্তা পেলে তো। গুরুজী আজ কলকাতায় থাকেন, কাল কাঠমাণ্ডু। সেখানে হয়তো কাউকে একটা শকুন দুশো টাকায় বেচে দিলেন।-বলবেন–এটা ফুজিয়ামার ঈগল।
-তা খোকাবাবু, গুরুজীর হাতে তো পড়েছিলে দেখেছি-ওইরকম একটা ফুজিয়ামার ঈগল কিংবা বার্ড অফ প্যারাডাইজ কিনে বসোনি তো? জানতুম না তুমি বাবুর ভাই, তা হলে তোমায়
পান্নালালের মুখের রং তখন বার্ড অফ প্যারাডাইজের মত ঘন ঘন বদলে যাচ্ছে। এবার সেটা কাকের মতো কালো হয়ে গেল।
পান্নালাল তখন ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠতে গিয়ে চ্যাঁ করে চেঁচিয়ে উঠল।–কক্ষনো না–আমায় কখনও ঠকাতে পারেনি। এত বোকা পেয়েছে নাকি আমায়? বলেই বাড়ির ভেতর টেনে দৌড়।
মেজদা আর রামলাল বোকার মতো হাঁ করে চেয়ে রইল। আমিও কি আর দাঁড়াই, বেচারা পান্নালাল-হাজার হোক, বন্ধু তো বটে।
বিসর্জন
এমন যদি হত, মুখ থুবড়ে পড়ে থাকত ঘরের এক কোনায়; যা সকলের জোটে তাই একমুঠো খেয়ে চুপচাপ দিন কাটিয়ে দিত, তা হলে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ততই লালচ বাড়ছে বুড়ির। এখন যেন রাক্ষসের খিদে এসে পেটে জমা হয়েছে ওর। একরাশ গিলল, ঝিম মেরে বসে রইল কিছুক্ষণ, তারপরেই আবার ভাঙা গলায় চ্যাঁচাতে লাগল, ওরে, আমায় খেতে দে রে, খিদেয় যে আমি মরে গেলুম।
