আমার সকল দেহের আকুল রবে
মন্ত্রহারা তোমার স্তবে
ডাইনে-বামে ছন্দ নামে
নব জনমের মাঝে–
তোমার বন্দনা মোর ভঙ্গীতে আজ
সঙ্গীতে বিরাজে–
চমৎকার নাচছে হিমানী। নাচের প্রতিটি ছন্দে, প্রতিটি মুদ্রায় তার সর্বাঙ্গ যেন দীপ্ত হয়ে উঠছে ঘনসারপ্পদিত্তেন দীপেন তমধংসিনা।
ওই নাচের তালে তালে, ওই প্রতিটি আভরণ ছুড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শকুন্তলার যেন নিজেকেও ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছড়িয়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করল—তোমার পায়ে মোর সাধনা মরে যেন লাজে!
শকুন্তলাদি! এইসময় আবার ডাকতে এল সন্ধ্যা।
সবসময়ে কেন বিরক্ত করিস বল তো? নাচটা দেখতে দে-না একটু। ক্রুদ্ধ শকুন্তলা তর্জন তুলল ফিসফিস করে।
বা রে! কানে কানে সন্ধ্যা বললে, খাবার আনা হয়নি যে এখনও। দশটা টাকা দাও শিগগির, একটু পরেই তো চলে যাবেন প্রেসিডেন্ট।
উঃ, জ্বালিয়ে মারলি।
হল থেকে বেরিয়ে আলোকিত করিডোরে এসে দাঁড়াল শকুন্তলা। ব্যাগ খুলল।
কিন্তু একী!
চাঁদার অবশিষ্ট অন্তত কুড়ি টাকা ছিল ব্যাগে, অন্তত আজ দুপুর পর্যন্তও ছিল। একটা টাকাও নেই সেখানে। শুধু মাঝখানে আনা আটেক খুচরো পয়সা পড়ে আছে। বাসে আসার সময় ব্যাগের এ পকেটটা সে দেখেনি, শুধু খুচরো থেকে বাসভাড়াটা বের করে দিয়েছিল খালি।
কোথায় গেল টাকা?
বেণু বোসের গান যেন একরাশ ঝিঝির ডাকের মধ্যে মিলিয়ে গেল। হলঘর, রবীন্দ্রনাথ, হিমানীর নাচের ছন্দ—এক মুহূর্তে তলিয়ে গেল। মনে হল কালো অন্ধকার থেকে বরানগরের বাসার পচা দুর্গন্ধটা তার চারপাশে পাক খেয়ে যাচ্ছে, কানে আসছে মাতালের কতগুলো অবোধ্য কুৎসিত চিৎকার।
খাবার, প্রেসিডেন্টের ট্যাক্সিভাড়া, খুচরো খরচ…
অজিত। দুপুর বেলা এক বার চোরের মত এদিক-ওদিক তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। শকুন্তলা তখন খেতে বসেছে। হ্যাঁ, অজিত—সন্দেহমাত্র নেই। দাদা যদি জুয়ো খেলে মদ খেয়ে বাড়ি ফিরতে পারে, বাবা যদি সেই ক্লেদাক্ত নোটগুলোকে অমন লোলুপ হয়ে কুড়িয়ে নিতে পারেন, তাহলে তাহলে অজিতের কী দোষ?
কিন্তু কী বলবে শকুন্তলা? কী কৈফিয়ত দেবে? কোন লজ্জায় বলবে চাঁদার টাকা তার নিজেরই ভাই…
বাবা-দাদা-অজিত! কেউ বাদ নেই—কেউ না। সবাই যখন পঙ্কের মধ্যে ডুবে গেছে, তখন সে কেমন করে দাঁড়িয়ে থাকবে একটা শুকনো ডাঙার ওপরে? সেও চোর, ও-টাকা সে-ই চুরি করেছে।
মাথার মধ্যে রক্ত ঘুরতে লাগল, আগুন জ্বলতে লাগল সারা শরীরে। যেন দুটো চোখ অন্ধ হয়ে গেল শকুন্তলার। যেন মৃত্যুর একটা পিছল সিঁড়ি হাতড়ে হাতড়ে অন্ধের মতো সে নেমে চলল পাতালের দিকে।
কমন রুমে একা এসে দাঁড়াল শকুন্তলা। কেউ কোথাও নেই। শূন্য ঘরে একটা আলো জ্বলছে, আর গোল বড়ো টেবিলটার ওপর পড়ে আছে একখানি সঞ্চয়িতা, কয়েকটা শাড়ি-জামা, জোড়া তিনেক চশমা, গোটা দুই রিস্টওয়াচ আর লাল-সাদা-সবুজ-খয়েরি একরাশ মেয়েদের ব্যাগ।
না, কোথাও কেউ নেই। হিমানীর নাচ দেখতে সবাই উইংসের ধারে ভিড় জমিয়েছে, এমনকী আরাধনাদিও। এক মুহূর্ত আর অপেক্ষা করল না শকুন্তলা। চকিতের মধ্যে তুলে নিলে পাইথন লেদারের একটা সৌখিন ব্যাগ। জিনিসটা চেনা-বেণু বোসের। লাখপতির মেয়ে বেণু বোস, তিন রকমের মোটরে চড়ে কলেজে আসে। তার ব্যাগে কুড়িটা টাকা হাত দিলেই তুলে নেওয়া যাবে, বেণু হয়তো কোনোদিন টেরও পাবে না।
অনুমান ভুল হল না। মেয়েলি প্রসাধনের সুগন্ধিভরা ব্যাগটার ভেতর থেকে দুখানা সুরভিত নোট বের করে নিয়ে সেটা যথাস্থানে নামিয়ে রাখল শকুন্তলা। হাত কাঁপল না, পা কাঁপল না এক বার। তারপর তেমনিভাবেই বেরিয়ে এল কমন রুম থেকে।
ছায়াবাজির মতো কখন অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। ডক্টর দত্ত অনেকক্ষণ ধরে অনেক কথা বলে গেলেন। তার একটা শব্দও ভালো করে বুঝতে পারল না শকুন্তলা, একটা কথার অর্থবোধ করতে পারল না। শুধু নোট দুটোর উগ্র সুগন্ধ তার মস্তিষ্কের ভেতর বিধতে লাগল একরাশ কাঁটার মতো।
দুধের মতো শুভ্র সন্দেশ—পরিপাটি খাবার। চুরির একবিন্দু ময়লা তাতে লাগেনি। তবু এক টুকরো সন্দেশ ভেঙে মুখে দিয়েই উঠে দাঁড়ালেন সভাপতি।
বুকের মধ্যে রক্ত ছলাৎ করে ভেঙে পড়ল শকুন্তলার। গন্ধ পেয়েছেন না কি! চুরি করা নোটের গন্ধ।
সভাপতি বললেন, চমৎকার অনুষ্ঠান হয়েছে, ভারি আনন্দ পেলাম। আসি তা হলে নমস্কার।
আর এক বার, আর এক বার চোরের মতো ফিরে এল শকুন্তলা। ফিরে এল হলঘরে। কেউ নেই। বেণু বোসের মোটর কখন চলে গেছে, মেয়েরা এতক্ষণে পৌঁছে গেছে যে-যার বাড়িতে। শুধু তারই যাওয়া হয়নি এখনও, অর্ধেক পথ থেকে ফিরে এসেছে।
শূন্য হলঘরে এখনও আলো জ্বলছে, বেয়ারারা চাবি বন্ধ করে যায়নি। বেদির ওপর রবীন্দ্রনাথের মালা-চন্দনভূষিত চিত্রমূর্তি। একটা ধূপকাঠির শেষ প্রান্তটুকু তখনও জ্বলছে, একটা প্রদীপের বুক জ্বলছে তখনও।
কান্নার বেগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে শকুন্তলা ছবির সামনে লুটিয়ে পড়ল।
তুমি দেবতা, তুমি মহাকবি। মানুষের প্রেমে তোমার চোখের জল ঢেলে পৃথিবীকে তুমি ধন্য করে গেছ। তুমিই বলো আমার কতখানি অপরাধ? বাবা-দাদা-অজিত-আমি আজ তোমার মৃত্যুতিথিতেও কেন এমন করে পাপের অন্ধকারে তলিয়ে চলেছি? তুমিই তার জবাব দাও।
বার্ড অব প্যারাডাইজ
পান্নালাল আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললে, বুঝলি প্যালা, দারুণ পাখি জোগাড় করেছি একখানা; যাকে বলে-রামপাখি।
