অজিত! আর এক বার তেমনি অস্বাভাবিক তীব্র স্বরে শকুন্তলা বিস্ফোরিত হয়ে পড়ল।
কিন্তু অজিত সাড়া দেওয়ার আগেই নাড়া খেল দরজার কড়া। ঝনঝন করে একেবারে ভেঙে ফেলতে চাইল ক্ষয়ে-যাওয়া দরজাটাকে।
এত রাতে বাড়িতে ডাকাত পড়ল নাকি? বাবা খনখন করে উঠলেন।
বড়দা এসেছে। ছুটে দরজা খুলতে গেল শান্তি। হুড়কোর আওয়াজ এল, আওয়াজ এল পাল্লা দুটোকে সজোরে আছড়ে ফেলার; এল ধপ ধপ করে কয়েকটা জুতোর অসংলগ্ন ভারী ভারী শব্দ, তারপরেই কুয়োতলার বালতিটাকে নিয়ে সবেগে কেউ উঠোনের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল।
ও মা গো! শান্তির আর্তনাদ বাজল পাড়া কাঁপিয়ে। ছুটে বেরুল শকুন্তলা, খোঁড়া পা নিয়ে টলতে টলতে বেরুলেন বাবা।
দুটো লণ্ঠনের আলোয় স্পষ্ট দেখা গেল উঠোনের ওপরে লম্বা হয়ে পড়েছে রণজিৎ। বমি করে ভাসিয়ে দিচ্ছে সব। মদ আর একরাশ অজীর্ণ খাদ্যের টুকরোর অল্প গন্ধে আবিল হয়ে গেছে চারদিক।
রণজিৎ! রণজিৎ! কী হল? কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে আসতে লাগলেন বাবা।
কিছু হয়নি দাদার। নীচের ঠোঁটটাকে কামড়ে ধরে রক্তাক্ত করে দিতে চাইল শকুন্তলা, দাদা মদ খেয়েছে!
মদ! বাবা দু-পা পিছিয়ে গেলেন, তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন, হারামজাদা! শুয়োর…
রণজিৎ আস্তে আস্তে মাথা তুলল খানিকটা, জড়িয়ে জড়িয়ে বললে, খামোখা চ্যাঁচাচ্ছ। কেন? মদ খাই, জুয়া খেলি—যা খুশি করি, তোমাদের টাকা তো এনে দিয়েছি! অনিশ্চিত হাতে বুকপকেটের ভেতর থেকে কী কতকগুলো টেনে বার করে সে হাওয়ায় উড়িয়ে দিল, তারপর আবার নিজের বমির ওপরেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।
টাকা! ক্ষুধার্ত জন্তুর মতো উচ্চারণ করলেন বাবা।
টাকাই বটে। একরাশ দশ টাকার নোট কাগজের মতো উড়ে বেড়াচ্ছে উঠোনময়। বাবার কোটরে-বসা অদৃশ্য চোখ দুটো জ্বলে উঠল দুখানা নতুন সিকির মতো। আর এক বার বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন, হারামজাদা! শুয়োরের বাচ্চা! তারপর না, তারপর স্বপ্ন দেখল না শকুন্তলা, বেতো শরীরে প্রাণপণে নত হয়ে উঠোন থেকে নোটগুলো থাবা দিয়ে তুলে নিচ্ছেন বাবা, লণ্ঠনের আলোয় তাঁর পাকা চুলগুলো রুপোর তারের মত ঝকঝক করছে।
খিক খিক করে অশ্লীল হাসির আওয়াজ এল একটা। পাথরের মূর্তি শকুন্তলা যেন হাতুড়ির ঘা খেয়ে নিজের চেতনাটা কুড়িয়ে পেল।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে অজিত হাসছে।
আমি তখনি বলেছিলাম…
কুয়োতলা থেকে আধখানা ইট কুড়িয়ে অজিতের দিকে ছুড়ে মারল শকুন্তলা। লাগল না, পুরোনো দেওয়াল থেকে একরাশ চুন-বালিই ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল শুধু। এক লাফে ঘরের মধ্যে অদৃশ্য হল অজিত।
সনাতনম এনম আহুর…
বেদমন্ত্র পড়ছে সুনেত্রা গোস্বামী, গম্ভীর মন্ত্রধ্বনিতে সমস্ত সভাটা আচ্ছন্ন হয়ে আছে। চন্দন, ফুল আর ধূপের গন্ধে পূজামন্ডপের পবিত্রতা আকীর্ণ হয়ে গেছে। বড় ফোটোখানার ভেতরে যেন প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের। যেন বেদমন্ত্রের প্রতিটি উদাত্ত অনুদাত্তের আহ্বান একটু একটু করে জ্যোতির্বলয় বিকীর্ণ করে দিচ্ছে তাঁর চারদিকে।
চোখ বুজে বসে আছেন সভাপতি, চোখ বুজে বসে আছেন সভার সকলে। এমনকী সবিতার দলও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেছে। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল শকুন্তলা। বরানগরের বাসা মুছে গেছে, মুছে গেছে কাল রাত্রির সমস্ত দুঃস্বপ্ন; ধুয়ে নির্মল হয়ে গেছে বিনিদ্র প্রহরগুলির সেই পঙ্কন! রবীন্দ্রনাথের দুটি উজ্জ্বল স্নিগ্ধ চোখ থেকে যেন করুণার অমৃতধারা এনে ধন্য করে দিচ্ছে তাকে। শকুন্তলার মনে হতে লাগল ওই গন্ধধূপের ধোঁয়ার মতো তার সমস্ত অস্তিত্বও অমনি বায়বীয় হয়ে যাক, মিলিয়ে যাক জীবনের যা-কিছু ভার আর যত কিছু তুচ্ছতা। অমনি শূন্যময় হয়ে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবমূর্তির পায়ে সে নিঃশেষিত করে দিক তার নিবেদিত প্রণাম।
শকুন্তলাদি। মাধবী এসে স্পর্শ করল তাকে।
বিরক্ত হয়ে শকুন্তলা ফিরে তাকাল।
কী হল আবার?
এক বার মেক-আপ রুমে এসো। ওরা ডাকছে।
আঃ, একটা মুহূর্ত এরা শান্তি দেবে না! শকুন্তলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, চল।
কমন রুমেই মেক-আপ চলছে। ফুলের গয়না সর্বাঙ্গে পরে শ্রীমতীর ভূমিকায় তৈরি হয়েছে হিমানী গুপ্ত। সুন্দরী মেয়েটিকে অপরূপ লাগছে দেখতে। মুগ্ধ হয়ে গেল শকুন্তলা।
বাঃ! বেশ হয়েছে।
কর্ণ-কুন্তী সংবাদের কর্ণ ইরা। নাকের নীচে ক্রেপের গোঁফটা চেপে ধরে হেসে অস্থির হয়ে উঠল।
এই, আমাকে দেখছিস না? কেমন গোঁফটা লাগিয়েছি বল তো? একেবারে মহাবীর কর্ণ বলে মনে হচ্ছে না?
চুপ চুপ, শুনতে পাবে ওখানে।
সুপারিন্টেন্টে আরাধনাদি মেক-আপের চার্জে। অমন ভারিক্কি মানুষ প্রসন্ন হাসিতে মুখ আলো করে বললেন, কেমন শকুন্তলা, ঠিক হয়েছে সব?
চমৎকার হয়েছে!
ইরা আবার ফিরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর মুখভঙ্গি করে দেখতে লাগল ক্রেপের গোঁফটায় তাকে কেমন মানিয়েছে।
একটু হেসে শকুন্তলা হলঘরে ফিরে এল।
একটার পর একটা প্রোগ্রাম হয়ে চলল স্টেজের ওপর। চমৎকার উতরে যাচ্ছে সবগুলো। সবিতার দলের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না একটুও। অসীম আত্মপ্রসাদে আর গভীর তৃপ্তিতে দেওয়ালের কোণে নিজের জায়গাটুকুতে দাঁড়িয়ে রইল শকুন্তলা। তার প্রবন্ধটা পড়া হয়ে গেছে সকলের আগেই–সভাপতি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, সাধু সাধু। প্রিন্সিপাল তার দিকে সস্নেহ-চোখে তাকিয়েছিলেন, এমনকী সি সি বি পর্যন্ত বলেছেন চমৎকার। কোথাও আর ক্ষোভ নেই শকুন্তলার, এতটুকু গ্লানি অবশিষ্ট নেই কোনোখানে। বরানগরের বাসা অনেক দূরে পড়ে থাকুক, আপাতত নিজের মধ্যে সে চরিতার্থ হয়ে গেছে। হলের আলো নিবিয়ে অন্ধকার করে দেওয়া হয়েছে, লাল-নীল-হলুদ-সবুজ ফোকাসের সঙ্গে স্টেজের ওপর নাচ শুরু হয়েছে হিমানীর। নেপথ্য থেকে মৃদু অর্কেস্ট্রার সঙ্গে বেণু বোসের মধুক্ষরা গলা মাইকের মধ্য দিয়ে নিঝরিত হয়ে পড়ছে :
