ম্যাগাজিনের এডিটার করে দেওয়া ইরারই কীর্তি। এই দুঃসময়ে সে-ই সঙ্গে সঙ্গে আছে বিশ্বস্ত সেনাপতির মতো। বলতে গেলে ডক্টর দত্তকে ধমকে রাজি করিয়েছে একরকম।
ডক্টর দত্ত জানিয়েছিলেন, ওইদিন তাঁর একটা আর্ট কনফারেন্স আছে।
শুনেই হাত-পা নেড়ে বক্তৃতা জুড়ে দিয়েছিল ইরা।
রবীন্দ্রনাথ নিয়ে ওয়ার্ক করেছেন আপনি, একজন এডুকেশনিস্টও বটে। স্টুডেন্টদের এটুকু দাবিও যদি আপনারা মেনে নিতে না পারেন তা হলে কোথায় আমরা যাব বলুন তো?
এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চাইতে সভাপতি হওয়াটাই সহজ বলে মনে হয়েছে ডক্টর দত্তের। হেসে বলেছেন, আচ্ছা, এক ঘণ্টা স্পেয়ার করতে পারি আমি।
ওতেই যথেষ্ট হবে। আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চলে এসেছে ওরা। পথে বেরিয়ে ইরা বলেছে, এক ঘণ্টা! ফাংশন হতেই দেড় ঘণ্টা, তার পরে তো প্রেসিডেন্টের অ্যাড্রেস! দু ঘণ্টার আগে পালান কী করে দেখব।
কিন্তু থেকে থেকে ক্লান্ত লাগে শকুন্তলার। এখানে উৎসাহ, আয়োজন, চঞ্চলতা—আর একটা পৃথিবী। এখানে গন্ধধূপ জ্বলবে, রবীন্দ্রনাথের আলোকমূর্তির গলায় দুলবে ফুলের মালা, একটা স্বপ্নিল নীলিম আলোয় ভরে যাবে ঘর, তানপুরার ব্যথিত মূৰ্ছনার সঙ্গে বেণু বোসের ভাবগম্ভীর মধুমতী গলায় গান উঠবে–সমুখে শান্তি পারাবার। চারদিকে অনুভব করা যাবে কবিগুরুর শুচিস্মিত আবির্ভাব। সমস্ত মন এক মুহূর্তে দেওয়ালের আড়াল ভেঙে বেরিয়ে যাবে, পৌঁছুবে সেখানে—শান্তি-সাগরের তরঙ্গ দোলায় দোলায় যেখানে একটি শ্বেতপদ্ম বিকশিত হয়ে উঠছে আর তার ওপরে ধ্যানাসীন হয়ে আছে সুন্দরের জ্যোতি স্বরূপ।
বাইশে শ্রাবণ!
আর সেদিন বরানগরের একতলা ইট-বের-করা বাড়িতে নতুন একটা কুকীর্তির কাহিনি শোনা যাবে অজিতের। আরও কুশ্রী গলায় অবিশ্রাম গালাগালি দিয়ে যাবেন বাতে পঙ্গু অক্ষম বাবা। কাশির ধমকে হৃৎপিন্ডটা ছিঁড়ে যেতে চাইবে টুনুর, গোগ্রাসে গিলে একশো পঁচিশ টাকায় চাকরিতে ছুটবে বড়দা, মুখের ভাত চোখের জলে ভেসে যাবে শান্তির।
পিছন থেকে ইরা বলল, এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? চল দেখে আসি কেমন তৈরি হয়েছে হিমানীর নাচটা।
ক্ষমোহে ক্ষমো—নমো হে নমো-রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে একটা আকুল আর্তি যেন বুকের ভেতর থেকে বিদীর্ণ হয়ে বেরিয়ে আসতে চায় শকুন্তলার। ক্ষমা করো কবিগুরু, ক্ষমা করো আমাকে। তোমার কিনু গোয়ালার গলিতেই বাসা বেঁধেছি, কিন্তু এখনও তো বাঁশির ডাক শুনতে পেলাম না!
ঘুমের মধ্যে টুনু থেকে থেকে কেশে উঠছে। রাত্রেই বাড়ে উপদ্রবটা। সারারাত কী অসহ্য কষ্টেই যে কাটে মেয়েটার। তবু আজ দশ দিনের মধ্যে কোথা থেকে দাদার বিনা পয়সার চেয়ে আনা কয়েক পুরিয়া হোমিয়োপ্যাথি ছাড়া আর কোনো ওষুধই পড়ল না। কালকের হাঙ্গামাটা চুকিয়ে ফেলতে পারলে যেমন করে হোক নিজেই একটা ব্যবস্থা করে ফেলবে শকুন্তলা।
সন্ধে বেলা বাবার কাছে ঘা-কয়েক খড়মপেটা খেয়েছে অজিত। ঘণ্টা খানেক হাউমাউ করে, ভাতের প্রতি অসহযোগ জানিয়ে একটা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে। ওর জন্যে ভাবনা নেই, বড়দা এসে কান ধরে টান দিলেই সুড়সুড় করে খেতে বসবে। বাবা ওঘরে এখনও ঘুমোননি, গজগজ করে অশ্রান্ত কণ্ঠে গালাগাল দিয়ে চলেছেন। পৃথিবীর কাউকে, কোনো কিছুকে একবিন্দু ক্ষমা নেই তাঁর। বাবার গালাগালিগুলো আজকাল আর কান পেতে শোনারও দরকার হয় না, একেবারে মুখস্থ হয়ে গেছে সমস্ত।
কিন্তু এখনও কেন ফিরছে না দাদা? রাত তো দশটার কাছাকাছি।
প্রবন্ধটা শেষ করে ক্লান্তির একটা হাই তুলল শকুন্তলা। মন্দ দাঁড়ায়নি, লিখে নিজেরই তৃপ্তিবোধ হচ্ছে। অনেক খুঁজে খুঁজে উদ্ধৃতি দিয়েছে ইংরেজ কবিদের। রবীন্দ্রনাথের কল্পনায় মৃত্যুর স্বরূপ ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে নিজেই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠেছে বার বার। কলমের মুখে সমস্ত আবেগ ঢেলে দিয়ে লিখেছে, মনের অন্ধকার খনির ভেতর থেকে এক-একটা জ্বলজ্বলে হিরার খন্ডের মতো চুনে চুনে এনেছে শব্দ। লিটারারি সোসাইটির সেক্রেটারির অযোগ্য হয়নি লেখাটা।
শিল্পগুলো পর পর সাজাতে সাজাতে শকুন্তলা শান্তির দিকে তাকাল। লণ্ঠনের এপাশে উবু হয়ে বসে ঘুমে জড়োজড়ো চোখে শ্লেটের ওপর প্রশ্নের অঙ্ক কষছে শান্তি।
শকুন্তলা বললে, শুয়ে পড় শান্তি। আর অঙ্ক কষতে হবে না এখন।
থাক, বড়দা আসুক।
কখন আসবে তার তো ঠিক নেই। তুই শো গে যা।
ঘুম-ভরা চোখ দুটোকে দু-হাতের পিঠে ডলে নিয়ে শান্তি সোজা হয়ে বসল।
বড়দা আজকাল বড় রাত করে ফেরেনা দিদি?
হুঁ। অফিসের পরে কী-একটা ব্যাবসার কাজে ছুটোছুটি করে, তাইতেই রাত হয়।
ও। শান্তি চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। কিন্তু ছোড়দা বলছিল… কথাটা শেষ করার আগেই সে থেমে গেল।
কী বলছিল অজিত? একটা আকস্মিক সন্দেহে মুহূর্তের মধ্যে শকুন্তলা সংকীর্ণ হয়ে উঠল।
ভীত ম্লান মুখে শান্তি বললে, শুনলে রাগ করবে তুমি।
রাগ করব না, বল।
ছোড়দা বলছিল একটা ঢোঁক গিলল শান্তি, বড়দার ব্যাবসা না হাতি। ছোড়দা নাকি নিজের চোখে দেখেছে আলমবাজারের কী-একটা আড্ডায় বড়দা সন্ধের পর জুয়ো খেলে,
মদও…
অজিত! প্রেতিনির মতো তীক্ষ্ণ গলায় প্রায় ককিয়ে উঠল শকুন্তলা। অজিত সাড়া দিলে না, নড়ল না পর্যন্ত; যেন মড়ার মতো অঘোর ঘুমে মগ্ন।
