দিদি, খাবি আয়। শান্তি ডাকল।
না, আর বসিয়ে রাখা উচিত নয় বাচ্চাটাকে। বেলা একটা পার হয়ে গেছে। শান্তির শীর্ণ ক্ষুধিত মুখোনা দৃষ্টির সামনে ভেসে উঠল।
সকালে শকুন্তলার কলেজ পড়াতে এই বাচ্চা মেয়েটার ওপরেই রান্নাবান্নার ভার। ন-টায় বড়দার অফিসের ভাত দিয়ে, দশটার মধ্যে বাবাকে খেতে দিতে হয়। বুড়ো মানুষ বাবা আজকাল একেবারে খিদে সইতে পারেন না। তারপর অজিত আর সে খেয়ে নিয়ে ছোটে ইশকুলে। শকুন্তলার খাবার ঢাকা দেওয়াই থাকে। টুনু কোনো কোনো দিন বাবার সঙ্গে খেয়ে নেয়, কোনো দিন-বা দিদির জন্যে অপেক্ষা করে।
অতটুকু মেয়ের ওপর বডড বেশি চাপ পড়ে সকালে। অবশ্য দুপুর থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত জোয়ালটা শকুন্তলাই কাঁধে তুলে নেয়। তবুও… কিন্তু উপায় নেই, কী করা যায়!
রান্নাঘরে এল শকুন্তলা। দুজনের ভাত বেড়ে নিয়ে ক্ষুধিত কাতর মুখে অপেক্ষা করছে শান্তি।
খেতে বসে শকুন্তলা জিজ্ঞেস করলে, টুনু খায়নি?
অনেকক্ষণ। ছোড়দা সেই এগারোটার সময় কোথায় চলে গেল। বাবা বারণ করলেন, শুনল না। বললে, কোন এক বন্ধুর বাড়িতে পড়তে যাচ্ছে।
হুঁ! শকুন্তলা চুপ করে রইল। সকালের কড়কড়ে শুকনো ভাতগুলো যেন আটকে যাচ্ছে তালুতে।
হাতের ভেতর কতগুলো ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল শান্তি, তারপর চুপি চুপি বললে, ছোড়দা বোধ হয় আজকাল পয়সা চুরি করে দিদি!
গেলাসের গায়ে হাতটা শক্ত হয়ে আটকে গেল শকুন্তলার, তাই নাকি?
সকালে বড়দা খুব হইচই করছিল। পকেটে নাকি ছ-আনা খুচরো ছিল, পাওয়া যাচ্ছে না।
স্বাভাবিক–খুব স্বাভাবিক। এই অন্ধকূপে, এই হীনতার ভেতরে এ ছাড়া কী আর করতে পারত অজিত? নিজের চোখেই তাকে দেখেছে কতগুলো বখাটে রকবাজ ছেলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানতে।
হুঁ! এবারও সংক্ষিপ্ত জবাব দিলে শকুন্তলা।
আর একটা কী বলি বলি করে কিছুক্ষণ দ্বিধা করলে শান্তি। তারপর ছোড়দা খুব খারাপ হয়ে গেছে দিদি!
শকুন্তলা চোখ তুলে তাকাল।
ক্লাস এইটের লীলা বলছিল, ছোড়দা নাকি কাল ওদের দেওয়ালে একটা চক দিয়ে কীসব যাচ্ছেতাই কথা…
চুপ কর। আচমকা সমস্ত জ্বালা দিয়ে শকুন্তলা নির্দোষ শান্তির ওপরেই অসহ্য ক্রোধে বিদীর্ণ হয়ে পড়ল। অত কথায় তোর কাজ কী? কাল যে তোদের পরীক্ষার প্রোগ্রেস রিপোর্ট দেওয়ার কথা ছিল—দেয়নি?
শান্তি পাথর হয়ে গেল। যে-গ্রাসটা মুখে তুলতে যাচ্ছিল, নামিয়ে ফেলল থালার ওপর।
জবাব দিচ্ছিস না যে? দেয়নি প্রোগ্রেস রিপোর্ট?
দিয়েছে। ফিসফিসে গলায় শান্তি জবাব দিলে।
কোথায় সেটা?
অঙ্কে আর ইংরেজিতে ফেল করেছি দিদি। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল শান্তি। সারাদিনের ক্লান্ত অভুক্ত মেয়েটার বেড়ে-নেওয়া ভাতের ওপর টপ টপ করে পড়তে লাগল চোখের জল।
নিজের এই নিষ্ঠুরতায় বুকের ভেতরটা যেন মুচড়ে ছিঁড়ে গেল শকুন্তলার। চারদিকের আঘাত খেয়ে খেয়ে প্রতিঘাত তো দিতেই হবে একজনকে। এমন একজন—যে তার চাইতেও দুর্বল, তার চাইতেও অসহায়। শান্তি!
থালা ছেড়ে উঠে গেল শকুন্তলা।
কিন্তু সাত দিন পরে বাইশে শ্রাবণ। বাবা আর টুনু ঘুম থেকে ওঠার আগে, দাদা অফিস থেকে ফেরার আগে, অজিতের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে পর্যন্ত তার হাতে কিছুক্ষণ সময় আছে। রবীন্দ্র-কাব্যে মৃত্যুকল্পনা প্রবন্ধটা তাকে আরম্ভ করে দিতেই হবে, লিটারারি সোসাইটির সেক্রেটারির মান থাকবে না তা নইলে।
ততক্ষণ চোখের জল শান্তিরই পড়তে থাকুক।
শেষপর্যন্ত ডক্টর তুষার দত্তকেই রাজি করানো গেল।
সবিতার দল ইতিমধ্যেই কী করে খবর পেয়েছে সভাপতি জোটেনি। চারদিকে দস্তুরমতো প্রোপাগাণ্ডা জুড়ে দিয়েছিল তাই নিয়ে। হঠাৎ খবরটা পেয়ে দমে গেল তারা।
আশেপাশে আরাধনাদি কোথাও আছেন কি না ভালো করে দেখে নিয়ে আর এক বার কোমর বেঁধে কমন রুমের টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে গেল ইরা।
দেখো আসছে পঁচিশে বৈশাখে কী করি! একজন দুজন নয়, তিন-তিন জন সভাপতি নিয়ে আসব, প্রেসিডিয়াম করে তুলব একেবারে। সেইসঙ্গে দুজন প্রধান অতিথি।
তখন তো কলেজ বন্ধ থাকবে। একজন ভুল শুধরে দিলে।
একবার থতমত খেয়েই ইরা নিজেকে সামলে নিলে। থাকলেই-বা কলেজ বন্ধ। তোমরা তো আর ঘরে বন্ধ থাকবে না। এদিকে দিনরাত রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ কর, অথচ ছুটির দিনে একটা ফাংশন করতে গেলে সব ভক্তি উবে যাবে বুঝি?
সবিতার দল থেকে একজন টিপ্পনী কাটল, আচ্ছা, দেখা যাবে সামারের ছুটিতে তোমার চুলের ডগাটুকুও দেখতে পাওয়া যায় কি না? নিজেও তো ঊর্ধ্বশ্বাসে সিমলা পাহাড়ে মামারবাড়িতে ছোট!
ইরা আবার ঝগড়া বাঁধাতে যাচ্ছিল, শকুন্তলা এসে পড়ল মাঝখানে।
চুপ কর ইরা। ওসব বাজে তর্ক করে লাভ নেই। চল, প্রিন্সিপালের সঙ্গে এক বার কথা বলে আসি। আর তিন দিন বাদে তো ফাংশন। অন্তত দুটো দিন লাস্ট পিরিয়ডটা আমাদের অফ করে না দিলে ভারি অসুবিধা হচ্ছে নাচ আর গানের রিহার্সালে।
সত্যি, কাজের আর অন্ত নেই। যেটুকু সময় কলেজে থাকে যেন নিশ্বাস ফেলারও সময় পায় না শকুন্তলা। মেয়েরা সব যেন কী! পান থেকে চুনটি খসলে অভিমান করে বসে। হিমানী বশ মানে তো শিখার রাগ পড়ে না, বেণুকে যদি-বা বুঝিয়ে ঠাণ্ডা করা গেল তো মুক্তিকে ডেকে পাওয়া যায় না। মুখরা আর প্রখরা ইরা সঙ্গে না থাকলে শকুন্তলার সাধ্যও ছিল না এদের সামলে রাখা। জোর করে তাকে লিটারারি সেক্রেটারি আর কলেজ
