চলতে চলতে হঠাৎ থমকে থেমে পড়ল একসময়। অজিত নয়?
সন্দেহ কী, অজিতই বটে। আরও তিন-চারটি ছেলের সঙ্গে একটা পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গুলতানি করছে, কী-একটা কথার ওপর অশ্লীলভাবে হাসছে হি-হি করে।
ঠিক সেই সময়ে চোখ তুলতেই অজিতও দেখতে পেল দিদিকে। চট করে হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা ফেলে দিল মাটিতে, নক্ষত্রবেগে অদৃশ্য হল পাশের একটা ছোট্ট গলির ভেতরে।
অজিতের সঙ্গীরা শকুন্তলাকে চেনে না, বুঝতেও পারল না কিছু। তারা সমস্বরে কোলাহল তুলে ডাকতে লাগল— পালালি কেন? এই শালা, এই অজিত, আরে শোন-না শালা…
শালাকে উচ্চারণ করল শ্লা।
রাস্তার মধ্যে কিছুক্ষণ শকুন্তলা পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বারো বছরের ছেলে অজিত এর মধ্যেই এই স্তরে নেমেছে! যে-অজিত সেদিন পর্যন্ত তার কোলের কাছে শুয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে রূপকথা শুনত, গ্রামের স্কুলে শুধু পড়াশুনোয় নয়—স্বভাব-চরিত্রেও ছিল ফার্স্ট বয়, শহরের কলেজ থেকে ছুটিতে বাড়ি ফিরলে দিদি কই মাছ ভালোবাসে বলে ছিপ নিয়ে ধ্যানে বসত পুকুরে, এ সেই অজিত! শুধু সিগারেট ধরেছে তা-ই নয়, যাদের সঙ্গে মিশেছে তারা সময়ে-অসময়ে শকুন্তলার দিকেও লক্ষ করে শিস টানে।
শুধু মাথার ওপরে সূর্যের জ্বালাই নয়, পায়ের তলাতেও যেন একটা আগুনের নদী পার হয়ে শকুন্তলা বাড়ি ফিরল। নাড়া দিলে কিনু গোয়ালার গলির ফাটধরা দরজার ক্ষয়ে-যাওয়া কড়াতে।
দশ বছরের বোন শান্তি দরজা খুলল। ছেঁড়া ফ্রক, ময়লা হাফ প্যান্ট। ছটো ছোটো দুটি হাতে মশলা বাটার পাকা জাফরানি রং। এই শান্তিকে দেখলে এখন কার মনে হবে দু-বছর
আগেও তাকে একটা টাটকা ফোঁটা গোলাপ ফুল বলে সম্ভাষণ করত লোকে?
শান্তি ফিসফিস করে বললে, আজ ছুটির দিনেও এত দেরি করে ফিরলি দিদি?
কাজ ছিল। হয়েছে কী?
বাবা ভয়ানক খেপে গেছেন। যাচ্ছেতাই বলে গালাগাল দিচ্ছেন তোকে।
দিন।
নিজেদের ঘরটার দিকে এগোল শকুন্তলা। নিজেদের ঘর, তারা চার জন থাকে এ ঘরে। সে, অজিত, শান্তি আর পাঁচ বছরের ছোটোবোন টুনু। আর একখানায় বাবা আর দাদা।
তক্তপোশের কারবার নেই, বিকেলে ঢালা বিছানা পড়ে মেঝের ওপর। এককোণে গোটা তিন-চার ট্রাঙ্ক আর টিনের সুটকেস। দেওয়ালে কী-একটা তেলকলের খেলো ক্যালেণ্ডার। দরজাটাকে বাঁচিয়ে এদিকে একটা নারকেলের দড়ি টানা—শাড়ি, জামা আর একরাশ ছেঁড়াখোঁড়া টুকিটাকির ভারে মেঝের প্রায় হাত খানেকের মধ্যে নেমে এসেছে। আর এক কোণে তিন টাকা দামের একটা প্যাকিং কাঠের শেলফে শকুন্তলার বই-খাতা; ফাঁকে ফাঁকে প্রায় লুকিয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-বার্নার্ড শ এবং দেশি-বিদেশি আরও দু-চার জন। এ ই শকুন্তলার বিদ্যাবেদী, এইখানে বসেই সে বিএ পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস অনার্স পাওয়ার স্বপ্ন দেখে। উৎকর্ণ হয়ে থাকে সেই বাঁশি শোনবার জন্যে, যা তাকে সুরের ইন্দ্রধনুরথে রসের বৈকুণ্ঠলোকে নিয়ে যাবে।
অজিতের তিক্ত বিষাক্ত ব্যাপারটা নিয়ে মনের মধ্যে জ্বলতে জ্বলতে একটা ময়লা আধ ছেড়া শাড়ি জড়িয়ে নিলে শকুন্তলা, এ সপ্তাহে কলেজে যাওয়ার মতো একমাত্র কাপড়খানাকে সযত্নে ভাঁজ করে তুলে রাখতে রাখতে বাবার গালাগালির জন্যে তৈরি হতে লাগল। এসব এখন আর গায়ে লাগে না, অভ্যেস হয়ে গেছে।
বাতের যন্ত্রণায় বিকৃত মুখে কদর্য কটুভাষায় বাবা সুর ধরেন।
ধিঙ্গি ধেড়ে মেয়ে আমার কলেজে পড়েন! এদিকে সংসার ভেসে যায়, বুড়ো বাপটা মরে; মেয়ে আমার বিদ্যের জাহাজ হচ্ছেন! বুঝি বুঝি সব! পড়া তো নয়, নাচতে যাওয়া হয় কলেজে।
আশ্চর্য! সেই বাবা! গ্রামের লোকে বলত দেবতার মতো মানুষ। মা ছাড়া কোনোদিন ডাকেননি শকুন্তলাকে। বলতেন, ও আমার সাক্ষাৎ সরস্বতী। মা-মরা ছেলেমেয়েদের একেবারে আগলে রাখতেন বুক দিয়ে। এই দু-বছরের মধ্যে কী অদ্ভুতভাবে বদলে গেছেন।
একটা ভয়ংকর ইংরেজি গল্প কিছুদিন আগে পড়েছিল মনে আছে। একজন লোক একটু একটু করে তার আত্মাকে পাঠিয়ে দিয়েছিল একটা ঘোড়ার মধ্যে, নিজে মরে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। বাবার সম্বন্ধেও তেমনি একটা সন্দেহ হয় তার। কোনদিন মরে ফুরিয়ে গেছেন, কার একটা হিংস্র প্রেতাত্মা এসে সঞ্চারিত হয়েছে তাঁর ভেতরে।
কিন্তু গালাগালটা এখনও শোনা যাচ্ছে না কেন? সে ফিরেছে এটা বুঝতে তো বাকি থাকার কথা নয়। দরজার কড়া নড়েছে, শান্তি দোর খুলে দিয়েছে, জুতোর শব্দ উঠেছে, তবু বাবা এখনও নীরব কেন? ঘুমিয়ে পড়েছেন খুবসম্ভব। সারারাত বাতের জ্বালায় ছটফট করে হয়তো চোখ বুজেছেন একটুক্ষণের জন্যে। ছোটোবোন টুনুরও দেখা নেই, রাতভর হুপিং কাশি টেনে সেও বোধ হয় বাবার পাশে ঘুমিয়ে পড়েছে।
তবু বাঁচোয়া।
একদিন সহ্য করতে না পেরে বলে ফেলেছিল, বেশ তত বাবা, তোমার যদি পছন্দ না হয়, পড়াশুনো ছেড়েই দিচ্ছি আমি।
শুনে বাবা বিশ্রিভাবে মুখ ভেংচে উঠেছিলেন।
আহা, তা আর ছাড়বে না! তা নইলে আর এমন করে খাইয়ে-দাইয়ে তাল গাছ করে তুললাম কেন! পাস করে বেরুলে একটা চাকরিবাকরি হবে, দুটো পয়সা এনে দিতে পারবে। আপন সন্তান হয়ে বাপের এটুকু উপকার কোন দুঃখে করতে যাবে শুনি?
না, বাবার ওপর আর রাগ হয় না। বুঝতে পারে বাবাকে, বুঝতে পারে কোথায় তাঁর ব্যথা। এই পচা চুন-বালি আর আরশোলার গন্ধে ভরা দম-আটকানো ঘরের মধ্যেই বাঁধা পড়ে গেছে বাবার জীবন। সুনন্দার দুধের মতো জলে ঢেউ ওঠে না এখানে, সুপুরি নারকেলের বন দুলিয়ে ছুটে আসে না বুক-জুড়োনো হাওয়া। একটা করুণাহীন অন্ধকূপের মধ্যে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন বাবা। আর তারই মধ্যে একটুখানি অন্তত বাইরে বেরুতে পায় শকুন্তলা। পথে, কলেজে একটা বিস্তৃততর জীবনের ভেতরে ফেলতে পায় মুক্তির নিশ্বাস। বাবার যা কিছু হিংসা আর হিংস্রতার উৎস ওইখানে।
