না, জোর করে চিন্তার মোড়টাকে ঘুরিয়ে আনল শকুন্তলা। বাইশে শ্রাবণ আসছে, রবীন্দ্রনাথ এই দিনে অস্তে নেমেছেন সন্ধ্যা-মেঘের তরণিতে সোনার মুকুট ভাসিয়ে দিয়ে। মরণমহেশ্বরের দেউলে বয়ে নিয়ে গেছেন তাঁর প্রণাম। কিন্তু তাই বলে একেবারে বিদায় নিয়ে যাননিঃ আবার যদি ইচ্ছা করো, আবার আসি ফিরে—। এই কান্না-হাসির গঙ্গা-যমুনায় তাঁর ঘট ভরা তো শেষ হয়নি। নব নব জীবনের গন্ধ যাবো রেখে, নব নব বিকাশের বর্ণ যাবো এঁকে।
রবীন্দ্রনাথ। শকুন্তলা নিজের মনের মধ্যে খুঁজতে লাগল। ভালো করে সেখানে তাঁকে তো ধরা যাচ্ছে না। বারে বারে হারিয়ে যাচ্ছেন, লুকিয়ে যাচ্ছেন কেমন একটা ম্লান কুয়াশার অন্তরালে।
মনে হল একটা অস্বচ্ছ কাচের আবরণের ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন বিশ্বকবি। আবছাভাবে দেখা যায় তাঁকে। দেখতে পাওয়া যায় তাঁর পেছনে একটা আনীল আকাশ। শ্যামলী অরণ্যের ললাটে কৃষ্ণচূড়ার কুঙ্কুমচিহ্ন, অঞ্জনা নদীর কালো জলে ছায়া-ফেলে-যাওয়া বাণীবনের মরাল মিথুন। বিদ্যুতের ভুজঙ্গপ্রয়াতে মেঘ-মঙ্গলের শ্লোকধ্বনি ওঠে। বৈশাখের সূর্যমুখী দুপুরে কিরণের উজ্জ্বল তারাগুলো অদৃশ্য মিড়ে ঝিনঝিন করতে থাকে। হিমের অবগুণ্ঠন টেনে হেমন্তলক্ষী কাঁপন লাগা সন্ধ্যাতারার প্রদীপ হাতে পায়ে পায়ে ঝিঝির নূপুর বাজিয়ে চলে যান হিরণ্যশীর্ষ ধানখেতের ভেতর দিয়ে।
কিন্তু!
আচ্ছা, সত্যিই কি কিনু গোয়ালার গলির কোনো একতলা ঘরে কখনো বাস করতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে? তাঁর হরিপদ কেরানির ভাগ্য ভালো বলতে হবে, অন্তত কখনো কখনো কান্তিবাবুর বাঁশির সুরে সে তমালের ছায়াঘেরা ধলেশ্বরী নদীর ধারে ঢাকাই শাড়িপরা মেয়েটির কাছে ফিরে যেতে পেরেছে। কিন্তু মশার গুঞ্জন থেমে গেলে শকুন্তলা বাঁশির সুর শুনতে পায় না, কানে আসে কাছের কোনো মদের দোকান থেকে মাতালের চিৎকার। শুনতে পায় বাবার গোঙানি, ছোটো বোনটার ঘুংরি কাশির বুকফাটা যন্ত্রণা।
ধলেশ্বরী নয়, একটা নদী তাদেরও ছিল— সুনন্দা। কবিতার মতো নাম, কবিতার মতো নদী। সুনন্দার দুধের মতো সাদা জলে জোয়ার-ভাটার ঢেউ খেলত, ঢেউ উঠত। হাওয়ালাগা সুপুরি আর নারকেলের বনে, ঢেউ দুলত পলিমাটিতে বুক সমান রূপশালি ধানে। কিন্তু স্বপ্নের পথ বেয়েও সে-সুনন্দার ধারে আর ফিরে যাওয়া যাবে না। একটা লোহার প্রাচীর যেন চিরদিনের মতো তাকে আড়াল করে দিয়েছে—পাকিস্তান।
তা না হলে কলকাতার এই পঁচিশ টাকার ঘরে এসে এমনভাবে মুখ থুবড়ে পড়ার তো কোনো দরকার ছিল না। বেতো শরীর নিয়ে হুকো হাতে বাবার দিন কাটত চন্ডীমন্ডপে। ভাইবোনদের পক্ষে যথেষ্ট ছিল গ্রামের ইশকুল। তালের ডিঙি আর চক ভরা রাঙা শালুক; রাঙা কাঁকরের ফাঁকা পথের পাশে ফুল আর ঘাসের জমিতে আটা ব্রজমোহন কলেজেই যথেষ্ট বিদ্যালাভ হতে পারত শকুন্তলার। কলকাতার মেসে থেকে সোয়াশো টাকা মাইনের চাকুরে দাদার ঘাড়ের ওপর এমন করে এসে পড়ার কোনো প্রশ্নই কখনো ওঠেনি।
সেদিন অনেক কাছে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। থেকে থেকে কখন প্রসন্নমুখে পাশে এসে দাঁড়াতেন। তাঁরই দৃষ্টিদীপের আলোয় ভোরের আকাশের দিকে তাকিয়ে উপলব্ধি জাগত আমি অন্ধকারের হৃদয়ফাটা আলোক জ্বল জ্বল। সন্ধ্যায় সুপুরিবনে যখন জোনাকির ঝাঁক জ্বলত, তখন কানে আসত তারই সুরেলা তীক্ষ্ণকণ্ঠধ্বনি— সজল সন্ধ্যায় তুমি এনেছিলে সখী, একটি কেতকী। নারকেলের পাতায় পাতায় ঝিলমিলে আলো পড়লে স্পষ্ট শুনতে পাওয়া যেত অর্থহারা সুরের দেশে ফিরালে দিনে দিনে–
সে-সুনন্দা নেই, সেই অর্থহারা সুরের দেশও নেই। এখন কিনু গোয়ালার গলি, কিন্তু কর্নেটের সুর আসে না—হরিধ্বনি তুলে মড়া যায় বরানগরের শ্মশানঘাটে।
বিরানগর বাজার, বরানগর বাজার।
কনডাক্টরের গলার স্বর সব ছিন্নভিন্ন করে দিলে। চমকে তাকাল শকুন্তলা। ভাবনার ফাঁকে ফাঁকে কখন পার হয়ে গেছে নোংরা বাগবাজার, পাথর-ওঠা কাশীপুরের পথ। বরানগর বাজারের অপরিচ্ছন্ন তেমাথার সামনে এসে কখন ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলছে বাস।
মিনিট কয়েক দাঁড়াবে এখানে, টাইম নেবে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই। ধীরে ধীরে নিজেকে গুছিয়ে নিলে শকুন্তলা, নেমে এল বাস থেকে।
বাঁ-দিকের ঘিঞ্জি রাস্তাটা দিয়ে সে এগিয়ে চলল।
এত দূর থেকে ওই কলেজে পড়তে যাওয়া, যেমন কষ্ট হয় তেমনি সময়ও লাগে। কিন্তু একসঙ্গে এমন কনসেশন আর স্টাইপেণ্ড কলকাতার আর কোনো কলেজেই পাওয়া গেল না। তাই যাতায়াতে প্রায় দু-ঘণ্টা সময় নষ্ট হলেও উপায়ান্তর নেই কিছু। তবে একটা সুবিধে এই যে কলেজ সকালে। সে যখন বেরিয়ে পড়ে তখনও অধিকাংশ অফিসযাত্রীর চায়ের পেয়ালায় চুমুক পড়ে না। যখন ফেরে তখন উলটো স্রোতে হ্যাণ্ডেল ধরে ঝুলতে ঝুলতে চলে ডালহোউসি স্কোয়ারের বড়োবাবু-মেজোবাবু-জুনিয়ার গ্রেডের দল।
এইটুকুই যা বাঁচোয়া। কখনো কখনো ভয় করে, বিশেষ করে শীতের মেঘলা সকালে। যখন ঠাণ্ডায় চোখ-মুখ যেন ছিঁড়ে যেতে থাকে, হাতে-বোনা পশমি ব্লাউজটার ভেতরে শীতের কাঁপন ওঠে আর রাত্রি-জমে-থাকা একেবারে ফাঁকা বাসটার একা যাত্রী শকুন্তলা জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকে, তখন। কিন্তু চারদিকের এত ভাবনা সঙ্গে সঙ্গে মনকে ঘিরে ধরে যে, একটু পরে নিজের জন্যে ভয় করতেও প্রায় ভুলে যায় শকুন্তলা। বাবা, ছোটো বোনেরা, ছোটোভাই, বড়দা। অভাব, দুশ্চিন্তা, লেগে-থাকা অসুখ। দাদার মাইনের টাকায় আর শকুন্তলার স্টাইপেণ্ডের উদবৃত্ত থেকে মাসের কুড়িটা দিন কোনোক্রমে টেনেটুনে চলে, কিন্তু বাকি দশটা দিন যে কীভাবে নাভিশ্বাস টেনে চালিয়ে যেতে হয়, সেটা ভাবতে গেলেও মাথা ঘুরতে থাকে। চারদিক থেকেই কালো রাত যেখানে ঘনিয়ে আছে, সেখানে একটা শীতের সকাল তার কতখানিই-বা ক্ষতি করতে পারে?
