ছেলের কাঁধ ধরে প্রাণপণে খানিক ঝাঁকানি দিলে মানিক।
অ্যাঁ!
মানিক সর্দারের ছেলে না তুই?
বলাই বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইল, জবাব দিলে না।
মায়ের দুধ খেয়েছিস না ছাগলের দুধ? বলাই তেমনি বিহ্বল চোখ মেলে তাকিয়ে রইল।
পিঠে মেরুদন্ড নেই, এতটুকু সাহস নেই! হতচ্ছাড়া মেয়েমানুষের অধম! কেমন করে বেঁচে থাকবি দুনিয়ায়? কী করে লড়বি চারদিকের এতসব বুনো জন্তুর সঙ্গে?
বলাই চুপ।
এবার মানিক সর্দারের একটা প্রচন্ড চড় বলাইয়ের গালে এসে পড়ল।
ওঠ হারামজাদা, ওঠ। এমন করে ব্যাঙের মতো বসে থাকলে চলবে না, পা চালিয়ে চল। এখানে শুধু যে একটা বাঘই আছে সেকথা বলা যায় না। বার বার বুড়ো বাপ তোকে বাঁচাতে পারবে না।
বাজারের সওদায় ভরা ছোটো থলেটা ছিটকে পড়েছিল, কাঁপা-হাতে সেটা কুড়িয়ে নিলে বলাই। তারপর কুকুরছানার মতো মাথা গুঁজে মানিক সর্দারের পাশে পাশে চলতে লাগল।
এতক্ষণে যেন মানিকের শরীরের সেই ক্লান্তি সেই অবসাদটা আবার এসে নতুন করে ভেঙে পড়েছে। পিঠের ওপরে সেই অসহ্য চাপ তার মেরুদন্ডটাকে মটকে দুখানা করে দিতে চাইছে। পা দুটো খুলে পড়বার উপক্রম করছে হাঁটুর তলা থেকে। যে-হাতে এতক্ষণ বল্লমটাকে উদ্যত করে রেখেছিল সে-হাতটা অদ্ভুতরকম ঢিলা হয়ে গেছে—যেন তাল পাতার পুতুলের হাতের মতো সরু সুতোয় ঝুলছে কাঁধের সঙ্গে।
বাঘ পালিয়েছে, কিন্তু জীবন?
একটা বলদ বিক্রি হয়েছে গেছে, আর একটাও যাবে। নতুন ধান এখনও অনেক দূর, ততদূর পর্যন্ত ঝাপসা চোখের দৃষ্টি চলে। কিছুদিন পরেই আসবে উপোস, বনের কচুকন্দ খেয়ে হয়তো আর এক মাস বেঁচে থাকা চলবে, কিন্তু তারপর?
উপায় নেই, কোনো উপায় নেই।
অথবা একটা উপায় আছে, যা করেছিল খাদেম আলি মোল্লা।
বলদ না থাক বলদের মোটা দড়িগাছটা ছিল, আর ছিল শূন্য গোয়ালঘরের বাঁশের আড়া —যেখান থেকে ঝুলে পড়তে খুব বেশি সময় লাগে না।
কিন্তু শরীরে যদি একটু শক্তি থাকত, যদি গত বছরের সান্নিপাতিক জ্বরটা তাকে এমনভাবে ফোঁপরা করে রেখে না যেত, তাহলে কি এত সহজে হার মানত সে? দিনমজুরি করতে পারত, যেতে পারত রেলের ইস্টেশনে। পশ্চিমি কুলিরা মোট বয়ে বেঁচে থাকে আর সে পারত না?
কিংবা তারও দরকার ছিল না, ছেলেটা যদি মানুষ হত! অপদার্থ মেয়েমানুষ! পান্ডুর জ্যোৎস্নায় ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে মাটিতে থুতু ফেলল মানিক সর্দার।
আর তক্ষুনি বাঘের গর্জনে আবার সমস্ত জঙ্গল কেঁপে উঠল। চোট-পাওয়া চিতা যে অত সহজেই পালায় না-জেনে-শুনেও সেকথা ভুলে গিয়েছিল মানিক সর্দার। খানিক দূরে গিয়েই বাঘ আবার নিঃশব্দে ফিরে এসেছে চোরের মতো, তারপর প্রতিশোধ নেবার জন্যে নির্ঘাত লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মানিকের ওপর।
হাত থেকে ছুটে গেল বল্লম। চিত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল মানিক। শুধু অসাড় আড়ষ্ট চোখ মেলে দেখতে লাগল একসার ধারালো দাঁত তার গলাটা ছিঁড়ে ফেলবার জন্যে নেমে আসছে ধীরে ধীরে। বিষাক্ত দুর্গন্ধ নিশ্বাসে সমস্ত মুখ জ্বলে যাচ্ছে তার। পায়ের ওপর সাপের মতো বাঘের ল্যাজ আছড়ে পড়ছে।
বলাই! অন্তিম প্রার্থনার মতো শুধু মনে হল, বলাই বাঁচবে তো? কিন্তু গলাটাকে ছিঁড়ে ফেলবার আগেই আর এক বার বাঘ আর্তনাদ করল। লাফিয়ে উলটে পড়ল মানিকের বুকের ওপর থেকে। তারপর অসহ্য যন্ত্রণায় গড়াগড়ি খেতে লাগল মাটিতে।
এবার বলাই। এতক্ষণ মানিক তাকে সুযোগ দেয়নি, আড়াল করেই রেখেছিল। সেই আড়াল সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলাই জেগে উঠেছে। একটা পাথরের চাপে খুলে গিয়ে মুক্তি পেয়েছে তার পৌরুষ, তার পনেরো বছরের প্রথম পৌরুষ।
বল্লম এবার আর কাঁধে গিয়ে লাগেনি, পাঁজরার ভেতর দিয়ে সোজা বাঘের হৎপিন্ড ভেদ করেছে। পঞ্চাশ বছরের মানিক সর্দারের হাত কেঁপেছিল, পনেরো বছরের বলাইয়ের হাত কাঁপেনি।
শেষ মুহূর্তের নিরুপায় যন্ত্রণায় বাঘ ছটফট করতে লাগল। বল্লমের ফলায় উছলে উঠতে লাগল রক্ত-গর্জনের পর গর্জনে জঙ্গল বিদীর্ণ হয়ে যেতে লাগল।
বাবা! বাবা! বলাইয়ের কান্না শোনা গেল। মাটিতে হাতের ভর রেখে উঠে বসল মানিক সর্দার, তারপর দাঁড়িয়ে গেল টলতে টলতে।
তোমার গা দিয়ে যে রক্ত পড়ছে বাবা! আরও শব্দ করে কেঁদে উঠল বলাই।
দু-হাত বাড়িয়ে ছেলেকে বুকে টেনে নিলে মানিক সর্দার। তারপর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললে, ভয় নেই—কোনো ভয় নেই। আমার জন্যেও নয়—তোর জন্যেও না।
উন্মেষ
বড়ো রাস্তার মোড়ের কাছে একটা শোরগোল উঠল। দু-চার জন পথে নেমে এল, কিছু লোক সার দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল দু-ধারে—যেমন করে দাঁড়ায় প্রসেশন যাওয়ার সময়। যারা নামল না, তারা বকের মতো গলা বাড়িয়ে দিলে বারান্দা থেকে।
ব্যাপার আর কিছু নয় নৃপেন রায় আসছেন।
কে এই নৃপেন রায়? দেশনেতা নন, রাজা মহারাজা নন, সিনেমার অভিনেতাও নন। কোনো আশ্রমে-টাশ্রমে মোটা টাকাও দান করে বসেননি। তবু তাঁর সম্পর্কে লোকের সীমাহীন কৌতূহল।
কেন যে কৌতূহল, তার জবাব পাওয়া গেল যখন তিনি বাঁক ঘুরে সামনে এসে পোঁছালেন।
ছ-হাতের মতো লম্বা। মাথায় একরাশ কোঁকড়ানো বাবরি চুল—সম্প্রতি বিপর্যস্ত। লম্বাটে মুখের কৌণিক হাড়গুলোতে অনেক ডাম্বেল-কষা মুগুর ভাঁজার কাঠিন্য। ঢালের মতো চওড়া বুক, আজানুলম্বিত পেশল হাত দুখানিকে মহাবাহু ছাড়া আর কোনো সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। পদ্মপলাশ বিস্তৃত চোখ এবং সে-চোখ পলাশ ফুলের মতোই আরক্তিম।
