ঠিক এই সময় সুপারিন্টেন্টে আরাধনাদি দেখা দিলেন দোরগোড়ায়।
এই মেয়েরা, কী হচ্ছে এসব? স্কুলের ছাত্রীদের মতো চ্যাঁচাচ্ছ সব, ওদিকে অন্য ক্লাস যে ডিসটার্বড় হচ্ছে তা জানো? আর ইরা, ফোর্থ ইয়ারে পড়ছ তুমি, কোন আক্কেলে টেবিলের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছ শুনি? তোমাদেরও যদি এটুকু ডিসেন্সি না থাকে, ফার্স্ট ইয়ারের মেয়েরা কী শিখবে তোমাদের কাছ থেকে?
শান্তি প্রতিষ্ঠিত হল সাময়িকভাবে, ভোটের জোরে জিতেও গেল ইরারা। কিন্তু একটা প্রতিদ্বন্দ্বী দলও তৈরি হয়ে গেল কলেজের ভেতরে। অনুষ্ঠানে কোথাও এতটুকু ফাঁক থাকলে ঠাট্টার কিছু আর বাকি রাখবে না তারা।
আর প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্যে সকলের আগে দরকার বেশ একটা দামি সভাপতি।
এদিকে আয়োজনটা নেহাত মন্দ হয়নি। প্রথমে বেদমন্ত্র পড়বে থার্ড ইয়ার সংস্কৃত অনার্সের সুনেত্রা গোস্বামী। ভাটপাড়ার মেয়ে, আইএ-তে ফাস্ট হয়েছে সংস্কৃতে। গান গাইবে বেণু বোস আর শিখা চক্রবর্তী। দুজনেই রেডিয়ো আর্টিস্ট। সেতার বাজাবে ইরা সেন; গিটার–মুক্তি বিশ্বাস। নটীর পূজা-র ক্ষমো হে ক্ষমো গানটার সঙ্গে শ্ৰীমতীর নাচ খুব সময়োপযোগী হবে। নাচবে হিমানী গুপ্ত—অল বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন। রবীন্দ্রকাব্যে মৃত্যু কল্পনা বলে প্রবন্ধ পড়বে ফোর্থ ইয়ারের শকুন্তলা নিয়োগী—কলেজ ম্যাগাজিনের এডিটর, চমৎকার বাংলা লেখে। তা ছাড়া প্রিন্সিপালও কিছু বলতে রাজি হয়েছেন। বাংলার অধ্যাপক অসামান্য জনপ্রিয় সি সি বি-ও নিশ্চয়ই খুব ভালো একটা বক্তৃতা দেবেন।
সুতরাং বেশ ভালোই হয়েছে এদিকের ব্যবস্থাটা। এখন মানানসই গোছের একজন সভাপতি হলেই কোথাও কিছু আর বাকি থাকত না। কিন্তু সেইখানেই বেঁধেছে গন্ডগোল। পুরুত না থাকলে যেমন পুজোর সমস্ত সমারোহ ব্যর্থ, তেমনি দুর্দান্ত একজন সভাপতি না পেলে সবটারই অঙ্গহানি ঘটে যাবে।
নিরুপায়ভাবে পথ চলতে লাগল চার জনে।
অনেক ভেবেচিন্তে সন্ধ্যাই শেষপর্যন্ত নীরবতা ভাঙল।
তা হলে প্রিন্সিপালকেই সভাপতি করে…
থাম তুই, বকিসনি বোকার মতো। প্রিন্সিপাল তো বারোমাসই সভাপতি রয়েছেন। কিন্তু এমনই একটা অকেশনেও যদি বাইরের কাউকে না আনতে পারা যায়, তাহলে কী করে মুখ দেখাবি সবিতা ওদের কাছে? ইউনিয়নের আসছে ইলেকশনে কাউকে আর দাঁড়াতে হবে আমাদের ভেতর থেকে—সেটা যেন খেয়াল থাকে।
একটা ব্যবস্থা হবেই। শ্রান্তভাবে শকুন্তলা বললে, কাল একবার যেতে হবে সোমেন মিত্তিরের কাছে, নইলে চেপে ধরতে হবে ডক্টর তুষার দত্তকে।
কাল আবার কেন? বেরিয়েছি যখন, সেরে যাই আজকেই। সাউথেই তো থাকেন ওঁরা। মাধবী বললে।
না, এত বেলায় গিয়ে কাউকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না। তা ছাড়া আমারও তাড়া আছে ভাই, বাড়ি ফিরতে হবে।
ইরা মুখ ভারী করে বললে, এই আজ-কাল করতে করতে ওঁরাও কোথাও এনগেজড হয়ে যাবেন শেষপর্যন্ত।
সে-ভার আমি নিচ্ছি। কালকের মধ্যে ব্যবস্থা আমি করে দেবই। কিন্তু এখন আর নয় ভাই, আমার বড্ড তাড়া আছে। ওই যে, বাসও আসছে।
আলোচনাটা মাঝপথে বন্ধ করে দিয়ে বাস স্টপের দিকে এগোল শকুন্তলা। অসন্তুষ্ট মুখে দাঁড়িয়ে পড়ে ইরা বিড়বিড় করে বকে চলল।
ছুটির দিনের বাস, তাতে বেলা বারোটার কাছাকাছি। ভিড় নেই বললেই চলে। অভ্যস্ত গলায় যাত্রীদের প্রলুব্ধ করার জন্যে কণ্ডাক্টর সমানে হেঁকে চলেছে, বাগবাজার-কাশীপুর বরানগর-খালি গাড়ি! খালি গাড়ি, বরানগর…
বরানগর। একটা সিকি এগিয়ে দিলে শকুন্তলা।
শ্রাবণের দুপুর, কিন্তু বর্ষণের বিষণ্ণ ছায়া আকাশের কোথাও নেই। শুধু অলস আশ্বিনের আভাস নিয়ে সিরাস মেঘের কয়েকটা শুভ্রোজ্জ্বল খন্ড ভেসে চলেছে দলছাড়া পাখির মতো। সূর্যের নিষ্ঠুর আলো থেকে থেকে শকুন্তলার মুখের ওপর এসে পড়তে লাগল। ওপাশের সিটে গিয়ে বসলেই হয়, কিন্তু সীমাহীন ক্লান্তিতে নিজের জায়গাটা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করল না আর। মাথার ওপর সারা সকালের রোদ জ্বলে গেছে, নাহয় পড়ক আরও দু-এক ঝলক।
বাইশে শ্রাবণ। কবিগুরুর প্রয়াণতিথি। গান, নাচ, আবৃত্তি, প্রবন্ধ, বক্তৃতা—অনুষ্ঠানের কোথাও কোনো ত্রুটি থাকবে না নিশ্চয়। তা ছাড়া অক্লান্ত পরিশ্রম করছে ইরা, খেটে চলেছে জেদের মাথায়। যেন চ্যালেঞ্জ নিয়েছে সবিতার দলের। সেই ঝোঁকের মুখে এতক্ষণ শকুন্তলাও বিভ্রান্ত হয়েছিল, সারা সকালটা কেটে গেছে নেশার ঘোরে। কিন্তু এ রৌদ্রোজ্জ্বল বেলা বারোটার সময় বাসের ঝাঁকুনিতে দুলতে দুলতে বরানগর ফেরার মুখে নিজেকে এইবার ফিরে পেল শকুন্তলা।
বাইশে শ্রাবণ নয়, বরানগরের গলির ভেতরে ইট-বের-করা একতলা বাড়ি। পায়রার খোপের মতো দু-খানা ছাদফাটা ঘর-বর্ষায় বাক্স-বিছানা টানাটানি করতে হয় একোণে ওকোণে। ফুট কয়েক উঠোনের আধখানা জুড়ে আছে পাটভাঙা পুরোনো ইদারা আর বাসনমাজার ছাই। ইলেকট্রিক নেই, সন্ধ্যার পরে হ্যারিকেন লণ্ঠনের পোড়া কেরোসিনের গ্যাসের সঙ্গে মেশে পচা চুন-বালির একটা ভ্যাপসা গন্ধ—যেন দম আটকে আসে। আর সময় বুঝে ওদিকের পানাপুকুর আর সামনের বদ্ধজলের কাঁচা ড্রেন থেকে উঠে আসে লক্ষ লক্ষ মশা। পঁচিশ টাকায় কলকাতার কাছেপিঠে এর চাইতে ভালো আস্তানা মেলা দুর্লভ আজকাল।
আর সেখানে…
