আরও জোরে দাঁড়…আরও জোরে…
এতক্ষণে—এতক্ষণে প্রতিদ্বন্দ্বীর নৌকোটা একটু পিছিয়ে পড়েছে। শাবাশ জোয়ান। জিতব আমরা; আমরাই নেব ইনাম-বকশিশ। শাবাশ।
কেউ কথা বলছে না। কথা বলার সময় নেই কারও। দাঁতে দাঁত চেপে সমানে টেনে চলেছে। ক্যাঁচ ক্যাঁচ ঝপ ঝপাস। নৌকোর তলা দিয়ে খঙ্গের মতো ছুটে যাচ্ছে জল। ফেনা ফুটছে—ঝিকিয়ে উঠছে বিজলির আলোয়।
এই হারামি সুমুন্দির হাত লড়ে না ক্যান? এই হালার লইগ্যাই আমরা হারুম!
রক্তঝরা চোখে তার দিকে তাকাল হালের মাঝি। কটু গালটা বর্ষণ করল তিক্ততম ভাষায়।
তিন নম্বর পিঠ চাড়া দিয়ে উঠে বসল। হারামি! ইচ্ছে করল লোকটার গলা টিপে ধরে গাঙের মধ্যে ফেলে দেয়।
কিন্তু না, চাল চাই তার। চাই খাবার, চাই ইনাম। মেয়েটার কান্না কানে বাজছে, বা জান…বা-জান? দু-পাড় থেকে হাততালি দিচ্ছে লোকে। জিততেই হবে…জিততেই হবে। অসুরের মতো দাঁড়ে একটা টান দিলে তিন নম্বর।
বাহারে জোয়ান! এই তো চাই।
এমন দিন আর কি হয়? আমার…তোমার…সকলের! আজাদির দিন! জেলার হাকিমের লঞ্চ থেকে হাত তুলে উৎসাহ দিলেন হাকিম স্বয়ং। চোখের উপর ছুরির ধার বুলিয়ে আর একটা হাউই উঠল আকাশে।
আবার আপ্রাণ চেষ্টায় দাঁড়ে ঝাঁকি মারল তিন নম্বর।
কিন্তু কতক্ষণ আর জোর বইবে পানতা ভাতের জল, আলুনি কচুসেদ্ধ। চড়াৎ করে বুকের মধ্যে কী ছিঁড়ে গেল একরাশ, মুখ দিয়ে গলগল করে নামল নোনা রক্ত। তারপর মিলিয়ে গেল সব আলো, সমস্ত কোলাহল, এমনকী রোগা মেয়েটার কান্না পর্যন্ত। টুপ করে একটা পাকা ফলের মতো নৌকো থেকে খসে পড়ল তিন নম্বর, মিলিয়ে গেল উৎসবের বিজলি ঝলমলে জলের মধ্যে।
বাইশে শ্রাবণ
কলরব করতে করতে একসঙ্গে চারটি মেয়ে ফুটপাথে নামল।
লম্বা বিনুনিটায় ঝাঁকুনি দিয়ে ক্রুদ্ধ গলায় ইরা বললে, সাধলেই ওঁদের মান বাড়ে। চাই না আমরা প্রেসিডেন্ট। নিজেরাই সব করব আমরা। কবিকে শ্রদ্ধা জানানোই আসল, নৈবেদ্যের ওপর সন্দেশের মতো নাই-বা থাকল সভাপতি।
দলের নেত্রী শকুন্তলা বললে, এই চুপ চুপ–আস্তে। বাড়ি থেকে একটু দূরে সরেই বল কথাগুলো। শুনতে পাবেন যে ভদ্রলোক!
পান না শুনতে। ইরার স্বর আরও তীব্র হয়ে উঠল, নাহয় নামই হয়েছে একটু, কিন্তু লেখেন তো ভারি… আবার দেমাক কত। চেতলায় মিটিং, বেহালায় সভা, হাওড়ায় বক্তৃতা–সারা দেশ যেন ওঁরই আশায় মুখিয়ে বসে আছে!
দ্রুত জুতোর শব্দ তুলে চার জনে হাঁটতে লাগল পথ দিয়ে। চড়া রোদে সারা সকাল এমনিভাবে নানা জায়গায় ধরনা দিয়ে প্রত্যেকেই যেমন ক্লান্ত, তেমনি বিরক্ত হয়ে উঠেছে। খিদের সঙ্গে ক্ষোভের যে উত্তাপটা এতক্ষণ ধরে সকলের মনে সঞ্চিত হচ্ছিল, ইরার মধ্যে দিয়ে সেটা বিদীর্ণ হয়ে পড়ল।
মাধবী বললে, তা ঠিক, কিন্তু একা এ ভদ্রলোককে দোষ দিয়ে লাভ কী? সবাই তো এক কথা বলছেন। প্রত্যেকেই দারুণ রকমের এনগেজড।
ইরা একটা ঝামটা মারল, এনগেজড না ছাই। এইসব বলেই নিজেদের দর চড়িয়ে রাখেন ওঁরা। লোকে দোরগোড়ায় এসে সাধবে, ওঁরা ওই সব ধুয়ো তুলে বোঝাতে চাইবেন যে, কী বিরাট ওঁদের চাহিদা! উচিত কী জানিস? কোনো সভায় কোনো সাহিত্যিককে না ডাকা। তাহলে নিজেরাই যেচে ছুটে আসতে পথ পাবেন না।
কিন্তু এ তো শুধু অক্ষম ক্রোধে গায়ের জ্বালাই মেটানো। সমস্যার সমাধান যে এতে ঘটবে সেকথা বাকি তিন জন ভালোই জানে—ইরাও যে জানে না এমন নয়। সাত দিন পরে বাইশে শ্রাবণ, রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণতিথি। একজন বেশ জাঁদরেল গোছের সভাপতি না থাকলে মুখ থাকবে না কলেজের মেয়েদের কাছে।
এমনিতেই এ নিয়ে তর্ক তুলেছিল অনেকে।
শান্তিনিকেতন থেকে ওঁরা তো বলেছেন যে কবির মৃত্যুদিনটায় এসব অনুষ্ঠান না করাই ভালো। ওটা নিছক পারিবারিক ব্যাপার, কিছু করতে হলে ওঁর আত্মীয় স্বজনদেরই…
বা রে, রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন বুঝি শুধু ওঁরাই? আর একজন কলকন্ঠে প্রতিবাদ করল, তিনি সারা দেশের আপনার জন। তাঁর ওপর ওঁদের যে-অধিকার, সে-অধিকার আমাদেরও।
বেশ, মেনে নিচ্ছি সেকথা। কিন্তু মৃত্যুতিথি হল দুঃখের দিন…
সঙ্গে সঙ্গে অপর পক্ষ থেকে তৈরি জবাব এল। কবির মৃত্যু নেই, তাঁকে নিয়ে কেউ কাঁদতে বসছে না। আসল কথা একটা উপলক্ষ্যকে নিয়ে আমরা তাঁকে স্মরণ করব। সেইটেই লাভ।
কিন্তু তার জন্যে সভা করার কী দরকার? শ্রদ্ধা নিয়ে মনে মনে স্মরণ করলেই তো হয়। কবি নিজেই বলে গেছেন :
যখন রবো না আমি মর্ত্যকায়ায়
তখন স্মরিতে যদি হয় মন,
ডেকো না ডেকো না সভা, এসো এ ছায়ায়–
থামো, থামো। কমন রুমের সমস্ত কলকোলাহল ছাপিয়ে ইরার তীক্ষ্ণ গলা মুখর হয়ে উঠল, শান্তিনিকেতনই ভারি মানছে কিনা সেকথা? আর কবি শালবনে পালাতে চাইলেই-বা আমরা ছাড়ব কেন! তিনি যখন আমাদেরই লোক, তখন আমাদের এটুকু উৎপাতও তাঁকে সইতেই হবে। বাজে কথা বন্ধ করো। চাঁদা দিতে চাও না, সেইটেই খুলে বলো।
কক্ষনো না। এসব বলা তোমার ভারি অন্যায়। এ পক্ষের মেয়েটির মুখ রাঙা হয়ে উঠল।
তারপরে যা শুরু হল, তাকে আর তর্ক বলা যায় না। ঝগড়ার উৎসাহে কোমর বেঁধে একটা টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে গেল ইরা। তিরিশটি গলার ঐকতান বাজতে লাগল সপ্তমে। রণে ভঙ্গ দিয়ে দুটি মেয়ে ফোঁস ফোঁস করে কান্না জুড়ল।
