বাঁক আর দূরে নেই, এলাম বলে। তারপরে আর এক পাক। আরও এক পাক! ওরা সমানে সঙ্গে চলছে। আশ্চর্যভাবে শক্তির সমতা ঘটে গেছে একটা।
কিন্তু…
গোরুটা। দুধোল গাই। কালচে বাদামি রং, শুধু মাথার উপরে শিংয়ের তলায় খানিকটা সাদা। নাম ছিল চাঁদকপালি।
থাকার মতো ওটাই ছিল শেষ পর্যন্ত। কিন্তু ভাঙা কপালে আর সইল না চাঁদকপালি। মাত্র ত্রিশটা টাকার জন্যে বেচে দিতে হল।
তিন সের দুধ দিত দু-বেলায়। ঘন মিষ্টি দুধ, পাতার উপর ধরলে আঠার মতো লেগে থাকত। সেই গোরু বিক্রি করতে হল। যেতে চায়নি, শিং নেড়ে আপত্তি করেছিল প্রথমে–বসে পড়েছিল চার-পা ভেঙে। কিন্তু শেষপর্যন্ত একরকম হিচড়েই নিয়ে গেল লোকগুলো।
যাওয়ার আগে এক বার গভীর কালো দৃষ্টি মেলে চেয়েছিল তিন নম্বরের মুখের দিকে। অবলা জীবের সে-দৃষ্টি আজও সে ভুলতে পারেনি, মনে পড়লে এখনও কলজের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে।
যাক, সবই গেছে ওটাও যাক। শুধু লুটিয়ে লুটিয়ে কেঁদেছিল মেয়েটা। এখনও ছেলেমানুষ, এখনও কাঁদে। কিন্তু…
তিন নম্বর কলের মতো দাঁড় ফেলতে লাগল। রোগা মেয়েটা। পাশের বাড়ির মাতব্বরের বউ-য়ের জিম্মায় রেখে এসেছে। দরদ আছে মাতব্বরের বউয়ের, মেয়েটাকে একটু ভালোও বাসে। কিন্তু হাজার হলেও পর পর। কতখানি সে করতে পারবে?
এত আলো, এত লোক, এত আনন্দ। সব ভুলে যেতে হয়। বাঁশবন নয়, পোকা-খাওয়া গলে-যাওয়া চালের শণ নয়, পাট-জাগানো খালের রাঙা জল থেকে নাড়িতে মোচড়-দেওয়া দুর্গন্ধ নয়, তারা-ছাওয়া আকাশের তলায় ভাগাড়ের হাড় নিয়ে কুকুরের মড়াকান্নাও নয়। মেলা বসেছে। বাজনার শব্দ উঠছে। নানা রঙের পোশাকের ঝিলিক। বিজলিবাতির আলোয় ঝলমলে নদীর জল।
এসব তোমার। আর কেউ নেই। অধিকার নেই আর কারও। বুক ভরে নিশ্বাস নাও। আনন্দে কানায় কানায় ভরে ওঠো। টান দাও বাইচের নৌকোর দাঁড়ে।
মেয়েটা! আট বছর বয়স। ওই এক বন্ধন। ওটা হওয়ার এক বছর পরে আকালে ওর মা গেল, বড় ভাই দুটো গেল। ওকে বুকে করে শহরে এসে এ-ঘাটায় ও-ঘাটায় ঘুরে কী করে যে বেঁচে রইল তিন নম্বর, তাই আশ্চর্য!
তারপর দিন বদলাল। শোনা যায় দুনিয়াও পালটাল। সব তোমার, আমার, সকলের। চারদিক থেকে তারই জয়ধ্বনি। কিন্তু…।
আকালে মরল না, আজ যেন বাঁচবার রাস্তা কোথাও পাচ্ছে না। উৎসব-আনন্দ। ওদিকে সাত দিন জ্বরে ভোগার পরে কাল দুটি ভাত পাবে মেয়েটা। অথচ কোথায় ভাত? পরশু পর্যন্ত পানতা ভাতের জল ছিল নিজের। আজ সকালে বিনা নুনে খেয়ে এসেছে সেদ্ধ কচুর গোড়া। এতক্ষণে টের পেল তিন নম্বর। অসহ্য ক্ষুধা। তাই চোখে ঝাপসা দেখছে, ম্লান হয়ে আসছে আলোগুলো, কানের কাছে ঝিঝির ডাক। হাতের শিরা ছিঁড়ে যাচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে পিঠের পাঁজর।
সাঁ–
বেগে একটা মোড় ঘুরল বাইচের নৌকো, ঘুরে গেল চক্রাকারে। আবার ফিরে যেতে হবে এই তিন মাইল পথ—ফিরতে হবে এখানে; তারপরে ওই বাঁধাঘাটে। আনন্দের দিন, আমাদের দিন। দু-পাড় থেকে উৎসাহ দিচ্ছে লোক—হাততালি দিচ্ছে। কিন্তু কিছুই কানে যাচ্ছে না যেন তিন নম্বরের। দাঁড় টানছে—টেনে যেতেই হবে। সেদ্ধ কচুর গোড়াগুলো কখন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে পেটের মধ্যে। খাবার চাই, চাই চাল।
সাত দিন পরে ভাত খাবে মেয়েটা। শুকনো শীর্ণ মুখখানা ভাসছে চোখের সামনে। নিজের জন্যে সে আর ভাবে না, অনেককাল আগেই চুকিয়ে দিয়েছে সেসব। আকালে যাকে বুক দিয়ে বাঁচিয়েছিল—আজকের নতুন মাটিতে, নতুন হাওয়ায় তাকে সে কিছুতেই মরতে দেবে না।
হালের মাঝি পা ঠুকছে অস্থিরভাবে। এক বার ঘাড় ফিরিয়ে তার দিকে তাকালে তিন নম্বর। মাথায় গামছাবাঁধা, বাবরি চুলগুলো উড়ছে হাওয়ায়। টকটকে লাল দুটো চোখ—যেন নেশা করেছে। খুন চেপেছে ওর মাথায়, আগুন ঝরছে দৃষ্টিতে।
সে ছাড়া আরও একুশ জন দাঁড় ফেলছে। দাঁড় ফেলছে তালে তালে। গায়ে চকচক করছে। ঘাম। হাত থেকে বুক পর্যন্ত পেশি দুলছে টানে টানে। দাঁড়ের ঘায়ে ঘায়ে ছিঁড়ে-যাওয়া কচুরির গন্ধ, ছাপিয়ে উঠছে মানুষের ঘামের গন্ধ।
না, কচুসেদ্ধ খেয়ে আজ সে বাইচ খেলতে আসত না। ফেলে আসত না মা-মরা অসুস্থ মেয়েটাকে। পিছন থেকে এখনও যেন কান্না আসছে শহরে আমিও যামু, আমারে ফেইল্যা যাইয়ো না বা-জান।
অনেক দূর…অনেক দূর পর্যন্ত তার কানে ভেসে এসেছে সেই কান্নার শব্দ। নারকেলবন পেরিয়ে, বাঁশবন ছাড়িয়ে একেবারে খালের ঘাট পর্যন্ত। অস্পষ্ট থেকে আরও অস্পষ্ট। তারপর মিলিয়ে গেছে। একেবারেই কি মিলিয়ে গেছে? না না। তিন নম্বরের হাত অবশ হয়ে এল। দু-পাড়ের সমস্ত হট্টগোল ছাপিয়ে এখনও কানের ভিতর বাজছে শীর্ণ গলার সেই টানা সুরের আর্তি যাইয়ো না বা-জান, আমারে ফেইল্যা যাইয়ো না…।
কিন্তু খাবার চাই, চাই চাল। শহরে উৎসব। বাইচের প্রতিযোগিতা। কত রং ও বেরঙের পোশাকপরা মানুষ, খুশিতে আলো-হয়ে-যাওয়া মুখ। দিনের সেরা দিন। ধনীর প্রাণ আজ দরাজ হয়ে গেছে। চাল বিতরণ হচ্ছে, খাবার বিতরণ হচ্ছে।
সে তো আজকের জন্য। একটা দিনের জন্য খিদে মিটল। তারপর কাল? পরশু? দিনের পর দিন? কোথায় আলো, কোথায় কে! শুধু পচা মোষের চামড়ার গন্ধ উঠবে অন্ধকারে। মড়কের আভাস তুলে কেঁদে কেঁদে বেড়াবে কুকুর। আকাল এসেছিল; একটা দমকা হাওয়ায় ঝরা পাতার মতো উড়িয়ে দিয়েছিল সব। কিন্তু এখন ঘুণ। বাঁশ কাটছে, কাটছে দাওয়ার খুঁটি। সে-খুঁটির ওপর কান পাতলে ভিতরে ঘুরঘুর করে তাদের ডাক শুনতে পাওয়া যায়!
