গলুইয়ের মাঝি এ নৌকোর তিন নম্বর দাঁড়ের উদ্দেশে চেঁচিয়ে উঠল।
তিন নম্বর ভাসা ভাসা চোখে তাকাল। কপালে টলটলে ঘাম। বাহু দুটো যেন ছিঁড়ে পড়ছে তার। পিছন থেকে কেউ যেন একটা আসুরিক চাপ দিয়ে তার পিঠ-পাঁজর ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছে।
ওই বাঁকের পর আরও এক পাক! তারও পরে ওই বাঁধাঘাট! তিন নম্বরের সমস্ত চিন্তাগুলো গুলিয়ে যাচ্ছে একাকার হয়ে। সব ঝাপসা, সব অস্পষ্ট। কোনো অর্থ নেই চারপাশের ওই আকাশ-ফাটানো চিৎকারের। আলোগুলো সব লেপটে যাচ্ছে একসঙ্গে; উড়ন্ত হাউইয়ের জেল্লা চোখের মণিতে এসে বিঁধছে একরাশ কাঁটার মতো।
তবু প্রাণপণে সে দাঁড়ে টান মারল। টান মারল যন্ত্রের মতো। জিততেই হবে যেমন করে হোক। বকশিশ মিলবে, ইনাম মিলবে। আর মিলবে খাবার। তা ছাড়া শহরে কোথায় যেন বিনা পয়সায় খেতে দিচ্ছে আজ। আনন্দের দিন। বাজি পুড়ছে, হাউই উড়ছে। আলগা হয়ে গেছে বড়োলোকদের শক্ত মুঠো, দরাজ হয়ে গেছে দিল।
ডুম-ডুম-ডুম–
ডঙ্কার আওয়াজ। আরও জোরে টান মারো জোয়ান—আরও জোরে। পাশাপাশি চলেছে। দুখানা। প্রতিযোগিতা চলেছে সমানে সমানে। জিততেই হবে। দু-ধার থেকে চিৎকার করে উৎসাহ দিচ্ছে অগুন্তি লোক।
আগ বাড়ো, আগ বাড়ো…
এরই মধ্যে এক ফাঁকে বাঁ-হাতের পিঠ দিয়ে কপালের ঘামটা মুছে ফেলল তিন নম্বর।
চারিদিকে আলো, উৎসবের সমারোহ। এত তারা, এত বাতাস সব তোমার। খোদা মেহেরবান। কিন্তু ওই গ্রামে তো একথা মনে হয় না কখনো।
সেখানে এখন বাঁশঝাড়ের উপর রাত নামল। রাত, মহিষের পচা চামড়ার মতো দুর্গন্ধে-ভরা কালো রাত। খালের জল জাগ-দেওয়া পাটের গন্ধে আবিল। বাতাসে মশার গুঞ্জন। ভাগাড়ের হাড় নিয়ে টানাটানি করতে করতে তারায়-ছাওয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মড়াকান্না কেঁদে উঠছে কুকুর।
নারকেল বনের ছায়ার পিছনে তিন নম্বরের ঘর। গলে কালো-হয়ে-যাওয়া শণের ছাউনির ভিতর দিয়ে অজস্র জল পড়ছে এবারের বর্ষায়। টুপ টুপ করে ঘরের ভিতর পড়েছে সাদা সাদা একরকম খুঁয়োপোকা, পচা শণের মধ্যে ওরা জন্মায়। বাঁশের খুঁটিগুলো একেবারে ফোঁপরা, ফুটো দিয়ে কাচপোকা উড়ে যায়। খুঁটির গায়ে কান পাতলে শোনা যায় ঘূব ঘুর করে পোকার ডাক।
এবারের ধান পেলে হয়তো সুরাহা হবে কিছু। খড়ও মিলবে দু-চার কাহন। কিন্তু তারপর?
দুটো মাস—বড়োজোর দুটো মাস। গত বছর পর্যন্ত গোরুটা ছিল, দুধেল গাই। ধার করে খড় খাওয়াতে হয়েছে। এবার আর গোরুটা নেই কিন্তু ধার রয়ে গেছে। ওই খড় সে-ধার শোধ করতেই যাবে। যা বাকি থাকবে তাতে আর চাল ছাওয়া চলবে না।
দুটো মাস চলবে ধানে—ধার শোধ করে ওর পরে আর-কিছু থাকবে না। তারপর আবার যে-কে-সেই। মাইন্দার খাটতে হবে, ধার করতে হবে, জঙ্গলে জঙ্গলে খুঁজতে হবে তিত পোরোল আর বুনো কচুর মুখী। খালের কাদাভরা জলে নেমে খোড়লে খোড়লে হাত পুরে দিয়ে খুঁজতে হবে শোল আর বান মাছ—ঢোঁড়া সাপের কামড় উপেক্ষা করেই।
এত আলো এখানে, এত লোক! তবু কী অদ্ভুতভাবে খাঁ-খাঁ করে গ্রাম। মনে হয় মানুষ নেই কোথাও, সব ছায়া হয়ে লুকিয়ে গেছে বাঁশবনে, হারিয়ে গেছে নারকেল গাছের অন্ধকারে। ওদের ছাড়া-ভিটেগুলোতে আগে পালপার্বণে তবু কিছু লোকজন আসত, গ্যাসের লম্বা লম্বা নলে আলো জ্বলত, পুজো হত, কলের গান বাজত। কিন্তু এখন এক কোমর জঙ্গল গজিয়েছে সেসব জায়গায়। শেয়াল ঘোরে, ভিটের কোলে কোলে গজিয়ে-ওঠা থানকুনি পাতার বনে কুন্ডলী পাকায় চন্দ্ৰবোড়া। সকাল-সন্ধে-মাঝরাত্তির যখন-তখন আঁতকে আঁতকে ডেকে ওঠে তক্ষক।
মরুক গে। যারা গেছে তারা যাক। কিন্তু যারা আছে?
মাতব্বরেরা মুখে হাত চাপা দেন। শাসায় কেউ কেউ। দারোগা যখন আসেন তখন আর এক বার মনে করিয়ে দিয়ে যান— সব ঠিক হয়ে যাবে, দু-দিন সবুর করুন। বড়ো বড়ো সাহেবেরা কখনো কখনো পাশের গঞ্জে এসে সভা করেন, হবে, হবে—সব হবে…
মুহূর্তের ভাবনার মধ্যে এতগুলো কথা ভেসে গেল। উড়ে গেল বাইচের নৌকোর মতো।
ডঙ্কার শব্দ। চিৎকার। হালের মাঝির ভৎসনা।
কোনহান থিকা এইডারে আনল রে? সমানে ঝিমাইতে আছে। টানা টানো।
তিন নম্বর আবার চোখের দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ মেলে ধরতে চাইল। তাকেই বলছে। বলবেই তো। সে তো নিজেও জানে দাঁড়ের প্রত্যেকটি টানের সঙ্গে সঙ্গে তার বুকের শিরাগুলো ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম করছে। সে তো বুঝতে পারছে তার পিঠের উপর যেন একটা তিনমনি বোঝার চাপ। সমস্ত হাড়-পাঁজরা ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে তার।
সাগু খাও? সাগু খাও নাকি?
আবার ধিক্কার। কিন্তু সাগু! নিজের অজ্ঞাতেই এক টুকরো হাসি ফুটল ঠোঁটের কোনায়। আজ পাঁচ বছরের ভিতরে সাগুদানা চোখে দেখেছে না কি তিন নম্বর? শুনেছে শহরে নাকি পাওয়া যায়, আট টাকা করে সের!
শাবাশ জোয়ান, হেঁইয়ো…
পাশাপাশি চলেছে দুখানা। সমানে সমানে। এক ঝাঁকি দিয়ে ওদের গলুই দু-হাত এগিয়ে যায়, ওরা আর এক দমকে তিন হাত বেরিয়ে যায়। টানা টানো—প্রাণপণে টানো। ইনাম, বকশিশ, খাবার। দু-ধারের লোকগুলো আরও ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, আরও একাকার হয়ে যাচ্ছেআলোগুলো। হাওয়ার উড়ন্ত গতি ছুরির ধারের মতো কাটছে চোখ দুটো। অর্থহীন শব্দের গর্জন কানের মধ্যে ভেঙে পড়ছে জোয়ারের জলের মতো।
