–পাঁচু কেমন আছে দেখতে এলুম পিসিমা।
ক্ষেমঙ্করী-পিসিমা ভারি খুশি হলেন : আহা বাবা, আয় আয়। বাছা আমার আজ দুদিন থেকে মনমরা হয়ে শুয়ে আছে।
-সেই জন্যেই তো এলুম। শরীর খারাপ বলেই তো ওকে ভালো করে উৎসাহ দেওয়া দরকার।
-তাই দে বাবা। আমি তোদের জন্যে কটা তালের বড়া ভেজে আনি।
সত্যিই তালের বড়ার গন্ধে বাড়ি ম-ম করছিল। বলুটদাঁ মুখটাকে ছুঁচোর মতো ছুঁচলো করে আমায় চুপিচুপি বললে, দেখলি তো প্যালা–হুঁ-হুঁ। কেমন প্রেমসে গরম-গরম তালের বড়া খাওয়া যাবে। কপাল ভালো থাকলে এমনিই হয়। এখন চল দেখি–পেঁচোটা কী করছে।
পায়ে চুন-চলুদ মাখিয়ে পাঁচুগোপাল প্যাঁচার মতো পড়ে আছে। বল্টুদা গিয়ে ধপাত করে তার পাশে বসে পড়ল।
কীরে পেঁচো, কেমন আছিস?
পাঁচু চিঁ-চিঁ করে বললে, ভীষণ ব্যথা।
–ভীষণ ব্যথা?–বল্টুদা উৎসাহ দিতে লাগল : অমন হয়। ব্যথা হতে হতে শেষে সেপটিক হয়ে যায়।
পাঁচুগোপাল ভীষণ ঘাবড়ে গেল : মচকানি থেকে সেপটিক হয়?
হয় বই কি। অনেক সময় পা কেটে ফেলতে হয় কত লোকে মরেও যায়।
পাঁচগোপালের চোখে কপালে চড়ে গেল : অ্যা–আমি তবে মারা যাব নাকি?
উৎসাহ দিয়ে বল্টুদা বলতে লাগল, যেতে পারিস–কিছু অসম্ভব নয়। তবে মারা না-ও যেতে পারিস–মানে, মনে জোর থাকলে বেঁচে গেলেও বেঁচে যেতে পারিস। তবে একটা পা কাটা গেলেও ঘাবড়াসনি। না হয় লাঠি ভর করেই হাঁটবি। আর যদি মারাই যাস–মনে কর মারাই গেলি–তা হলেও ঘাবড়ে যাসনি। দেখিস পেঁচো–বল্টুদা আরও বেশি উৎসাহ দিতে লাগল : তোর মৃত্যুর পর আমরা কীরকম একখানা শোকসভা
বল্টুদা আর বলতে পারল না–শব্দ হল ঝপাং। বাপ বাপ বলে বল্টুদা লাফিয়ে উঠল।
ক্ষেমঙ্করী-পিসিমার ঝাঁটা আবার নামল বল্টুদার পিঠে। পিসিমা যে কখন ঘরে ঢুকেছে আমরা দেখতে পাইনি।
বিকটরকম দাঁত খিঁচিয়ে ক্ষেমঙ্করী-পিসিমা আকাশ ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগল : তবে রে অলপ্পেয়ে–নচ্ছার, ড্যাকরা, হাড়হাবাতে। আমার পাঁচুর ঠ্যাং কাটা যাবে? আমার পাঁচু মারা যাবে? তার আগে তোরই মরণ ঘনিয়েছে–দেখে নে।
আবার ঝাঁটা নামল : ঝপাং ঝপাং
বাবারে গেছি–গেছি বলে বল্টুদা ছুটল। পেছনে ছুটল ঝাঁটা হাতে ক্ষেমঙ্করী-পিসিমা। কী আর করা–আমাকেও ছুটতে হল সঙ্গে সঙ্গে।
সন্ধেবেলা গেছি বল্টুদার বাড়িতে। গায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে পড়ে আছে বল্টুদা। ঝাঁটার ঘায়ে বল্টুদাকে একেবারে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে, ক্ষেমঙ্করী-পিসিমা। উৎসাহ দেবার পালা আমার এবার।
বললুম, কিছু ভেব না বল্টুদা। ঝাঁটার ঘায়ে যদি সারা গা সেপটিক হয়ে যায়–যদি তুমি মারাই যাও তা হলেও কিছু চিন্তা কোরো না। অভিলাষের দোকানে তোমার যে চুয়াল্লিশ টাকা চার আনা পাওনা আছে–সেটা আমিই খেয়ে আসব এখন।
কিন্তু বল্টুদা একদম উৎসাহ পেল না। চেঁচিয়ে আমায় গাল দিতে লাগল : বেরো–বেরো এখান থেকে। উল্লুক-ভাল্লুক-শল্লকী–পক্কবিল্ব–অম্লজান কোথাকার কী ছোটলোক–দেখেছ?
বাইচ
দুখানা চলেছিল পাশাপাশি; তিরের বেগে এগিয়ে যাচ্ছিল। জলটা যেন বাতাসের মতো লঘু হয়ে গেছে। জাহাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়েও আজ বাইচের নৌকোগুলো তাদের পিছনে ফেলে যেতে পারে।
নদীর দু-ধারে কাতারে কাতারে লোক। বিজলিবাতির আলোয় ঝলমল করছে জল। পটকা ফুটছে। আগুনের আঁকাবাঁকা রেখা এসে আকাশে উঠছে, হাউই ফেটে পড়ছে একরাশ জ্বলন্ত ফুল ছড়িয়ে। এপারে মেলা বসেছে, মানুষের হট্টগোল উঠছে তাল-মাপা দাঁড়ের আওয়াজকে চাপা দিয়ে।
এমন আনন্দের দিন কখনো আর আসেনি। আগে যখন দুর্গা পুজো হত, হত সরস্বতীর ভাসান, তখনও আশেপাশের গাঁ থেকে বাইচের নৌকো নিয়ে আসত মানুষ, বকশিশ পেত বাবুদের কাছ থেকে। কিন্তু তার সঙ্গে এর তুলনা! সে ছিল ওদের উৎসব। কিন্তু আজকের দিন আমাদের। আমার, তোমার, সকলের। এ হল আজাদির দিন, মুক্তির দিন। আজকের নদীর এই ঘোলাজলের দিকে তাকাও, আর কারও নৌকো বুক ফুলিয়ে এর উপর দিয়ে ভেসে যাবে না। প্রাণ ভরে টেনে নাও আজকের বাতাস, আর কারও নিশ্বাস একে আবিল করে দেয়নি। মাথার উপর যত তারা দেখছ ওরা সব তোমার, এই দিনটিতে একান্তভাবে ওরা তোমারই মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
হালের মাঝি কয়েক বার সজোরে পা ঠুকল নৌকোর গলুইয়ে। ডুম ডুম করে দ্বিগুণ বেজে উঠল ডঙ্কার আওয়াজ। দোলা খেয়ে গেল রক্ত।
শাবাশ জোয়ান, হেঁইয়ো–
আগ বাড়ো ভাই, আগ বাড়ো–
পাশাপাশি দুখানা নৌকো। প্রতিযোগিতা চলছে এদেরই মধ্যে। বাকি যারা পিছিয়ে পড়েছে। তারা আর ধরতে পারবে না। সুতরাং, জীবন-মরণ পণ চলছে এই দুখানার ভিতর।
বাইশ বাইশ করে চুয়াল্লিশখানা দাঁড় দুই নৌকোয়। প্রত্যেকটি খেপের সঙ্গে প্রতি মাল্লার বাহু থেকে বুক পর্যন্ত পেশিতে পেশিতে ঢেউ খেলছে। ক্লান্তি নয়, অবসাদ নয়। হাতের শিরাগুলো ঢিলে হয়ে আসতে চাইলেই হালের মাঝি গলুইয়ে পা ঠুকে চেঁচিয়ে উঠছে বিকট গলায়। ডঙ্কার শব্দে কেটে যাচ্ছে ঘোর। আগ বাড়ো ভাই, আগ বাড়ো…
সামনের ওই বাঁক ঘুরে এক পাক। আরও এক পাক তারপরে। তারও পরে ওই বাঁধাঘাটে ভিড়তে পারলেই জিত। ইনাম, বকশিশ।
সামনে দুখানা চলছে গায়ে গায়ে। কেউ কাউকে ছাড়িয়ে যেতে পারছে না। সমানে সমানে!
এই, তোমার হইল কী? সাগু খাইয়া টান মার নাকি?
