–ওর বাবা কী করলে?
বল্টুদা চোখ মিটমিট করে বললে, পরে বলব। ওই যে অভিলাষ আসছে।
সত্যই অভিলাষ আসছে। নিজের হাতে করে আনছে দুটো প্লেট। তাতে ডবল ডিমের ওমলেট, দুটো করে প্লাম কেক আর চারটে করে টোস্ট।
বল্টদা বললে, বাঃ, তোফা!–তারপর প্রায় অভিলাষের হাত থেকে প্লেট কেড়ে নিয়েই খাওয়া শুরু করে দিল। আর আহ্লাদী-আহ্লাদী মুখ করে পাশে দাঁড়িয়ে রইল অভিলাষ। কী খুশি!
–ওমলেট কেমন হয়েছে বল্টুদা?
খাসা! তোকে তো উৎসাহ দিতেই এলুম অভিলাষ। তোর ওমলেট খেয়েই বুঝতে পারছি–তোর ভবিষ্যৎ কী নিদারুণ উজ্জ্বল।
অভিলাষের চোখ-মুখ চকচক করে উঠল।–তাই নাকি?
–তবে আর বলছি কী? তোর রেস্তোরাঁ দিনের পর দিন ফেঁপে উঠবে, দেলখোসকে মেরে বেরিয়ে যাবে।
-সত্যি?–আনন্দে অভিলাষ বার-দুই খাবি খেল।
তা ছাড়া কী? তারপর তোর রেস্তোরাঁ আরও বড় হবে–গ্র্যান্ড হোটেলকেও ছাপিয়ে উঠবে। গ্রেট ইস্টার্ন বা ফিরপোতে না গিয়ে দলে-দলে লোক ছুটে আসবে তোর দোকানে। চাং-ওয়ার চাউ চাউ হাউহাউ করে কাঁদতে থাকবে আর তুই গদি-আঁটা চেয়ারে বসে খালি টাকা গুনতে থাকবি।
বক্তৃতা আর খাওয়া সমানে চলছে বল্টুদার। আমিও যতটা পারি চটপট প্লেট সাফ করছি। কখন যে কী হয়ে যায়, কিছুই তো বলা যায় না।
.
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খানিকক্ষণ নেচে নিলে অভিলাষ; তারপর দৌড়ে যেতে-যেতে বলে গেল, বোসো, তোমাদের জন্যে ভালো করে ডবল কাপ চা নিয়ে আসি দুটো।
বল্টুদা শেষ প্লাম কেকটা গোগ্রাসে গিলতে গিলতে বললে, কেমন বুঝছিস?
বললুম, ভালো নয়। পকেটে যদি টাকা না থাকে
টাকা? টাকা কী হবে? উৎসাহ দেবার শক্তি থাকলেই যথেষ্ট। দেখছিস না-এর মধ্যেই কেমন নাচতে শুরু করেছে অভিলাষ? আর তাও ভেবে দ্যাখ প্যালা– ঝট করে কী রকম ওর রেস্তোরাঁটাকে গ্র্যান্ড হোটেলের চাইতেও বড় করে দিলুম। আর কী চাই? হু-হু।
-মুখে বললেই তো হয় না।
–মুখে বলব না তো কান দিয়ে বলব নাকি? কিন্তু তুই তো আমায় ভাবিয়ে তুললি, সত্যিই তো–কান দিয়ে কি বলা যায়? অবিশ্যি নাক দিয়ে কেউ কেউ ঘুমের সময় বলে বটে, কিন্তু কী যে বলে তা বোঝাই যায় না। বোধ হয় হিব্রু বলে। না কি জার্মান ভাষা? ঘু-ঘুরু–খুঁরুর–আচ্ছা, চীনে ভাষা না তো? তোর কী মনে হয় প্যালা?
নাকের ডাকের ভাষাটা যে কী-বোঝবার আগেই অভিলাষ চা আনল। কী মনে হয়, তা আর বলতে পারলুম না।
বল্টুদা আর আমি বেশ মন দিয়ে চা-টা শেষ করলুম। তারপর ধীরে সুস্থে গোটা দুই ঢেকুর তুলে বল্টুদা উঠে দাঁড়াল। আমিও তক্ষুনি একেবারে দোরগোড়ায়–এইবারে যা হওয়ার হবে–এসপার ওসপার।
বল্টুদা বললে, জোর খাইয়েছিস! দ্যাখ না বছর ঘুরতে না ঘুরতে তুই দেলখোসকে মেরে দিবি। তারপর ফিরপো-গ্রেট ইস্টার্ন–গ্র্যান্ড হোটেলে
আনন্দে অভিলাষ হাঁসের মতো হাঁসফাঁস করতে লাগল।
–তা হলে চলি-
—এই যে বিলটা-অভিলাষ একখানা কাগজ এগিয়ে ধরল : পাঁচ টাকা বারো আনা—
কিসের বিল? কিসের টাকা?–বল্টুদা যেন আকাশ থেকে পড়ল।
আর অভিলাষ পড়লনা, আকাশ থেকে নয়, সোজা স্পুটনিক থেকে।
-বা-রে, পাঁচ টাকা বারো আনার খেলে দুজনে মিলে?
বল্টুদা বললে, মোটে পাঁচ টাকা বারো আনার? তা হলে তোর কাছে আরও চুয়াল্লিশ টাকা চার আনা পাওনা রইল।
অভিলাষ এবার শুটনিক থেকে—না–না, সোজা চাঁদ থেকে পড়ল। পাঁচ বার খাবি খেয়ে বললে, চুয়াল্লিশ টাকা চার আনা মানে? আমি আবার কবে তোমার কাছে থেকে টাকা নিয়েছি? কক্ষনো না। তুমি এক পয়সাও পাও না আমার কাছ থেকে।
বটে? বসে-বসে পঞ্চাশ টাকার উৎসাহ দিইনি এতক্ষণ? বলিনি–লেগে থাক অভিলাষ–শেষে গদি-আঁটা চেয়ারে বসে টাকা গুনবি? সেই থেকে তো মোটে পাঁচ টাকা বারো আনা শোধ হল।
অভিলাষ বললে, আঁ—আঁ–আঁ–
–আ-আ-আ নয়, বল্ হাঁ হাঁ হাঁ। আর তোর হিসেবের খাতায় লিখে রাখ :কেহ পঞ্চাশ টাকা জমা দিয়া পাঁচ টাকা বারো আনার খাইয়া গেল। পরে ক্রমশ বাকিটা খাইবে। আচ্ছা চলি, টা-টা
অভিলাষ হাঁ-হাঁ বলতে পারলে না–একেবারে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে আমার মনটা ভারি খারাপ হয়ে গেল। বেচারা অভিলাষ! বল্টুদার পাল্লায় পড়ে ওকে অমনভাবে ঠকানোটা একদম ঠিক হল না–না খেলেই ভালো হত বল্টুদার সঙ্গে। কিন্তু আমি কী করতে পারি? আমার পকেটে তো মোটে তিনটে নয়া পয়সা ছাড়া কিছু নেই। যদি কোনও দিন যোগাড় করতে পারি, ওর টাকা নিশ্চয় শোধ করে দেব; এসব জোচ্চুরিতে আমি নেই!
ভীষণ রাগ হল বল্টুদার ওপর। ট্রামে উঠতে যাচ্ছি বল্টুদা ঠ্যাং ধরে আমায় টেনে নামাল।
-কোথায় যাচ্ছিস?
যাব একবার বলাই ঢ্যাং লেনে।
–ও, আমাদের পাঁচুগোপালের বাড়িতে? তা চলচল। ওর ক্ষেমঙ্করী-পিসিমা বেশ ভালো খাওয়ায়।
কী রাক্ষস দেখেছ? এইমাত্র অভিলাষের মাথায় কাঁটাল ভেঙে এতগুলো খেয়ে এসেছে। আবার এক্ষুনি খাই-খাই করছে।
বললুম, আজ গিয়ে সুবিধে হবে না। পাঁচুগোপাল ফুটবল খেলতে গিয়ে পা মচকে পড়ে আছে।
–পা মচকে পড়ে আছে? আহা, চুক চুক। তা হলে তো ওকে উৎসাহ দেবার জন্যে আরও বেশি করে যাওয়া দরকার। চল-চল
একটা হ্যাঁচকা টানে বল্টুদা আমায় ট্রামে তুলে ফেলল।
.
পাঁচুগোপালের বাড়ি গিয়ে কড়া নাড়তে ওর ক্ষেমঙ্করী-পিসিমা দরজাটা খুলে দিলে। বল্টুদা সঙ্গে সঙ্গে একমুখ দাঁত বের করে ফেলল। গলেই গেল বলতে গেলে।
